গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র হয়ে শফিক রেহমানের গ্রেফতার নিয়ে সমালোচনা করায় মঞ্চের কর্মী-সহযোদ্ধাদের সমালোচনার তীরে বিদ্ধ হচ্ছেন ইমরান এইচ সরকার। গণজাগরণ মঞ্চের মতো প্লাটফর্মের মুখপাত্র হয়ে
শফিক রেহমানের গ্রেফতারের সমালোচনা করায় মুখপাত্রের দায়িত্ব থেকে ইমরানের সরে আসা উচিৎ বলে মনে করেন মঞ্চের কর্মী তামান্না সেতু।
ফেসবুক স্ট্যাটাসে তামান্না সেতু লিখেছেন, কোন এক নারী আড্ডায় একদা আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ‘ভাবী, তোমার মনুষ্য জীবনের সবথেকে আনন্দপূর্ণ ঘটনা কি?
“আমাদের কালচারে, মিডিয়াতে প্রশ্ন করার পর উত্তরের অপেক্ষা করার রীতি কমে যাচ্ছে দিনদিন। আমার প্রশ্নকর্তাও উত্তরের অপেক্ষা না করে নিজে থেকেই বললেন, ‘কোনটা বল? নিশ্চয়ই তোমার প্রথম সন্তান জন্মের ঘটনা?” আমি হাসিমুখে তাকে বললাম, ‘না ভাবী। প্রথম বা দ্বিতীয় কোন সন্তান জন্মের ঘটনাই আমার মনুষ্য জীবনের সবথেকে আনন্দের ঘটনা নয়।’
ভাবীসাহেবা চটুল হাসির সহিত টিপ্পনী কাটিয়া বলিলেন, ‘তবে কি বিয়ের রাত? “আমি আবার হাসিলাম। কহিলাম, ‘না ভাবী। আমার জীবনের সবথেকে আনন্দময় ঘটনা ঘটেছিল ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩তে। সেদিন আমরা লক্ষ মানুষ শাহবাগ দাঁড়িয়ে এক সাথে গেয়েছিলাম ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’।
সেদিন এই গান গাইবার সময় আমরা লক্ষ জনতা একসাথে কি আশ্চর্য ভাবে কেঁদেছিলাম আপনি জানেন না। দেশের জন্য বাংলা মায়ের লক্ষ সন্তান কতদিন পর একসাথে ওভাবে কেঁদেছিল আমার জানা নেই। সেই ঘটনা আমি আজীবন বুকে নিয়ে ঘুরে বেড়াব। এখন পর্যন্ত আমার জীবনে সেই ঘটনার থেকে আনন্দের কিছু ঘটেনি। মা হিসেবে সন্তান জন্ম দেয়া অবশ্যই আনন্দের ঘটনা। কিন্তু মানুষ তামান্না সেতু মা পরিচয়ের থেকেও অনেক বড়। তার জীবন একটি পরিচয়ের আনন্দের মাঝে আটকে থাকে না।”
হ্যাঁ, শাহবাগের সেই দিন আজও আমি চোখ বুজলেই পরিষ্কার দেখতে পাই। এখনও শাহবাগে পা রাখলেই আমি লক্ষ মানুষের ‘জয় বাংলা’ স্লোগান শুনি। গমগম আওয়াজে আমার মন নেচে ওঠে। আমার রক্তের গতি বেড়ে যায়। শাহবাগ, গণজাগরণ মঞ্চ, জয় বাংলা, তুই রাজাকার, ফাঁসি চাই, গর্জে ওঠ বীর বাঙ্গালি সব মিলেমিশে একাকার হয়ে আমার রক্তে এখনও নেশা ধরিয়ে দেয়। একটা চাওয়া, একটাই মাত্র চাওয়া ‘রাজাকারের ফাঁসি’ আমাদের মত অনেক গেরস্থ্য মহিলাকে রান্নাঘর থেকে রাজপথে দাড় করিয়ে দিয়েছিল। খুন্তি ধরা হাতে প্ল্যাকার্ড। আমাদের চাওয়া কিছুটা পূরণ হয়েছে, কিছুটা পূরণ হবার ব্যাবস্থা চলমান। এর মাঝে গণজাগরণের এই প্লাটফর্ম নিয়ে অনেক মতানৈক্য হয়েছে, মঞ্চ ভেঙ্গেছে, একেক অংশের মুখপাত্র একেকজন হয়েছে। এবং মুখপাত্র শব্দের অর্থ আমরা ভুলে গেছি!! মুখপাত্র এবং নেতা এখন মিলেমিশে একাকার শব্দ!!
লক্ষ মানুষের যেহেতু মিডিয়ার সাথে কথা বলা সম্ভব না তাই আমাদের সকলের মুখের কথা একজন মানুষ যেন মিডিয়াকে বলতে পারে সেই চিন্তায় একজন মুখপাত্র নির্বাচন করা হল গণজাগরণ মঞ্চ থেকে। এখনও সেই মানুষটি যদি ‘মুখপাত্র’ পদবিই বহন করে থাকে তবে তার দায়িত্ব সেটাই আছে বলে আমি জানি। অন্যভাবে এটাও বলা যায়, ‘তিনি যা বলেন তা গণজাগরণ মঞ্চের সাথে জড়িত সকলের কথা!
‘গত দুই বছরে বা গত দুই মাসে অথবা গত দুই সপ্তাহে তিনি যা বলেছেন তা ঠিক কতখানি মঞ্চের সাথে মানসিক বা শারীরিকভাবে সম্পৃক্ত গণমানুষের কথা? আমার জানামতে ২০১৩এর ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় দিবস উদযাপনের জন্য আমরা বিশাল একটি কর্মী বাহিনীর নাম পরিচয়ের ডাটা তৈরি করেছিলাম। যেখানে আমার নামও আছে। সেই ডাটা পরবর্তীতে মুখপাত্রের ইচ্ছেতে বদলাতে পারে বা বদলেছে হয়তো। কারণ কর্মসূচির কোন ম্যাসেজ ইদানিং আমি আর মুঠোফোনে পাই না। সে যাই হোক, ঐ ডাটায় অন্তর্ভুক্ত সকলকে মঞ্চের কর্মী হিসেবে ইতিহাস জানবে এমন একটা সম্ভাবনাও তখন ছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা তৈরি করা যেমন কষ্টকর, কারণ সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করেও নানাভাবে তারা মুক্তির জন্য লড়ে গেছেন। সেইরকম গণজাগরণ মঞ্চের সেই ডাটায় নাম না থাকা লক্ষ মানুষ আছেন যাদের অংশগ্রহণ মঞ্চের সাথে রক্তের বাঁধনের মত। এখন প্রশ্ন হচ্ছে মুখপাত্র যা বলছে তা কি আদৌ গণজাগরণ মঞ্চের কথা? অর্থাৎ গণজাগরণ মঞ্চের লক্ষ কোটি মানুষের কথা?
আমার ধারনা শাহবাগে জনা পঞ্চাশেক মানুষ নিয়ে একটি এক্টিভিটি চলছে। ইমরান এইচ সরকার তার মুখপাত্র অথবা নেতা বটে। কিন্তু কিছুতেই সেটি ২০১৩ এর ৫ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেয়া গণজাগরণ নয়। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত এই লক্ষ কোটি মানুষ এই কথাটি জানান না দিচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত ইমরান এইচ সরকারের সকল কথাই ইতিহাসের কাছে গণজাগরণ মঞ্চ তথা মঞ্চের মানুষের কথা। এমনকি শফিক রেহমান প্রসঙ্গে তার বক্তব্যও যখন মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে তিনি দিচ্ছেন তখন সেই বক্তব্য কিন্তু গণজাগরণ মঞ্চের সকল কর্মীর বক্তব্য হিসেবেই ইতিহাসের কাছে নথিভুক্ত হবে।
আমার আপত্তিটা এখানেই!
তিনি ব্যক্তি মানুষ হিসেবে তার বাক স্বাধীনতা ব্যবহার করে যা খুশি তাই বললে, আমার কোন আপত্তি নাই। কিন্তু গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র হয়ে তিনি যখন আমার কথা বলেন তখন তার নানান হঠকারী বক্তব্যে আমার আপত্তি আছে। গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র পদটি সেচ্ছায় তিনি ছাড়বেন এমন আশা তার কাছে আমি করতেই পারি। তিনি নিশ্চয়ই ইতিহাসের প্রতি, সেই গণ মানুষের প্রতি সম্মান দেখাবেন।
আর না ছাড়লে কবি গুরুর ভাষায় “আমাদের উচিত সভা ছেড়ে উঠে আসা” এবং আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মানপূর্বক তাকে অব্যহতি প্রদান করা। সেই যজ্ঞ কবে হবে আমি জানি না।
আজ এই ক্ষুদ্র লেখার মাধ্যমে আমি তামান্না সেতু মঞ্চের একজন ক্ষুদ্র কর্মী আজ থেকে ইমরান এইচ সরকারকে গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানালাম।তার কথা আমার কথা নয়। গণজাগরণ শব্দটির অর্থ যদি পঞ্চাশ থেকে ষাটজন মানুষ হয়ে থাকে, তবে সেই মুষ্টিমেয় মানুষের কথা সে বলতে পারে। কিন্তু যে গণজাগরণ ৫ ফেব্রুয়ারি জন্মেছিল, সেই লক্ষ কোটি মানুষের কথা মুখপাত্র বলছেন না। তিনি মুখপাত্র পরিচয় ব্যবহার করে নিজের কথা বলছেন। এটা অন্যায়, এটা অপরাধ।









