মাননীয় তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু একটা অপ্রিয় সত্যকথা বলে ফেঁসে গেলেন।
নিজস্ব প্যাডে ক্ষমা প্রার্থনার পরেও তা শেষ হলো না সংসদে প্রকাশ্যে ক্ষমা
প্রার্থনা করতে হলো। দেশের মানুষ বুঝে গেল ইনু মাফ চাইতে বাধ্য হলেন।
মন্ত্রীদের মধ্যে অনেকেই অযৌক্তিক, অবান্তর মিথ্যাচারে ঠাসা কথা বলে থাকেন
সেগুলোর জন্য মাফ চাইতে হয় না, মাফ চাইতে হয় সত্যকথনে।
‘গাছেরও খায় তলেরও খায়’, ‘সরকার দলের সুবিধা নেয়, বিরোধী দলের সুবিধাও নেয়’ এমন একটি পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক দলের এমপিদের সাথে ১৪ দলীয় জোটের প্রধান শরীক আওয়ামী লীগের এমপিরা যেভাবে ইনুর উদ্দেশ্যে তেড়ে এলো সেটা খুবই দুঃখজনক। বাংলাদেশের অধিকাংশ এমপিরাই এপিএস কেন্দ্রিক। তারা একেকজন সংসদীয় এলাকার রাজা-জমিদারের মতো। তার উজির-নাজির-পাইক-পেয়াদারা কী করছে তা প্রধানমন্ত্রী জানেন না, এমপিরা জানেন, দলীয় নেতাকর্মীরা জানেন ও দেশের সাধারণ মানুষ জানেন।
এমপিরা এতোটাই স্বেচ্ছাচারী যে প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভানেত্রীর নির্দেশনাও মানেন না। প্রধানমন্ত্রী সাংসদদের এলাকায় যেতে বলেছেন। কিন্তু কজন সাংসদ এলাকায় গেছেন অথবা যাবেন। দেশের সংকট মুহূর্তে ১৪ দল ছাড়া কাউকে রাজপথে দেখা যায় না। জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে এমপিদের নূন্যতম ভূমিকাও দেখছে না মানুষ।
ইনু সাহেব বলেছেন, ‘আমি এমপি হয়ে বুঝেছি কিভাবে ৩০০ টন মালের মধ্যে ১৫০ টন মেরে দেয়া হয়। এরপর বাকি ১৫০ টনের মধ্যে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা মেরে দেয়। এতেই বুঝা যায় কি উন্নয়ন কাজ হচ্ছে দেশে। দেশে এখন গণতন্ত্র, দলতন্ত্র, জোটতন্ত্র কোনটাই নেই চলছে এমপিতন্ত্র।’
অনেক জায়গায় সরকার দলীয় নেতারাও লাঞ্ছিত হচ্ছে এমপি ও তার এপিএসদের হাতে। এপিএস নিয়োগে দল ও জোটের মতামতের কোন ব্যাপার নেই। এমপির ইচ্ছাই চূড়ান্ত। এমপি ইচ্ছা করলে অন্য দল ও অন্য এলাকার যে কোন ব্যক্তিকে এপিএস বানিয়ে দিতে পারেন। কিন্তু কেন এই এপিএস। তার কাজ কী। তার বেতন কত। বেতন কে দেয়। প্রতিটি সংসদীয় এলাকায় এপিএসদের দুর্দান্ত প্রতাপ।
পুলিশ, ইউএনও দলীয় সভাপতি সাধারণ সম্পাদকের চেয়ে এপিএসের কথা বেশী শুনেন। শোনা যায় যে এপিএস এমপির অনিয়ম-দুর্নীতি যত বেশি গোপন রেখে চলতে পারে সে তত যোগ্য ও বিশ্বস্ত এপিএস। টিআর, কাবিখা তথা উন্নয়ন বরাদ্দের নয়ছয়ে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন এই এপিএসগণ। কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তাদের দেখা যায় না। তারা ব্যস্ত থাকেন বিল, হাওড়, উন্নয়ন বরাদ্দ ও টিআর, কাবিখা নিয়ে।
সরকারের উচ্চ পর্যায়ের একটি টিম প্রতিটি সংসদীয় এলাকার টিআর, কাবিখা ও অন্যান্য উন্নয়ন বরাদ্দের পরিমাণ ও প্রয়োগ সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে পারেন। উন্নয়ন বরাদ্দের নয়ছয়ে আরও একটি অপপ্রক্রিয়া রয়েছে। প্রতি এমপিকে ঘিরেই খাদ্যগুদাম কেন্দ্রিক সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন বরাদ্দের চাউল, গম বাধ্যতামূলকভাবে তাদের কাছেই কম মূল্যে বিক্রি করতে হয়।
মসজিদ-মন্দিরও তাদের প্রাপ্ত চাউল গম ন্যায্য মূল্য পেয়ে স্বাধীনভাবে বিক্রি করতে পারে না। এমপিদের এমনই সর্বগ্রাসী আধিপত্য ও স্বেচ্ছাচারিতা চলছে! মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাও তারা মানেন না। তাদের এলাকায় যেতে বলা হয়েছে উন্নয়ন কাজ তদারকি, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভূমিকা রাখতে। কিন্ত বাস্তবতা কী বলে? এর আগে বিএনপি-জামায়াত হতে লোকজনদের আওয়ামী লীগে যোগদান করাতে নিষেধ করা হয়েছিল। বাস্তবতা কী বলল। এমপিরা তাদের উপ-দলের শক্তি বৃদ্ধি করতে দলে দলে যোগদান করল।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সংসদীয় দলের সভায় কতিপয় এমপি বলল, পুলিশ বিভাগে জামায়াত বিএনপির অনুচর রয়েছে। তখন প্রধানমন্ত্রী বললেন, পুলিশ আন্তরিক ভাবে জঙ্গি দমনে ভূমিকা রাখছে। সেই সাথে তিনি এও বললেন, কতধরনের লোকতো আমাদের মাঝেও আছে। এতে বুঝা যায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এসব ব্যাপারে জ্ঞাত আছেন। কিন্তু শুধু জ্ঞাত থাকলে হবে না ত্বরিত ব্যবস্থা নিতে হবে।
ইনু সাহেবের অপ্রিয় সত্য কথাটা বাংলার মাটিতে হজম হল না। এ প্রেক্ষিতে ‘চোরের মায়ের বড় গলা’ কথাটাই মনে পড়ে গেল। থিউডর রেইনকিং নামে একজন বই খেকো লেখকের কথাও মনে পড়ল। তিনি গণতান্ত্রিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ১৬৪৪ সালে একটি বই লিখলেন। তৎকালীন ডেনমার্কের রাজা ৬ম ক্রিস্টিয়ান এতে ক্ষুব্ধ হন। লেখককে দুটো শাস্তির যে কোন একটি গ্রহণ করতে বলেন।
এক. রাজার কাছে মাফ চাইতে হবে। দুই. নিজের লেখা বইটি নিজেকেই রাজার সামনে খেতে হবে। থিওডর রেইনকিং দুই নম্বর শাস্তিটাই বেছে নিলেন। স্যুপের সঙ্গে মিশিয়ে রাজার সামনেই বইটা ছিঁড়ে খেয়ে ফেললেন।
ইনু সাহেব ক্ষমা প্রার্থনা না করে সংসদে লাঞ্ছিত হলে, মন্ত্রীত্ব হারালে তার এই সত্যকথন জনগণের মাঝে প্রশংসিত হতো। কিন্তু সাহসী হতে পারলেন না। চাপের মুখে তার এই সত্যকথনকে কবর দিয়ে দিলেন। কিন্তু তাতে কী? এমপিদের অনাচার, অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার বাস্তবতা ইনু সাহেবের সত্যকথনের কবরে ঘাস হয়ে জেগে থাকবে। প্রজন্মকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে যেতে থাকবে এই অনাকাঙ্ক্ষিত বাস্তবতা।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)









