তিনি সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যে ঢাকার কুর্মিটোলায় রাস্তার পাশে দাঁড়ানো শিক্ষার্থীদের ওপর উঠে যায় দ্রুতগতির বাস। থেতলে যায় বেশ কজন শিশুশিক্ষার্থীর দেহ।
দুজন ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায়, গুরুতর আহত হয় আরও বেশ কয়েকজন। এই ট্রাজিক ঘটনায় দেশব্যাপী প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। সড়ক নিরাপত্তার ও বেপরোয়া পরিবহনচালকদের শাস্তির দাবিতে সোচ্চার হয় মধ্যবিত্ত নাগরিক সমাজ।
এরই মধ্যে সবার অলক্ষ্যে ঘটে যায় আরেকটি নির্মম ঘটনা। খাগড়াছড়িতে কৃর্তিকা ত্রিপুরা পূর্ণা নামে মাত্র ১০ বছরের একটি শিশুকে ধর্ষণ ও পাশবিক নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়। সে দীঘিনালা উপজেলার নয় মাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণির ছাত্রী। স্কুল থেকে না ফেরায় অভিভাবকরা অনেক খোঁজাখুঁজি করছিলেন। রাত এগারোটায় শিশুটিকে বাড়ির পাশে ছড়ার জঙ্গলে পাওয়া যায়। শিশুটিকে ধর্ষণ করেই থেমে যায়নি ওই নরপশুরা, যেন শিশুটিকে খুবলে খুবলে খাওয়ার বাসনাও জেগেছিল ওই কুলাঙ্গারদের। তার দুটি হাত ভেঙ্গে দেওয়া হয়, যৌনাঙ্গ কেটে ক্ষত বিক্ষত করা হয়, পায়ুপথে গাছের গুড়ি ঢুকিয়ে দেয়া হয়।
চরম ন্যক্কারজনক এই ঘটনাটি আমাদের স্তব্ধ করে দিয়েছে। সভ্যতার মাপকাঠিতে এক ধাক্কায় অনেক দূর নিচে নামিয়ে দিয়েছে। এমন নয় যে নাবালিকা ধর্ষণ কিংবা নারীনির্যাতন এ দেশে কিছু নতুন ব্যাপার।দলগতধর্ষণও আজকাল রীতিমতো প্রাত্যহিক ঘটনা। কিন্তু প্রাত্যহিকতার মধ্যেও তো কিছু ঘটনা নৃশংসতা ও বিকারগ্রস্ততার মাপকাঠিতে বিশিষ্টতা দাবি করে ফেলে। খাগড়াছড়ির ঘটনাটি সেই বিশিষ্টতার দাবিদার। বুঝতে ভুল হয় না যে, আমাদের সমাজের আগাপাছতলা জুড়ে কোন ফাঁক দিয়ে যেন একটি বিরাট পরিবর্তন ঘটে গেছে। নতুবা মাত্র দশ বছরের একটি নিষ্পাপ শিশুর উপর এমন হিংস্র আচরণ করা যায় না। ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন জাত, ভিন্ন গোষ্ঠীর প্রতিনিধি বলেই কি এই পরিমাণ নৃশংসতা?
বাংলাদেশের নাগরিক হিসাবে আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার উপায় নেই। আরও হতাশার ব্যাপার হচ্ছে, এই প্রবল বিকার আর অপরাধের ঘটনাটির কোনো প্রতিবাদ নেই। যদিও জানি এই মহাঅপরাধমূলক ঘটনাটির সামনে যে কোনও প্রতিবাদও অর্থহীন, আলঙ্কারিক। প্রতিবাদ শেষ করে আমরা এক সময় বিষয়ান্তরে চলে যাব, সামনে পড়ে থাকবে অনতিক্রম্য অন্যায়-অধ্যুষিত এক সমাজ— যার অসুস্থচিত্ততার নিরাময়ের পথ কারও জানা নেই!
‘নারী-বান্ধব’ দাবিদার সরকার কেবল মুখেই নারীর নিরাপত্তার কথা বলে চলেছে। কিন্তু তাদের কার্যকলাপে ভয়ঙ্কর নারীবিদ্বেষ, পুরুষতন্ত্রের সর্বাপেক্ষা হীন ও আক্রমণাত্মক সংস্কৃতিটিই ফুটে উঠছে প্রতিনিয়ত। যে কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গেই গুন্ডাবাজি ও অসামাজিক কাজকর্মের অশুভ বন্ধন থাকে, কিন্তু সাধারণত দলগুলি চেষ্টা করে, অন্তত প্রকাশ্যে দুষ্কৃতীদের থেকে খানিক দূরত্ব রচনা করে চলার।
বর্তমান ক্ষমতাসীনরা সেই নীতিতে চলছে না। বর্বর পেশিশক্তির উদযাপনই যে তাহাদের রাজনৈতিক সিদ্ধির আরাধনা, তা নানা ঘটনায় ফুটে উঠছে। তারা যেন এতে গর্বিত। রাজনীতির এই গর্ব ক্রমে সমাজের চালচলনও পাল্টে দিচ্ছে। বর্তমান সরকারের নিজস্ব ব্র্যান্ডের রাজনীতিতে প্রযত্নে লালিত পালিত পরিচালিত হচ্ছে ধর্ষক-খুনীসহ দৃষ্কৃতীরা। অপরাধীরা তাই বুক ফুলিয়ে একের পর এক অপরাধ ঘটিয়ে চলছে। আর অপরাধীদের সঙ্গে সন্ধি করে চলছে পুলিশ। তাদের মর্জি হলে কাউ ধরছে। আবার মর্জিমতো ছেড়েও দিচ্ছে।
এ ধরনের ধর্ষণের ঘটনাগুলো নিয়ে আলাদা করে গবেষণা ও বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। ধর্ষণের মতো অপরাধকে কোনও অভিন্ন খোপে বুঝতে চাওয়া উচিত নয়। যুদ্ধ বা দাঙ্গাহাঙ্গামার সময়ে ধর্ষণকে যখন পরিকল্পিত রণকৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তার পেছনে এক রকমের মন। নারী এখানে সম্প্রদায়ের ইজ্জতের প্রতীক হয়ে উঠছে। প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে বা পুরনো কোনও অপমানের বদলা নিতে যখন নির্দিষ্ট কাউকে ধর্ষণ করা হচ্ছে, তার পেছনে আর এক রকমের মন। নারী সেখানে শত্রুবিশেষ। প্রেমিকা বা স্ত্রীর প্রতি বিশেষ মুহূর্তে বলপ্রয়োগ করা বা নিজের অধীনস্থ কারও অসহায়তার সুযোগ নিয়ে, হয়তো বা কিছু পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে তাকে যৌন সংসর্গে বাধ্য করা কিংবা নিজের অপ্রাপ্তি ও বঞ্চনার পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকে নিজের চেয়ে ওপরতলার কোনও নারীকে ধর্ষণ করার পেছনেও কিন্তু আলাদা আলাদা মন। সুতরাং ধর্ষণ মানেই যৌন ক্ষুন্নিবৃত্তির তাড়না যেমন নয়, একই ভাবে ধর্ষণ মানেই শুধু ক্ষমতা কায়েম বা বাগে আনার চেষ্টাও নয় বোধ হয়। বাবা যখন মেয়েকে ধর্ষণ করছে বা দাদু নাতনিকে, তার পেছনে কোন মন? যে মন বা মনের অভাব থেকে হুলো বেড়াল মাঝে মাঝে নিজের ছানাদের খেয়ে ফেলে, সেটাই কি?
আমাদের সাংস্কৃতিক ঝোঁক ও আচরণগুলোও অনুপুঙ্খ বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখা উচিত। যে চোখ দশ বছরের শিশুর শরীরে নারীত্ব খুঁজে পায়, সেই চোখ কীভাবে সৃষ্টি হয়? সেকি আর কাউকে রেয়াত করবে? কোন ক্ষমতার তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা হবে এর? কেন কিশোর যুবরা ধর্ষক হয়ে যায়? আমরা কি জেনেছি, ওই ধর্ষক বালক নিজে তার আগে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছিল কি না? সেই অভিজ্ঞতাই তাকে শিকার থেকে শিকারি করে তুলেছে কি না?
হাতে হাতে ঘুরছে স্মার্টফোন। পর্নোগ্রাফির অবারিত দুনিয়া। মুঠোয় থাকা ক্যামেরা বন্দি করতে পারে যা কিছু। ধর্ষক বালকের মনোজগৎ কি আর বালকোচিত আছে? আর এই যে আমরা, পাঁচ বছরের সন্তান হিন্দি গান গেয়ে কোমর দোলাতে শিখেছে দেখে আহ্লাদে আটখানা হয়ে যাচ্ছি, রিয়েলিটি শো-এ পাঠাব কি না ভাবছি, আমরাও ঠিক অভিভাবকোচিত আছি তো?
ধর্ষণ পুরুষতন্ত্রের অস্ত্র, সন্দেহ নেই। ধর্ষণের শিকার বালিকাটির ‘মেয়ে’ পরিচিতি গুরুত্বপূর্ণ, সন্দেহ নেই তাতেও। কিন্তু, তাকে শুধু ‘মেয়ে’ হিসেবে দেখলে, তার ‘ত্রিপুরা’ বা ‘আদিবাসী’ পরিচিতিটাকে আলাদা ভাবে তুলে না ধরলে এই ধর্ষণের পেছনের রাজনীতির কথাগুলো আর বলার উপায় থাকবে না। বলা হবে না, ‘ত্রিপুরা’ না হলে হয়তো এ ভাবে মরতে হত না মেয়েটিকে। বলা হবে না, আদিবাসীদের এ ভাবে মরতে হতেই পারে, এমন একটি আশঙ্কা তৈরি করে দেওয়াও এই ধর্ষণের হয়তো একটি উদ্দেশ্য ছিল। এবং, বলা হয়ে উঠবে না, এই মেয়েটি, ত্রিপুরা জনজাতি, তাদের অরণ্যের অধিকার— সবই নিতান্ত প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন, আসল কথাটা হল আদিবাসী ত্রিপুরা হিসেবে তার ধর্মীয় পরিচিতি। অথবা, সেই পরিচিতিকে ব্যবহার করতে চায় যে রাজনীতি।
সত্যি বলতে কী, প্রতি দিন দেশের বিভিন্ন কোণে ধর্ষণের যত ঘটনা ঘটে, তার থেকে যেটুকু সংবাদমাধ্যমের গোচরে আসে, সেগুলো সব যদি প্রতি দিন সবিস্তার লেখা হয়, তা হলে গোটা সংবাদপত্র শুধু ধর্ষণের খবর লিখেই ভরে যাবে। দুই বছরের শিশু থেকে শুরু করে পঁয়ষট্টি বছরের বৃদ্ধা, কেউই বাদ যাবে না। ধর্ষকের বয়সও আট থেকে পঁচাত্তর অবধি অনায়াস ঘোরাফেরা করবে।
মুশকিল হল, বেশির ভাগ খবরই আমাদের কাছে শেষমেশ শুধুই ধর্ষণের খবর হয়ে থেকে যায়। ‘ধর্ষণ’ শব্দটা একটা ছাতার মতো শুধুমাত্র অপরাধের একটি প্রকরণকে জানান দিতে থাকে। কিন্তু সেই প্রকরণটির পেছনে আরও কত পরত ছিল, কত ধরনের বিকার ছিল, মনের কত রকম অন্ধকার ছিল, ক্ষমতার কত স্তরের বুনট ছিল, সেগুলো বহুলাংশে অজানা রয়ে যায়। তার সঙ্গে যখন ‘এমন তো কতই হয়’ বা ‘সাজানো ঘটনা’ বা ‘পথে একা বেরিয়েছিল কেন’ গোছের বাণী নানা মহল থেকে উচ্চারিত হয়। তখন অপরাধগুলো সমাজের একটা বড় অংশের চোখে লঘু হয়ে যেতে থাকে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে ধর্ষণ-খুন-গুম-হত্যা-অপহরণ ও নির্যাতনের ঘটনা নতুন কিছু নয়। এসব অপরাধীদের গ্রেপ্তারপূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও সুষ্ঠু বিচার করতে না পারায় এধরনের ঘটনা বার বার ঘটছে। ঘটনার দুইদিন অতিক্রম হলেও হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি প্রশাসন।
এর এগ বিলাইছড়িতে মারমা তরুণীদের ধর্ষণ ও জেলা পরিষদের পার্কে ত্রিপুরা ছাত্রীকে গণধষর্ণের ঘটনাগুলোরও কোনো সুরাহা হয়নি। এই বাস্তবতায় পূর্ণার ঘটনাটি নিয়ে আলাদা করে আর কার কাছে বিচার চাইব?
মাত্র দশ বছরের একজন শিশুকে ধর্ষণ ও তার দেহকে ক্ষতবিক্ষত করা নিঃসন্দেহে বিকার। প্রশ্ন হলো, এই বিকারের প্রতিকার কী, আর কার কাছেই বা প্রতিকার চাইব?
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)









