“ছবিটি দেখি মনো হলো আমারতো মরে যাওয়াই ভালো ছিলো। এই পৃথিবীতে আমার বেঁচে থাকার আর কোন কারণ নেই” কথাগুলো মিয়ানমারের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের একজন জাফর আলমের। যার সন্তানের মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা একটি ছবি তীব্র নাড়া দিয়েছিলো মানবিক বোধকে। সিরিয়ান শিশু আয়লান কুর্দির ঠিক এমনই একটি ছবি বিশ্ব বিবেককে হতচকিত করে দিয়েছিলো। সেই ছবি প্রকাশের বছরাধিককাল পর মানবিক বিপর্যয়ের আরও এক হৃদয়বিদারক দৃষ্টান্ত এই রোহিঙ্গা শিশুর ছবি। মাত্র ১৬ মাস বয়সী এই শিশুর নাম মোহাম্মদ শোহায়েত। বেঁচে থাকার আকুতিতে মা, চাচা, এবং তিন বছর বয়সী ভাইয়ের সাথে বাংলাদেশ সীমান্তে ঢোকার চেষ্টা করেছিলো সে। কিন্তু মিয়ানমার সীমান্তে পুলিশের গুলির মুখে অতিরিক্ত লোক বোঝাই নৌকাটি ডুবে যায়।
রাখাইন রাজ্যের সংঘাত থেকে পালিয়ে বাঁচতে চাওয়া পরিবারকে হারানো জাফর মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএনকে এমনটি জানান। বাংলাদেশের টেকনাফে লেডা শরণার্থী শিবিরে থাকা জাফর বর্ণনা দেন তার করুণ জীবনের। “আমার আর কেউ নেই। আমার দুই সন্তান, স্ত্রী মারা গেছে। আমি শেষ হয়ে গেছি।”
তবে এ ধরণের নিপীড়ণের অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছে মিয়ানমার সরকার। সরকারের এক মুখপাত্র জাফরের এই বক্তব্যকে মিথ্যা প্রচারণা বলে দাবি করেছে। বুধবার সরকারগঠিত কমিশন তাদের প্রাথমিক প্রতিবেদনে রাখাইন রাজ্যে গণহত্যার এবং ব্যাপক হারে ধর্ষণ অভিযোগের প্রমাণ পায়নি বলে জানায়। তবে একে শুধু সত্য গোপনের অপচেষ্টা বলে মন্তব্য করেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
বাংলাদেশে কূটনৈতিক দল পাঠাবে মিয়ানমার
রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে আলোচনার জন্য ডেপুটি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি দল এই মাসের শেষে বাংলাদেশে আসতে পারে বলে বৃহস্পতিবার মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক কিয়াও জায়া জানান।

ধর্মের ভিত্তিতে বিচার উচিত নয়
আজ থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডন প্রামুদুনাই ব্যাংকক পোস্টকে মিয়ানমারের প্রভাবশালী নেত্রী অং সান সু চি’র সমর্থনে বলেন, রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতনের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন তিনি। ডিসেম্বরে ইয়াঙ্গুনে আসিয়ানের নয়টি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে বৈঠকে সু চি এই ইতিবাচক মনোভাব দেখান বলে তিনি জানান। তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গা বিষয়টিকে ধর্মের ভিত্তিতে বিচার করা মিয়ানমারের উচিত হবে না, কারণ আসিয়ানের ৬২৫ মিলিয়ন নাগরিকের মধ্যে বিশ্বের মুসলিম জনগোষ্ঠির ৪৭ শতাংশই রয়েছে।
লোমহর্ষক বর্ণনা
বাংলাদেশের সীমান্তে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া অনেকেই নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা দেন বিশ্ব গণমাধ্যমের কাছে। এমন একজন মসুনা বেগম বলেন, সেনাদের এক বিশাল বহর আমাদের গ্রামে প্রবেশ করেই গুলিবর্ষণ ও বাড়িতে আগুন দেওয়া শুরু করেছিলো। নারী-পুরুষদের তারা আলাদা করে ফেলে। নারীদের জঙ্গলে নিয়ে যায়। আমাকে দুইজন সেনা ধর্ষণ করেছিলো এবং আমার স্বামীকে তারা হত্যা করে।
গত অক্টোবরে মিয়ানমারের সীমান্ত চৌকিতে হামলার ঘটনার পর থেকে বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত সংখ্যালঘু বলে বিবেচিত রোহিঙ্গাদের দুর্দশার প্রকট চিত্র উঠে আসে আক্রান্তদের বর্ণনায়। বহু প্রজন্ম ধরে রাখাইন রাজ্যে বাস করা সত্যেও ‘রাষ্ট্রহীন’ রোহিঙ্গাদের বাঙ্গালি অভিবাসী বলে দাবি করে দেশটির সরকার।
পলায়নপর জীবন
সিএএনকে জাফর আলম বলেন, আমাদের গ্রামে হেলিকপ্টার থেকে গুলি করা হয় এবং মিয়ানমার সেনারাও আমাদের উপর নির্বিচারে গুলি করে। আমরা বাড়িতে থাকতে পারতাম না। আমি পালিয়ে জঙ্গলে আশ্রয় নেই। আমার দাদা এবং দাদী পুড়ে মারা যায়। আমাদের পুরো গ্রাম জ্বালিয়ে দেয় সেনারা।
সেনারা রোহিঙ্গাদের খুঁজতে থাকায় অনবরত স্থান বদল, গ্রাম থেকে গ্রামে পালিয়ে বেড়ানোর কথা বলেন জাফর, আমি ৬ দিন হেঁটেছি। ৪ দিন ভাত খেতে পারিনি। এই ছয়দিন ঘুমাতেও পারিনি। তিনি জানান, এই পলায়নপর জীবনে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় সে এবং কোনমতে নাফ নদীতে পৌঁছাতে পারে। সে সাঁতার দিয়ে নদী পার হওয়ার চেষ্টা করে। নদীতে এক বাংলাদেশী জেলে তাকে নৌকায় তুলে নিয়ে সীমান্ত পার করে দেয়। এরপর তার পরিবারকেও এপারে আনার চেষ্টা করে সে। এক জেলের সঙ্গে কথা বলে তার স্ত্রী এবং দুই সন্তানকে এপাড়ে নিয়ে আসার জন্য।
পরিবারের সাথে শেষ কথা
পরিবারে সঙ্গে সর্বশেষ ডিসেম্বরের ৪ তারিখ কথা হয় বলে জানান জাফর। এরপরের দিনই তাদের মৃত্যুর খবর পান তিনি। তিনি বলেন, তারা (পরিবার) মিয়ানমার ত্যাগ করার জন্য মরিয়া ছিলো। আমি যখন আমার স্ত্রীর সাথে ফোনে কথা বলছিলাম, তখন আমি আমার ছোট সন্তানকে “আব্বা আব্বা” বলে ডাকতে শুনি। এই ফোনকলের কিছুক্ষণ পরেই আমার পরিবার পালানোর চেষ্টা করে।
কত লাশ, শুধু নদী জানে
নির্যাতনের মুখে এই পর্যন্ত অসংখ্য রোহিঙ্গা বাংলাদেশ সীমান্তে প্রবেশের চেষ্টা করে। অভিবাসী বিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা জানায় সাম্প্রতিক সপ্তাহ ও মাসগুলোতে প্রায় ৩৪ হাজার লোক নদী পার হয়েছে। জাফর বলেন, শুধু মাত্র নদীটি (নাফ) জানে কতগুলো মৃতদেহ এখানে ভেসে রয়েছে। শরণার্থী শিবিরে খাবার-থাকা নিয়ে সমস্যা থাকলেও অন্তত মৃত্যু ভয় নেই বলে জানান তিনি।
আন্তর্জাতিক চাপে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করে মিয়ানমার সরকার। এই কমিশনও সরকারের ত্বরিৎ পদক্ষেপ চায়। তবে একে শুধুমাত্র একটি ধোঁয়াশা বলেছেন জাফর।

এই সময় শুধু আরও রক্ত ঝরানোর জন্য
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ানে সম্প্রতি এই রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়। যেখানে মিয়ানমারের প্রভাবশালী নেত্রী নোবেলজয়ী অং সান সু চি এই সমস্যা সমাধানে সরকারের অঙ্গীকারে কথা জানালেও বলেন এর জন্য সময় লাগবে। তবে জাফর আলমের মতে, এই সময় শুধু আরও রক্ত ঝরানোর জন্য। আমি বিশ্বকে জানাতে চাই, মিয়ানমার সরকারকে আর সময় দেওয়া উচিত নয়। তোমরা ব্যবস্থা নিতে দেরি করলে সকল রোহিঙ্গাদের তারা মেরে ফেলবে।
এর আগে রোহিঙ্গাদের উপর মিয়ানমার সরকারের নির্মমতার অনেক প্রমাণ পাওয়া যায়। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ করে সামরিক বাহিনীর অসংখ্য ঘর পুড়িয়ে দেওয়ার প্রমাণ দেয়। এছাড়াও বহুল বিস্তৃত ও পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গা হত্যা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে বলেও শঙ্কা প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামেনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। রাখাইনে সংঘটিত ‘জাতিগত নির্মূল ও মানবতাবিরোধী অপরাধের ফলে সৃষ্ট মানবিক দুর্যোগ’ বন্ধে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রতি আহ্বান জানান বেশ কয়েকজন নোবেল বিজয়ী, যাদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশের ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
নিরাপত্তা অভিযানে রোহিঙ্গা মুসলিমদের নির্দয়ভাবে মারছে পুলিশ, এমন একটি ভিডিও প্রকাশের পর এই সপ্তাহের শুরুতে কয়েকজন পুলিশ আটক হয়, যা বর্বরতার সাক্ষী দেয়। তবে সাংবাদিক ও তদন্তকারীদের রাখাইন রাজ্যে যেতে দেওয়া হচ্ছে না বলে স্বাধীনভাবে ঘটনাগুলো যাচাইয়ের সুযোগও নেই।
গত দুইমাসে ৫০ হাজারের মতো রোহিঙ্গা বাংলাদেশ সীমান্তে প্রবেশ করে। জাতিগত সংঘাতে ২০১২ সালেও এই নির্যাতিত সম্প্রদায়ের অসংখ্যজন নিহত এবং ১ লাখ লোক বাস্তুচ্যুত হয়।








