যেসব প্রক্রিয়াজাত খাবার প্রায় প্রতিদিন খাচ্ছেন, সেসবেই মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি
প্রক্রিয়াজাত খাবার ও হার্টের ক্ষতি সম্পর্কিত তথ্য উপস্থাপন করে চ্যানেল আই অনলাইন।. Channel i News – চ্যানেল আই নিউজ
ভিডিও প্রতিবেদনের বিস্তারিত তথ্য ও প্রাসঙ্গিক বর্ণনা নিচে পড়ুন।
সসেজ, বেকন, কোমল পানীয়, প্যাকেটজাত স্ন্যাকস কিংবা বিভিন্ন ধরনের সস ও বেকারি পণ্য এখন অনেকেরই দৈনন্দিন খাদ্যতালিকার অংশ। এসব খাবারে ব্যবহৃত কিছু সংরক্ষণকারী বা প্রিজারভেটিভ উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ানোর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে বলে জানিয়েছে ফ্রান্সের নতুন এক গবেষণা। তবে গবেষকরা বলছেন, এটি সম্পর্ক দেখিয়েছে, সরাসরি কারণ প্রমাণ করেনি।
প্রতিদিনের ব্যস্ত জীবনে সহজে পাওয়া যায় এবং দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় এমন খাবারের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ফলে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যও এখন অনেক পরিবারের নিয়মিত খাদ্যতালিকার অংশ। কিন্তু এসব খাবারে ব্যবহৃত সংরক্ষণকারী বা প্রিজারভেটিভ দীর্ঘমেয়াদে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে ফ্রান্সের এক গবেষণা।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন European Heart Journal এ। গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন ফ্রান্সের National Institute of Health and Medical Research (INSERM)’র গবেষণা পরিচালক ড. ম্যাথিল্ড টুভিয়ে এবং গবেষক আনাইস হাসেনবোলার। গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল, প্রক্রিয়াজাত খাবারে ব্যবহৃত বিভিন্ন সংরক্ষণকারী মানুষের হৃদ্স্বাস্থ্য ও রক্তচাপের ওপর দীর্ঘমেয়াদে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, তা মূল্যায়ন করা।
এই গবেষণায় ফ্রান্সের ১ লাখ ১২ হাজার ৩৯৫ জন প্রাপ্তবয়স্কের খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য গড়ে সাত থেকে আট বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা খাদ্যে ব্যবহৃত বিভিন্ন প্রিজারভেটিভ গ্রহণের মাত্রা এবং উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের মধ্যে কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা খুঁজে দেখেন।
গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, যারা সবচেয়ে বেশি পরিমাণে নন-অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট প্রিজারভেটিভ গ্রহণ করেন, তাদের উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার ঝুঁকি ২৯ শতাংশ বেশি। একই সঙ্গে হৃদরোগ, স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকসহ বিভিন্ন কার্ডিওভাসকুলার রোগের ঝুঁকি ১৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। অন্যদিকে, যারা বেশি পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট প্রিজারভেটিভ গ্রহণ করেছেন, তাদের মধ্যেও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি ২২ শতাংশ বেশি পাওয়া গেছে।
গবেষণায় বিশেষভাবে আটটি বহুল ব্যবহৃত সংরক্ষণকারীর সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এগুলো হলো পটাশিয়াম সরবেট (E202), পটাশিয়াম মেটাবাইসালফাইট (E224), সোডিয়াম নাইট্রাইট (E250), অ্যাসকরবিক অ্যাসিড (E300), সোডিয়াম অ্যাসকরবেট (E301), সোডিয়াম এরিথরবেট (E316), সিট্রিক অ্যাসিড (E330) এবং রোজমেরি নির্যাস (E392)। এর মধ্যে অ্যাসকরবিক অ্যাসিড (E300)-এর সঙ্গে হৃদরোগের ঝুঁকিরও একটি পরিসংখ্যানগত সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
এসব প্রিজারভেটিভ মূলত খাবারের স্বাদ, রং এবং গুণগত মান দীর্ঘদিন ধরে ঠিক রাখতে ব্যবহার করা হয়। সসেজ, বেকন, প্রসেসড মাংস, প্যাকেটজাত চিপস ও স্ন্যাকস, কোমল পানীয়, ফলের জুস, বিভিন্ন ধরনের সস, আচার, বেকারি পণ্য, ক্যানজাত খাবার এবং দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য বিভিন্ন খাদ্যে এগুলোর ব্যবহার ব্যাপক।
তবে গবেষকরা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করে বলেছেন। তাদের মতে, এই গবেষণায় প্রিজারভেটিভ এবং উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদরোগের মধ্যে একটি সম্পর্ক (association) পাওয়া গেছে, কিন্তু এটি কারণ-ও-ফলাফল (cause and effect) প্রমাণ করেনি। অর্থাৎ, শুধু প্রিজারভেটিভই সরাসরি এসব রোগের জন্য দায়ী, এমন সিদ্ধান্ত এই গবেষণা থেকে টানা যাবে না। কারণ খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক কার্যক্রম, ধূমপান, অতিরিক্ত ওজন, বংশগত বৈশিষ্ট্য এবং অন্যান্য জীবনধারাগত বিষয়ও হৃদরোগের ঝুঁকিকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করে। তাই বিষয়টি আরও নিশ্চিতভাবে বোঝার জন্য ভবিষ্যতে অতিরিক্ত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বজুড়ে হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপের প্রকোপ যেভাবে বাড়ছে, তাতে প্রক্রিয়াজাত খাবারে ব্যবহৃত খাদ্য সংযোজকের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যপ্রভাব নিয়ে আরও গভীর গবেষণা জরুরি। একই সঙ্গে খাদ্যশিল্পে ব্যবহৃত সংরক্ষণকারীর নিরাপদ মাত্রা নিয়মিত মূল্যায়ন করারও প্রয়োজন রয়েছে।
গবেষকরা সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে, দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় তাজা ফল, শাকসবজি, ডাল, মাছ এবং কম-প্রক্রিয়াজাত খাবারের পরিমাণ বাড়ানো উচিত। পাশাপাশি অতিরিক্ত প্যাকেটজাত ও দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমানো এবং বাজার থেকে খাবার কেনার সময় পণ্যের লেবেলে ব্যবহৃত উপাদান ও সংরক্ষণকারীর তথ্য পড়ে সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
গবেষকদের মতে, আধুনিক জীবনযাত্রায় প্রক্রিয়াজাত খাবার পুরোপুরি এড়িয়ে চলা সব সময় সম্ভব না হলেও সচেতনভাবে এবং পরিমিত পরিমাণে এসব খাবার গ্রহণ করলে সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। তাই হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা, ধূমপান থেকে বিরত থাকা এবং অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
ভিডিও প্রতিবেদনে দেখুন:
https://www.youtube.com/watch?v=cCt4ZW74VLo






