চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

মাদকবিরোধী অভিযান যেন ইতিহাসের কলঙ্ক না হয়

চলমান মাদকবিরোধী অভিযান যেন ইতিহাসের কলঙ্ক না হয়। এই অভিযানকে স্বাগত জানাই। বাংলাদেশে এর আগে অপারেশন ক্লিনহার্ট থেকে শুরু করে নানা নামে বেশ কিছু অভিযান হয়েছে। সব অভিযান সার্থক হলেও তার প্রায় সবগুলো নিয়েই বিতর্ক রয়েছে। এবারের অভিযানও তা থেকে মুক্ত নয়।

বর্তমান অভিযানে কিছু খুচরো মাদক ব্যবসায়ী কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু একটি ঘটনা পুরো অভিযানকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। সেই ঘটনায় যিনি নিহত হয়েছেন, তিনি কক্সবাজারের টেকনাফ পৌরনভার একজন কাউন্সিলর, যিনি আবার ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতা হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। শুধু তাই নয়, সৎ ও অস্বচ্ছল জীবন ছিল তার।

বিজ্ঞাপন

তাই প্রশ্ন জাগে; এই হত্যার মাধ্যমে পুরো অভিযানই কী ব্যর্থতায় পর্যবসিত হচ্ছে? এতে সরকারের মূল উদ্দেশ্য কী শেষ পর্যন্ত পূরণ হবে?

এটা ঠিক যে, একটি গরীব সদ্য স্বাধীন দেশের আর্থসামাজিক উন্নতির জন্য লজিক্যাল ফ্যাসিবাদের প্রয়োজন আছে। কিন্তু তা নর্থ কোরিয়া মডেলে নাও হতে পারে, হতে পারে কিউবা মডেলে। কিউবা সরকার পরিচালনায় ভুল ত্রুটি থাকতে পারে। সেটি দেশ ও সমাজের জন্য গুরুতর কিছু নয়। তবে সমাজতন্ত্রিক বিপ্লবের পর সেসব দেশে প্রতিবিপ্লবীদের নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়। এতে আপাত তথাকাথিত মানাবধিকার লঙ্ঘন হলেও বিপ্লবের টিকে থাকার অনিবার্যতায় এই কাজগুলো অত্যন্ত প্রয়োজনীয় রাষ্ট্র পরিচালনার স্বার্থে, দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির স্বার্থে।

‘আপাতত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অকার্যকর’ বলে বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে বাকশাল কায়েম করেছিলেন। কিন্তু এই ব্যবস্থায় দেশীয় আন্তর্জাতিক মুনাফালোভী পুঁজিবাদীগোষ্ঠীর স্বার্থ বিনষ্ট হয়। তারই ধারাবাহিকতায় ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু নিহত হন। তারপর দেশে একবারে আমেরিকান গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়! এরপর? এখনও কূপমণ্ডুকরা বলে থাকে, বঙ্গবন্ধু গণতন্ত্র হত্যা করেছিলো। যে গণতন্ত্রে মেজরটি একটি হাস্যকর ব্যাপার। এখানে ক যদি ২ ভোট পায়, খ পায় ৩ ভোট আর গ ৪ ভোট পেয়ে জিতে যায়। অথচ ৫ ভোট মানে মেজরটি গ এর বিপক্ষে। এই হাস্যকর গণতন্ত্র থেকে সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রে গ কে কমপক্ষে ৫১ শতাংশ ভোট পেতে হবে। এসব বাহ্য।

এবার মূল কথায় আসি। এই সরকারের সকল ধরনের উন্নয়ন এবং অগ্রগতির পক্ষে তার সকল কর্মকাণ্ডের পক্ষে আমাদের অবস্থান সুদৃঢ়। দেশে রাজাকারের বিচার, জঙ্গিবাদ নির্মূূল থেকে শুরু করে সব অভিযানই দেশের স্বার্থে পরিচালিত হয়েছে। মাদকবিরোধী অভিযানে সরকার কতোটা সফল, সেটা আরো পরে বিচার করা যাবে। তবে এই সিদ্ধান্তগুলো রাজনৈতিক হলে নিজের দলের ত্যাগী সৎ নেতা বা কর্মী এর শিকার হতো না। প্রশাসনিকভাবে সরকার তার নিরঙ্কুশ অধিপত্য বা আনুগত্য পেয়েছে বলে মনে হয় না। কারণ সরকারের ভেতর সরকার বিনাশী গোষ্ঠী অত্যন্ত সুকৌশলে কাজ করে যাচ্ছে। সরকারকে বিপাকে ফেলতে বা সামনের নির্বাচনে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে এরা অত্যন্ত তৎপর।
চলমান মাদক বিরোধী অভিযানে সবচেয়ে বিতর্কিত হত্যাকাণ্ডটি নিহত কাউন্সিলর একরামুল হকের। ওসির কথা অনুযায়ী যার বিরুদ্ধে একটি মামলাও নেই। যিনি কিনা দুঃসময়ে আওয়ামী লীগের পরীক্ষিত একজন কর্মী ছিলেন। তাকে হত্যার মাধ্যমে একটি নিঃস্ব পরিবারকে নিঃস্বতর করে দেয়া হলো। নিহত একরামের মেয়ে দুটি একটি মর্মস্পর্শী চিঠি লিখেছে তাদের বাবাকে নিয়ে।

“প্রিয় বাবা
কেমন আছো তুমি! নিশ্চয় অনেক ভালো আছো। আমরা কিন্তু ভালো নেই। কারণ আমাদের পুরু পৃথিবীটা যে তোমাকে ঘিরেই ছিলো। সকালে ঘুম থেকে উঠার পর থেকে তোমার কাজ ছিলো তোমার রাজকন্যাদের রেডি করা। বাইকে করে প্রাইভেট পড়তে নিয়ে যাওয়া। স্কুলে পৌঁছে দেয়া।

জানো বাবা বাড়িতে অনেক মানুষ চাচা-চাচী,জেঠু-জেঠিমা,ফুফি-ফুফা আর বাড়ি ভর্তি কাজিনরা। সবার মাঝে তোমার ছায়া খুঁজে চলছি আমরা দুই অনাথ রাজকন্যা। বার বার রাজকন্যা বলছি কারণ তোমার চোখে আমরা রাজকন্যাই ছিলাম।

হয়তো খুব বেশী প্রাচুর্যপূর্ণ ছিলোনা আমাদের জীবন,কিন্তু কখনো কোন কিছুর অভাব তুমি বুঝতে দাওনি আমাদের। আমাদের ছোট বড় সব চাওয়া তোমার কাছে প্রাধান্য পেয়েছে সবার আগে।

সবার মুখে শুনেছি তোমার জানাজাতে প্রচুর মানুষের জমায়েত হয়েছিলো,ইসলাম ধর্মে মেয়েরা সেখানে যেতে পারেনা,তাই আমাদের দেখা হলো না স্বচক্ষে,তুমি কতটা জনপ্রিয় ছিলে সবার কাছে।

বিজ্ঞাপন

হয়তো ঈদের পর থেকে আমাদেরকে স্কুল বাস নিয়ে যাতায়াত করতে হবে। সে সময় তোমাকে অনেক মিস করবো। তোমার শরির থেকে বাবা-বাবা একটা ঘ্রাণ আসতো, খুব মিস করবো সে ঘ্রাণ।

তোমার গানের গলা যথেষ্ট প্রশংসনীয় ছিলো,আমাদের আবদারে সব গান গেয়ে শুনাতে। মিস করবো সে দরাজ ভরা কণ্ঠের গান।

তোমার ভালো মানের চশমার প্রতি লোভ ছিলো,তোমার রেখে যাওয়া সে সব চশমা আমাদের দিকে জ্বলজ্বল করে নির্বাক হয়ে তাকিয়ে আছে।

এই কিশোর বয়সে হারিয়ে ফেলবো তা কল্পনাতীত ছিলো।কিন্তু আল্লাহ্‌ তোমাকে নিয়ে গেলেন,হয়তো উনি তোমাকে আমাদের চাইতে বেশী ভালোবাসেন।

বাবা তোমার অসমাপ্ত স্বপ্ন আমরা পুরা করবো,তোমার দেখিয়ে দেওয়া পথে আমরা আজীবন চলবো।
তোমাকে কথা দিলাম,আমরা তোমার সত্যিকার রাজকন্যা হয়ে তোমার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবো। ওপরে অনেক ভালো থেকো বাবা।

ইতি
তোমার রাজকন্যাদ্বয়
তাহিয়াদ ও নাহিয়ান”

আমাদের কী জবাব আছে এই নিষ্পাপ শিশু দুটির কাছে? সত্যিকার মাদক ব্যবসায়ীর ছেলেমেয়েরা বিদেশে পড়ে। এলাকার স্কুলে বড় নেতাদের কোনো সন্তানরা পড়ে না এটা সবাই জানে। কোনো কুখ্যাত পিতাকে সন্তান এত ভালোবাসতে পারেনা।

প্রশ্ন হচ্ছে, এরা কারা? যারা সরকারের মাদকবিরোধী অভিযানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এদের চিহ্নিত করা হচ্ছে না কেনো? এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না কেনো? কারা তুচ্ছাছিতুচ্ছ ঘটনায় ছাত্রলীগকে বিতর্কিত করে? পাবলিকলি মিডিয়াতে একটি অপ্রমাণিত ভিত্তিহীন বিষয় নিয়ে আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালকে বিতর্কিত করা হচ্ছে কী কারণে? যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা ট্রাইব্যুনালকে প্রশ্নবিদ্ধ করলে কার লাভ? এই  সাধারণ হিসাবগুলো কি সরকার বুঝতে পারছে না? নাকি এসব দেখার দায়িত্ব ছদ্মবেশী আওয়ামী লীগ নেতাদের হাতে?

মাদক গডফাদার নামে খ্যাত বদি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর শুধুমাত্র নামের তথ্যগত ভুলে একজন ত্যাগী কাউন্সিলরকে, দলের একনিষ্ঠ নেতাকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হলো? প্রশ্ন জাগে কারা করছে এইসব? এদের চিহ্নিত করা জরুরি। নতুবা এই অভিযান পুরোটাই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের নির্মূল অভিযান হিসেবে ক্ষমতাসীন দলের বিশাল ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। আমরা তথাকথিত মানাবাধিকারের দোহাই দিচ্ছি না এখানে। আমরা শুধু স্বচ্ছ এবং সঠিক শত্রু বিনাশের অভিযানকে সার্থক করার কথা বলছি। কারণ সরকারের সকল সফলতা নিমিষেই ব্যর্থ হয়ে যাবে সামান্য কিছু সামান্য ভুলে।

এখানে উত্তর হতে পারে এত বড় অভিযানে কিছু ভুল হতেই পারে। কিন্তু আমরা ইতিহাস থেকে জেনেছি রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই সামান্য ভুলগুলো কখনো সামান্য ভুল নয়। এই সামান্য ভুল বিরাট প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াতে সময় নেবে মাত্র কয়েক মুহূর্তমাত্র। বিশ্ব রাজনৈতিক ইতিহাস সে কথা বলে। সমাজের জঞ্জাল সরাতে যে উদ্যোগ নিতে হয় সেটি খুব শোভন নাও হতে পারে, কিন্তু জঞ্জালের ভেতর দুয়েকটি সোনার খণ্ড চলে গেলে আখেরে গৃহস্থেরই ক্ষতি। আপাত ছোট দেখালেও এটি হতে পারে ভবিষ্যতে সব সম্পদ হারানো নিঃস্বতায়।আমরা চাইবো না এই সরকার নিজেদের ক্ষতি নিজেই ডেকে আনুক। সরকারের কল্যাণ চাই বলে এত কথার অবতারণা। এখন আরেকটি অনিবার্য অভিযান জরুরি হয়ে গেছে। সেটি হচ্ছে দুর্নীতি দমন অভিযান। আগামী নির্বাচনের আগে দুর্নীতি দমনে এই ধরনের অভিযান এখন সময়ের দাবি। কিন্তু আমাদের সতর্ক থাকতে হবে যে, চুনোপুঁটি দুর্নীতিবাজ নির্মূল করেই যেন তা শেষ না হয়। এবার চল্লিশ বছর ধরে জনগণের রক্তচোষা দুর্নীতিবাজদের সমূলে উৎপাটন চাই। এই ক্ষেত্রে সরকার সফল না হলে বা অভিযান না চালালে সরকারের সকল দুর্নীতিবিরোধী উচ্চারণ হাস্যকর, সস্তা আর ছেলে ভোলানো ছড়া হয়ে এই শাসনকে ব্যঙ্গ করবে। এবং সরকারের যাবতীয় উন্নয়ন ভেস্তে যাবে আগামী নির্বাচনের আগে, যেটি হয়ে উঠতে পারে সরকারের জন্য বুমেরাং।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View