প্রতিদিনের মতো আজও পূর্ব দিগন্ত লাল করে সূর্য উঠেছে। আজকের লাল রঙটা একটু বেশিই গাঢ় ছিল। যতটা গাঢ় হলে লালকে ‘রক্তিম’ বলা যায়।
২৭ জন তরতাজা বাংলাদেশিসহ ৪৯ জন মানুষের রক্ত গায়ে মেখে ওঠা সূর্যের রক্তিম আভায় আজ কোনো মুগ্ধতা ছিল না। ছিল বিষণ্ণতা। ছিল হাহাকার। ছিল দমবন্ধ, গুমোট চাহনি। সকালের স্নিগ্ধতায় ছিল লোনা জলের উপস্থিতি।
৪৯ জন মানুষ; যারা গতকাল সকালে সূর্য দেখেছিল বাংলাদেশে। আজ তারা নেই। এই আকাশ, সকাল, সূর্য, বসন্তের বাতাস, কোনো কিছুতেই তারা নেই।
অথচ গল্পটা অন্যরকম হতে পারতো। স্বামীকে নিয়ে প্রিয়জনদের জন্য এক গাদা শপিংসহ ফিরে আসতো শশী। তৃতীয়বার হানিমুন সেরে ফিরতো সোনামণি।
পাঁচদিনের জন্য প্রিয় মাতৃভূমিকে টাটা জানানো পিয়াস রায়।
কিংবা নেপালের সেই ১৩ ডাক্তার? তাদের প্রিয় মানুষটা নিশ্চয় চাতকচোখে অপেক্ষা করছিল? পাঁচ বছর ধরে ক্যালেন্ডারে দাগ কাটা বাবা? ডাক্তার হয়ে কবে ফিরে আসবে সন্তান? তাদের সকালটাইবা কেমন বিষণ্ণ তা আঁচ করতে যে কোনো মানুষের বিন্দুমাত্র কষ্ট হবে?

বাংলার আকাশে এমন শোকের ঘটনা যে খুব বেশি আসেনি। এতগুলো তাজা প্রাণকে বিদায় জানিয়ে আজ এরকম বিষণ্ণ সকাল; এমন দুখিনী বাংলাদেশ!
গতকাল দুপুরে নেপালের কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৪৯ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে নেপাল পুলিশ।
আজ বাংলা নামের বাগান থেকে ২৭টা ফুল, পৃথিবী নামক উদ্যান থেকে ৪৯টি ফুল ঝড়ে গেল। আজ নিশ্চয় এ বাগানের মালীর মন ভালো নেই।
মন ভালো নেই ডাক্তার হয়ে ফিরতে চাওয়া সেই ১৩ সন্তানের বাবা-মায়ের, বন্ধুদের। ডাক্তারের পরিবর্তে যাদের ফিরতে হলো লাশ হয়ে। বাবা মায়ের স্বপ্ন পূরণ করে এমবিবিএস পরীক্ষা শেষে দেশে ফিরছিল ওরা ১৩ জন। যাদের মধ্যে ১১জন মেয়ে এবং দুজন ছেলে। কত রাত নির্ঘুম করে সকাল-সন্ধ্যা একাকার করে মুখস্থ করেছিল অ্যানাটমি, ফিজিওলজি, ফার্মাকোলজি।

গণমাধ্যমের খবরে দেখা গেছে, হবু ডাক্তার ছেলের লাশ নিতে দাঁড়িয়ে আছেন বাকরুদ্ধ এক নেপালি পিতা। তার মুখের দিকে তাকানো যায় না, চোখের দিকে তাকানো যায় না। শোকে পাথর হয়েছেন তিনি, কাঁদতে ভুলে গেছেন। অসহায় চোখে তাকিয়ে আছেন বিধ্বস্ত বিমানের দিকে। মানুষের জন্য এই পৃথিবীতে সবচেয়ে ভারী বোঝা কী? পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ। সন্তানের লাশ কাঁধে নিতে অনিচ্ছুক এই পিতার ছবি দেখে যে কেউ দিশেহারা হবেন। মানুষের চোখ ভরে আসবছ জলে, চোখ ভিজে যাচ্ছে কান্নায়।
৪৯টা হলুদ পলিথিনে মোড়ানো নিথর প্রাণ জাতিকে কোনো শিক্ষা দিয়ে যাবে? সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪ হাজার ৪০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত ত্রিভুবন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। চারপাশের উঁচু পাহাড়-পর্বতে ঘেরা। এখানে উড়োজাহাজ অবতরণ ও উড্ডয়ন উভয়ই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ! বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানে অবতরণের সময় প্রধান বাধা একটি বিশাল পাহাড়, এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮,৭০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত। ত্রিভুবন বিমানবন্দরের নয় মাইল দূরে রয়েছে এই পাহাড়। এ জন্য এই রানওয়েতে কোনো উড়োজাহাজই সোজা অবতরণ করতে পারে না। ওই পাহাড় পেরোনোর পরপরই দ্রুত উড়োজাহাজ অবতরণ করাতে হয়।
উড়োজাহাজের ফিটনেসও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এ সবই এখন খতিয়ে দেখা হবে। পাইলট এবং এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের কথোপকথনও।
সবই হবে, কিন্তু যারা চলে গেছে একেবারেই গেছে। রফিক জামান রিমু, তার স্ত্রী বিপাশা এবং তাদের সন্তান অনিরুদ্ধ আর কখনোই ফিরে আসবে না, কখনোই না।









