উন্নয়ন সাংবাদিকতা
ঠিক কখন উন্নয়ন সাংবাদিকতা শুরু হয় কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় তা বলা মুশকিল। তবে একটা সময় পৃথিবীতে খাদ্য নিরাপত্তা খুব দুর্বল ছিল, সেই সময়েই বিকাশ ঘটে উন্নয়ন সাংবাদিকতার। পরবর্তী সময়ে এর শাখা-প্রশাখা বিস্তার লাভ করে। বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চিন্তাভাবনা চলে আসছে মূলত ৫০-৬০ বছর আগে থেকে। পৃথিবীর জনসংখ্যা যখন ৩০০-৩৫০ কোটি ছিল, তখন সবার মনে ভয় ছিলো যে পৃথিবীতে দুর্ভিক্ষ আসবে। এই দুর্ভিক্ষ থেকে বাঁচতেই বিশ্বব্যাপী সবুজ বিপ্লবের পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়। যদিও এ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে অনেক তর্ক-বিতর্ক আছে। তবে এই বিপ্লবের মূল কথা ছিল মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাথে কৃষির সমন্বয় ঘটাতে হবে।
ষাটের দশকে প্রথম এটা নিয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়। এই সংক্রান্ত গবেষণার পুরোপুরি ফলটা আসতে শুরু করে ঠিক তারপর থেকেই। নরম্যান বরলগ প্রথম এ সম্পর্কে ধারণা দেন। পৃথিবীর একেক দেশে মানুষের প্রধান খাদ্য একেক রকম। যেমন এশিয়ার বিভিন্ন জায়গায় প্রধান খাবার ভাত, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আলু, কোথাও আছে গম-যব, কোথাও বিন ইত্যাদি। যার যেই প্রধান খাদ্য সেটা ষাটের দশকের আগ পর্যন্ত সেখানে উৎপাদন কম হতো কারণ জাতটি ছিলো স্থানীয়।
পৃথিবীতে জনসংখ্যা বাড়ছে ক্রমাগত কিন্তু ফসলের উৎপাদন বাড়ছে না। দেশীয় বীজে ফসলের পরিমাণ খুবই কম; যেমন বিঘায় ১০ মণ বা আরো কম। কিন্তু ফসল দরকার বিঘায় ৩০-৪০ মণ। ম্যালথাসের তত্ত্বমতে, জনসংখ্যা বাড়ছে জ্যামিতিক হারে, অর্থাৎ লাফিয়ে লাফিয়ে। আর খাদ্যে উৎপাদন বাড়ছে গাণিতিক হারে। এটা থেকে পরিত্রাণের জন্য নরম্যান বরলগ প্রথম কৃত্রিম পরাগায়ন বা ন্যাচারাল ব্রিডিং করে গমের দেশীয় জাতকে উচ্চ ফলনশীল করার কাজটি করেন। ১০ মণের জায়গায় উৎপাদন বেড়ে যায় ৩০/৪০ মণে। এই প্রযুক্তি দিয়ে সেই অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ভিক্ষ কিছুটা প্রতিহত করা হয়েছিলো।
যে দেশে গম প্রধান সে দেশে গমের, যেখানে ধান প্রধান সেখানে ধানের কৃত্রিম পরাগায়ন ঘটিয়ে উৎপাদন বাড়ানো হলো। আমাদের দেশেও এযাবতকাল ব্রির ৫৮টা জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। একে বলা হয় এইচওয়াইভি (হাই ইলডিং ভ্যারাইটি)। দেশীয় জাত চাষ করলে বিঘায় ৮-১০ মণ ধান হয় আর উন্নত জাত করলে ২৫/৩০ মণ হয়। আমাদের দেশের ১৬ কোটি মানুষ খেয়ে পরে আছে, এটা শুধুমাত্র গ্রিন রেভলিউশন এর জন্য। এভাবে নরম্যান বরলগ বিশ্বব্যাপী আশু দুর্ভিক্ষ ঠেকিয়েছিলেন। 
বিশ্বব্যাপী একদিনে এই বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ছড়িয়ে পড়েনি। আগে পুরো চাষ ব্যবস্থা ছিলো প্রকৃতিনির্ভর। বর্ষার সময় বীজ ফেললে মানুষ এক সময় গিয়ে ধান পেত। এখন সারাবছরই পাচ্ছে কারণ, কৃত্রিম সেচ, রাসায়নিক সারের ব্যবহার, উন্নতমানের বীজ ও প্রযুক্তিগুলো দেশে দেশে ছড়িয়ে গেছে। স্থানীয় পর্যায়ে কৃষকের মাঝে এই প্রযুক্তিগুলো জনপ্রিয় করতে গণমাধ্যমকে ব্যবহার করার প্রবণতা লক্ষ করা গেছে সেই ৭০/৮০’র দশকে। এভাবেই প্রথম দিকে উন্নয়ন সাংবাদিকতার ধারণা চলে আসে।
আন্তর্জাতিক খাদ্য সংস্থার এক আফ্রিকান ডিরেক্টর জেনারেল এখ বেবো প্রথম বলেন, এমন একটা সাংবাদিকতার উদ্ভাবন করতে হবে যারা যার যার দেশে স্থানীয় পর্যায়ে এই প্রযুক্তিগুলোর সম্প্রসারণ করবে। এই পর্যায়ে সাংবাদিক বা মিডিয়া সম্প্রসারকের ভূমিকা পালন করবে। দরিদ্র দেশগুলোকে আমেরিকান এইডের মাধ্যমে পিএলফোরএইটি দিয়ে পুরো জাতিকে টিকিয়ে রাখা যায় না। এভাবে প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করে তার উৎপাদন তাকেই করতে হবে। এরপর পিএলফোরএইটির এইসব চুক্তি তুলে দিতে হবে। তা না হলে সবাই সবসময় দরিদ্র থাকবে। উনিই প্রথম এই উন্নয়ন সাংবাদিকতার কথা বলেছিলেন। আবার অনেকে বলেন, ফিলিপাইনে প্রথম উন্নয়ন সাংবাদিকতার উদয়।
এখন আমরা উন্নয়ন সাংবাদিকতার একটা পর্যায় পেরিয়ে এসেছি। তথ্য প্রযুক্তির যুগে উন্নয়ন সাংবাদিকতায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসার কথা। থাইল্যান্ডে পণ্যের মূল্য জানার জন্য অ্যাপস রয়েছে। সেদিক থেকে এশিয়ায় কৃষি নিয়ে খুব বেশি কাজ হয় নি। তবে আমেরিকায় সান টিভি নামে একটি চ্যানেল রয়েছে। এখানে কৃষি নিয়ে যাবতীয় অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। ফিলিপাইনের রেডিওগুলোতে কৃষি ভিত্তিক অনুষ্ঠান রয়েছে। প্রতিদিন সকালে কৃষি নিয়ে ভাষণ দেন দেশটির প্রেসিডেন্ট। আমাদের প্রধানমন্ত্রীও কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে বেশ উৎসাহী।
এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কৃষি নিয়ে কিছু নির্দলীয় নিরপেক্ষ সংগঠন রয়েছে। যেমন জাপানে রয়েছে জেএ (জাপান এগ্রিকালচারাল এসোসিয়েশন)। আমাদের দেশে এরকম একটি সংগঠন প্রয়োজন। দেশে যেগুলো রয়েছে সেগুলো মূলত রাজনৈতিক ভাবাদর্শে চালিত। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সংগঠন থাকলে কৃষক অধিকার তুলে ধরতে পারতো।
এশিয়াতে কৃষি নিয়ে কাজ বিচ্ছিন্নভাবে হয়, বাংলাদেশেও হয়েছে। তবে চ্যানেল আইয়ের মতো কোনো চ্যানেলই এভাবে কাজ করতে পারেনি। মূলধারার সংবাদে কৃষিকে এভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি আর কোনো চ্যানেলে।
বাংলাদেশে উন্নয়ন সাংবাদিকতা ও টেলিভিশন
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়গুলোতে বাংলাদেশ দরিদ্র ও অনুন্নত ছিলো, ছিলো খাদ্য ঘাটতি। এরপরেই ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ। সেই সময় আমাদের খাদ্য আমদানি করতে হতো, প্রযুক্তির প্রসার ছিল না, ফসলে বৈচিত্র্য ছিল না। তখনকার ফসল বলতে ছিল শুধু ধান আর পাট। নতুন দেশ তাই মানুষের মনোনিবেশ ছিল বিভিন্ন দিকে। সেই সময়টাতেই আমি টেলিভিশনে কাজ শুরু করলাম। ১৯৭৫ থেকে ১৯৮০’র আগ পর্যন্ত আমি বিভিন্ন ধরনের বিনোদনমূলক বা খেলাধুলা বিষয়ক অনুষ্ঠানে কাজ করতাম। এক সময় এসে আমি ভাবলাম, টেলিভিশন শুধু একটা বিনোদনের বাক্স নয়। এটা একটা সম্প্রসারক বা তথ্য আদান-প্রদানের জন্য জাদুর বাক্স হতে পারে, এটা মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার বাক্স হতে পারে। এটাকে আমি এন্টারটেইনমেন্ট টুলস হিসেবে ব্যবহার না করে শিক্ষার জন্য ব্যবহার করতে পারি। এরকম একটা চিন্তা ভাবনা থেকেই ১৯৮০ সালে এসে আমি কৃষি বিষয়ক অনুষ্ঠান নিয়ে চিন্তা করা শুরু করলাম।
১৯৮০’র দশকে আমার মতো একজন তরুণ কৃষি নিয়ে কাজ করবে এটা অনেকে ভাবতেই পারতো না। অনেকেই আমাকে ধিক্কার দিয়েছে, পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, কাছের মানুষ সবাই। কারণ তখনকার টেলিভিশনের মূল কাজ ছিল বিনোদন-কেন্দ্রিক। কিন্তু আমি মাথায় নিয়েছিলাম এইজন্য আমার দেশের যেসব উদ্ভাবিত প্রযুক্তি আছে কৃষিক্ষেত্রে, এই তথ্য যদি আমি এই টিভির মাধ্যমে আদান-প্রদান করতে পারি তাহলে আমি একজন সম্প্রসারকের ভূমিকা রাখতে পারি যেমন রেখেছিল আমাদের গবেষকরা, মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা কিংবা কৃষি সম্প্রসারকরা।
আমার মনে হয়েছিল এই টেলিভিশনের মাধ্যমে একটি কথা বললে একসাথে সারা বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ শুনছে-দেখছে। অন্য যেকোনো মাধ্যমের তুলনায় টেলিভিশন এক্ষেত্রে অনেকটা শক্তিশালী। ভিজ্যুয়াল মাধ্যম হওয়ায় প্রাযুক্তিক ব্যবহার, সাফল্য ও উদ্ভাবনীগুলো সবাইকে দেখিয়ে দেয়া যায় টেলিভিশনে। আমি সাংবাদিকতার পয়েন্ট অব ভিউ থেকে সম্প্রসারক হিসেবে ভূমিকা রাখছি। সেরকম একটা ব্রত নিয়ে ‘মাটি ও মানুষ’ শুরু করলাম।
মাটি ও মানুষ: শুরুর কথা
মাটি ও মানুষ শুরু করতে গিয়ে স্বচক্ষে দেখলাম, তখন পর্যন্ত বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থা, কৃষির সংজ্ঞা, কৃষকের সংজ্ঞা গোটাটাই খুব ক্ষীণ একটা জায়গায় আবদ্ধ ছিল। কৃষি বলতে ছিল কেবল ধান আর পাট চাষ করা। কৃষক বলতে বোঝা যেত শুধু গ্রামের সাধারণ মানুষ যারা খেটে খায়, গ্রামে থাকে। আমি যেদিন থেকে কাজ শুরু করলাম সেদিন থেকে আমার মাথায় আসলো এই সংজ্ঞাটাকে আমাদের ভাঙতে হবে, ভেঙে বেরিয়ে আসতে হবে। না ভাঙলে কৃষি বা কৃষকের উন্নয়ন হবে না। সেই সংজ্ঞা ভাঙতে গিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করলাম কৃষি মানেই ধান আর পাট চাষ নয়। শুধু ধান আর পাট চাষ করলেই কৃষকের পেটে ভাত হয় না, পরনের কাপড় হয় না, বাচ্চা স্কুলে যেতে পারে না। কারণ কৃষকের সেই বাড়তি সক্ষমতা নেই।
তাহলে সমাধান কী? তাদের নতুন প্রযুক্তির সাথে পরিচয় ঘটাতে হবে। নতুন কৃষি ধারণার সাথে আসতে হবে। বাড়ির সামনে উঠোন আছে, সেখানে সবজির চাষ করতে হবে। সেই সময়ে সবজির চাষ বলতে ছিল বড়জোর একটা লাউয়ের মাচা যা ঘরের কোণা দিয়ে বেয়ে উঠছে। বাড়ির সামনের পুকুর, সেটার পানি খাওয়া হচ্ছে, কারণ সে সময় টিউবওয়েল ছিল না। সেই পুকুরে যে মাছ চাষ করা যায়, এ সম্পর্কেও ধারণা ছিল না। কারণ সবাই ভাবতো চাষতো হয় ধান আর পাটের, মাছের আবার চাষবাষ কী? মাছ তো আসে বর্ষাকালে, পুকুরে।
কিন্তু বলা শুরু হলো, শুধু মাছ নয়, ফলের চাষ করতে হবে। পোলট্রির খামার করতে হবে। আগে পোলট্রি ছিল না, পলোর নিচে কয়েকটি মুরগি বা হাঁস ছিল তাদের। খামার করার আইডিয়া ছিল না তাদের। বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট করার চিন্তা-ভাবনাও ছিল না। বললাম, গরুর গোবর দিয়ে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট করতে হবে। এই সবগুলো মিলে সমন্বিত কৃষির চর্চা করতে হবে। 
এতগুলো কৃষি সেক্টর নিয়ে কাজ করতে গেলে প্রতিটি সেক্টর থেকেই কিছু না কিছু আয় হবে। গরুর গোবর শুধুমাত্র জমিতে ব্যবহার না করে, বায়োগ্যাস করে জ্বালানির কাজ করতে পারে। ওই গ্যাস দিয়ে একই সাথে রান্না ও ঘরের বাতি জ্বালানোর কাজও করা যায়। এই আলো দিয়ে বাচ্চা পড়াশোনা করতে পারে। এভাবে জীবনমানের উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব।
শুধুমাত্র গ্রামের মানুষ নয়, একজন শহুরে যুবকও কৃষক হতে পারে। এমনকি স্বল্পায়ী চাকরিজীবী কিংবা গৃহিণীও কৃষক হতে পারে। বাড়ির ছাদে বা আঙিনায় একটা কেইস কালচার পোল্ট্রি বা রুফটপ গার্ডেনিং এর মাধ্যমে আয় করা যায়। এভাবে কাজী পেয়ারা, পোল্ট্রি ফার্ম আসলো। যেই তরুণ বেকার ছিল তাকে মোটিভেট করে মুরগির খামার বা মাছের খামারে কাজে লাগানো যায়। এই শিক্ষিত তরুণগুলোর শিক্ষাকে যদি কৃষিখাতে বিনিয়োগ করা যায় তাহলে অনেক বেশি রিটার্ন আসবে চাকরির চাইতে। যে কারণে এখন বাংলাদেশে ৩০ হাজার কোটি টাকার পোল্ট্রি ফার্ম, ২৬ হাজার কোটি টাকার মাছের খামার করা সম্ভব হয়েছে। হাজার হাজার তরুণের এর সাথে সংযুক্তি ঘটেছে। এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে কৃষকের সংজ্ঞাটাও ভেঙে গেল।
এরকম ধারণা মাথায় রেখে ৮০ সালে মাটি ও মানুষ শুরু করি। এরকম একটি অনুষ্ঠান নির্মাণের জন্য ১৯৮০’র দশকে কী ধরণের লজিস্টিক সাপোর্ট লাগে, তার পুরোটা অনুমান করাও সম্ভব নয় এখন। ন্যূনতম দুই দিন লাগতো শুটিং করতে। ভারী ভারী সব যন্ত্রপাতি ছিল তখন, একটা ভিসিআর তিনজন মিলে তুলতে হতো, ক্যামেরা দুজন মিলে ধরতো। এরকম জিনিসপত্র নিয়ে গ্রামে গেলে মানুষ স্বভাবতই ভয় পেত, দৌড়ে পালিয়ে যেত। কারণ এগুলো তারা আগে দেখেনি। (চলবে…)








