কথায় বলে- মা-বাবার কথা অমৃত সমান। বাবা আটপৌরে সরকারি চাকুরে ছিলেন। এর বাইরে সারা বছর আমাদের শহরের বাড়ির আঙ্গিনায় গাছগাছালি আর শাক-সব্জি আবাদে সময় ব্যয় করতেন। আমাদের নয় ভাইবোনের বৃহৎ সংসারে কখনো দুধ, ফলমূল আর শাক-সব্জির ঘাটতি ছিল না।
মা নিজের হাতে গরুর দুধ দোহাতেন। একটি মাত্র রাখাল বালক আর মায়ের কাজের সহযোগী। একজন মহিলা ছিলেন আমাদের বাড়ির বাড়তি মানুষ। মা এমনকি সন্ধ্যে বেলায় রাখাল বালক মজিদকে পাঠদান করতেন।
আজ কেবল বাবার কথাই লিখতে বসেছি। আমাদের বাড়ির আঙ্গিনায় সারাবছর মৌসুমি লাউ, কুমড়া, মিষ্টি কদু, সিম, ঝিঙ্গে, বরবটি, ঢেঁড়স, উচ্ছে, করলা, লাউ শাক, লাল শাক, আর পুকুর পাড়ে থাকত একেবারে ফ্রি কলমি শাক। গাছ পরিচর্যার কাজে আমরাও যথাসাধ্য সহযোগিতা করতাম। আমি বাড়ির সবচেয়ে ছোট সন্তান হওয়ায় বাবা’র বার্ধক্যে আমি ছিলাম তাঁর ‘আছনি-পাছনি’র সহযোগী।
বেড়ার খুঁটি গাড়ার কাজে সহযোগিতা, বেড়া বাঁধা, গাছে নিয়মিত পানি দেয়া, বাড়ির পেছনে কোণার গোবর গর্ত থেকে শুকনা গোবর এনে গাছের নীচে দেয়া এসবই আমরা করতাম বাবার নির্দেশে। গাছ-গাছালির মধ্যে কেবল কয়েক ডজন নারিকেল গাছ, কিংবা শতাধিক সুপারি গাছই নয়, আম, জাম, কাঠাল, আমলকি, সফেদা, শরিফা, ডালিম, বড়ই, কয়েক প্রকারের কলা, পেয়ারা, জাম্বুরা, বাতাবি লেবু সব গাছই ছিল। এসবই বাবার লাগানো।
বাবা সবসময় বলতেন- “মানুষের হাতে আলসি আছে, কিন্তু মাটিতে আলসি নেই”। হবিগঞ্জে একসময় আমাদের বাড়িটি বিখ্যাত ছিল বসরাই গোলাপের জন্য। এই গোলাপ লাগিয়ে ছিলেন আমার সেজো ভাই। ১৯৭৪ সালের বন্যায়, এক মাসের পানি বন্দীতে সে গোলাপের বংশ উজাড় হয়। শুধু গোলাপ কেন, গন্ধরাজ, হাসনাহেনা, জুঁই, বেলী, বোগেনবিলিয়া, পাতাবাহারে পুরো বাড়িটি থাকত সারাবছর উদ্ভাসিত। একুশে ফেব্রুয়ারি এলে আমাদের বাড়ির পাতাবাহারের ডাল-পাতা আর গাঁদা ফুল শহীদবেদীতে ঠাই পেত। বাড়ির দেয়াল ঘেঁসে জবাফুলের ডাল কুপে দিয়েছিলাম আমিই।
সেগুলো পরিচর্যার জন্য আমরা দু’ভাই (জুনু ভাইসহ) পানির লাইন টেনেছিলাম, এবং স্থায়ী টেপ লাগিয়েছিলাম। আমাদের জবাফুলগুলো পাড়ার হিন্দু প্রতিবেশীদের পূজার নৈবেদ্যে কাজে লাগত। আমাদের প্রতিবেশী পুরবী, সুরভী দিদি’রা বড় ভাই-বোনদের সঙ্গে আড্ডা মেরে ফিরে যাবার সময় খোঁপায় গুজে নিতেন গোলাপ, গন্ধরাজ, সন্ধ্যামালতি কিংবা ডালিয়া।
আজ কেবল বাবা’র কথাই লিখতে বসেছি। বাবা খুব ভাল ইংরেজী জানতেন। এমনকি আমাদের হবিগঞ্জ সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পর্যন্ত বলতেন- এই শহরে যদি দু-চারজন লোক ভাল ইংরেজী জানেন, তাহলে তোমার বাবা একজন। সেই বাবার সন্তান আমি যখন ইংরেজী নিয়ে অথৈ সাগরে হাবুডুবু খেতাম, তখন দুঃখের সীমা থাকত না!
মনে পড়ে- আমাদের ভাইবোনদের সবার ইংরেজী রচনা বাবা নিজেই মন থেকে লিখে দিতেন। গরুর রচনা (দ্যা কাউ) থেকে শুরু করে মেমোরেবল ডে, এইম ইন লাইফ সবই! সেসব পরীক্ষার খাতায় লিখতে পেরে আমার যে কী গর্ব হত! পরীক্ষায় কখনো খারাপ করেছি, বাবা অভয় দিতেন। একটি কবিতা ছড়া কেটে বলতেন- “যোগ্য যার ভাগ্য তার কিছুতে না টুটে, ডুবিলেও তরী তার পুনঃ ভাসি উঠে”!
আগেই বলেছি আমাদের বৃহৎ পরিবারে সবার পৃথক ঘুমানোর ব্যবস্থা ছিল না। ছোটবেলায় আমরা দু’ভাই (আমি ও জুনু ভাই) ঘুমাতাম বাবার দুই পাশে। বাবা প্রায়ই হাস্যরসের গল্প বলতেন ঘুমোনর আগে। কখনো খুবই সিরিয়াস কোনো গল্প। যেমন একটি গল্প ছিল এরকম- এক দুর্ভাগা পিতার পাঁচটি অলস সন্তান ছিল। পিতা মৃত্যু শয্যায়, সন্তানরা কাতর, তখন তিনি সন্তানদের উদ্দেশ্যে বলেন- ‘আমি দু’টি কলসিতে তোমাদের জন্য কিছু ধন রেখে যাচ্ছি। আমার মৃত্যুর পরই কেবল তোমরা প্রথম কলসটির মুখ খুলবে। প্রথম কলসের নির্দেশ মত কাজ সমাপ্ত হলে দ্বিতীয় কলসের মুখ খুলবে।
পিতার মৃত্যুর পর সন্তানরা যথারীতি প্রথম কলসের মুখ খুললে এর ভেতর একটি চিরকূট পেল। চিরকুটে লেখা ছিল- ‘আমি বাড়ির আঙ্গিনায় মাটির নীচে কিছু গুপ্ত ধন রেখে যাচ্ছি। তোমরা সে গুপ্ত ধন খুঁজে বের কর। ‘অলস সন্তানরা তখন নিতান্ত ঠেকায় পড়ে পুরো বাড়ির আঙ্গিনা কোদাল চালিয়ে খুঁড়ে ফেলল, কিন্তু গুপ্ত ধন পেল না! তখন তারা দ্বিতীয় কলসের মুখ খুলে আরেকটি চিরকূট পেল। সে চিরকূটে লেখা ছিল- “এবার তোমরা কর্ষিত জমিতে বীজ বপণ করো, তবেই গুপ্ত ধনের দেখা পাবে!” অলস সন্তানরা দায়ে পড়ে সে কাজটিও করল। এর কয়েকদিনের মধ্যেই তারা দেখতে পেল বাড়ির আঙ্গিনা জুড়ে ফসলের হাসি!
আজ বাবার কথা বেশি মনে পড়ল, কারণ বাবা মারা যাওয়ার পর আমাদের বাড়িটির আর সংস্কার হল না। বাড়িতে আর কোনো সব্জি বাগান হয় না। গরু গাভী বিদায় নিয়েছে বাইশ বছর আগে বাবার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে। আর হাঁস-মুরগী বিদায় নিয়েছে তিন বছর আগে মায়ের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে!
কেবল পুকুরে কখনো মাছের চাষ হয়, তাও আমি টাকা পাঠালে কিংবা চাপ দিলে! গরু কেন পালন হয় না, জিজ্ঞেস করলে ভাইবেরাদররা উত্তর দেন- “খুবই অসুবিধা”! হাঁস-মুরগী কেন নেই, জিজ্ঞেস করলে বলেন- “উঠোন ভর্তি বিস্টা থাকে, কে দেখবে?” শাক-সব্জি কেন নেই, প্রশ্ন করলে উত্তর আসে- “মাটিতে কোনো সার নেই, শাক-সব্জি হয় না!” এসবই আমার পৈত্রিক বাড়ির দৃশ্য!
কিন্তু আমি জানি বাংলাদেশের মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি কর্মঠ। বাংলাদেশের কৃষক সাবলম্বী। বাংলাদেশের মানুষ জেনে নিয়েছে বেঁচে থাকার মন্ত্র। কিন্তু সেই মানুষরাই আলস্যে দিনগোজরান করে যারা পরের উপর নির্ভরশীল! বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের একটি অংশ এই আলস্যের চাদরমুরি দিয়ে বসে আছে। তাদের জীবনে কোনও পরিবর্তন নেই! তাদের জন্যই বাৎসরিক বাজেটে বাড়তি চাপ পড়ে। অথচ প্রত্যেক বাবাই সন্তানকে শিখিয়ে যান বেঁচে থাকার মন্ত্র।
কেউ তা ভুলে যায়, কেউ বা লালন করে নিজের জীবনে কাজে লাগায়! বাবা সবসময় বলতেন- “পরিশ্রমে ধন আনে, পূণ্যে আনে সুখ। আলস্যে দারিদ্র আনে, পাপে আনে দুঃখ!” এদিকে প্রবাসের এই কর্মচঞ্চল জীবনে গ্রীষ্ম এলেই বাবার কথা বেশি মনে পড়ে।
আমি আমার বাড়ির পেছনটা পরিষ্কার করি। লাউ, বেগুন, মিষ্টি কুমড়া, করলা, কচু শাক, লাল শাক, লাউ শাক, টমেটো, শশা আবাদ করি। এসবের পেছনে বেশ অর্থ খরচ হয়। তবু নিজেকে সার্থক মনে করি বাবার কথা ভেবে- “মানুষের হাতে আলসি আছে, কিন্তু মাটিতে আলসি নেই”!
আমার প্রতিবেশিদের সঙ্গে এই একটি ব্যাপারে লেনদেন হয়- চারা আদান-প্রদান! মাটির প্রতি এই ভালবাসা চিরঞ্জীব হউক। কারণ এই মাতৃসম মাটির কাছেই আমাদের শেষ ঠিকানা!
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)









