চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

মওলানা ভাসানীর সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী চিন্তা ও আন্দোলন-সংগ্রাম

মওলানা ভাসানীর জীবদ্দশায় পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদী শাসকগণ মাওলানা ভাসানীকে ‘প্রফেট অব ভায়োলেন্স’, ‘ফায়ার ইটার’ অভিধায় চিহ্নিত করেছিলেন তার আজীবন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী রাজনৈতিক চিন্তা, আন্দোলন-সংগ্রাম ও ভূমিকার কারণে। ভাসানী রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই ভারতবর্ষে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন, অত্যাচার, নির্যাতন ও বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদী সামরিক জোটের বিরুদ্ধে জোরদার আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তুলতে ভূমিকা নেন।

যদিও সাম্রাজ্যবাদ নিয়ে আলোচনা, বিশ্লেষণ ও আন্দোলন সংগ্রাম বিভিন্ন মনীষী, দার্শণিক, সমাজবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক আন্দোলনের নেতা ও কর্মীগণ অনেক একাডেমিক ভলিউমের কাজ করে গেছেন। মার্কস এঙ্গেলস থেকে শুরু লেনিন-স্ট্যালিন, মাও সেতুং ও ল্যাটিন আমেরিকা, আফ্রিকার অনেক রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও তাত্ত্বিক এ বিষয়ে অনেক আলোচনা, লেখালেখি করেছেন।

যেমন ধরুন, মহামতি লেনিন ‘ইমপেরিয়ালিজম ইজ দ্য হায়েস্ট স্টেজ অব ক্যাপিটালিজম’ নামে একটি বই লিখে সাম্রাজ্যবাদের উৎপত্তি বিকাশ ও তাদের শ্রেণিচরিত্র নিয়ে অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করেছেন। এরিক হবসবম, আন্দ্রে গুন্ডার ফ্রাংক, সামির আমিন থেকে শুরু করে মাইকেল প্যারেন্টি, নোয়াম চমস্কি অনেক লেখালেখি করে গেছেন। একইভাবে ভারতবর্ষে এম.এন. রায়ও এই বিষয়ে অনেক আলোচনা করেছেন। প্রবন্ধের কলেবর বিবেচনায় সে সংক্রান্ত আলোচনা এখানে তুলে ধরার সুযোগ নেই। বাস্তবে মাওলানা ভাসানীও সাম্রাজ্যবাদ বিষয়ে খুব বেশি লেখেননি। যদিও তিনি জীবনব্যাপী সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন সংগ্রামে ব্যাপকভাবে নিজেকে ব্যাপৃত করেছেন।

তাই বর্তমান প্রবন্ধে শুধুমাত্র মওলানা ভাসানীর সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামকে অতি সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রথমত, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ মানুষের চিন্তাকে কিভাবে যাপিত জীবনের সকল কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে সে সম্পর্কে আলোকপাত করতে চেয়েছেন। অনেকেই মওলানা ভাসানীর ভাসান চর কিংবা সন্তোষের মতো গ্রামীণ পরিবেশে বসে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধীতা নিয়ে হাস্যরস, টিটকারী কিংবা কৌতুক করতে চেয়েছেন। কিন্তু আমার মনে হয় একমাত্র তিনিই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন সাম্রাজ্যবাদের নগ্ন থাবা ও বিরাট জালবিস্তার সম্পর্কে। তার কাছে সাম্রাজ্যবাদ এত বড় শক্তি ছিলো যে, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন তাকে যেদিক থেকেই ঢিল ছোঁড়া হবে সেখানেই লাগবে।

তিনি উপলব্ধি করেছিলেন এভাবে, সাম্রাজ্যবাদী শাসকগোষ্ঠী কীভাবে শ্রমিক কৃষক মেহনতি মানুষের রাজনীতিকে বৃহত্তর আন্দোলনের সাথে বিচ্ছিন্ন করে তুলতে চান সেই বিষয়ে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরি ‘মাও সেতুঙয়ের দেশে’ নামক বই হতে উদ্বৃতি তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘সমাজ-জীবনকে কলুষিত, অনটন-জর্জরিত এবং দুর্নীতির পঙ্কে ডুবিয়ে রাখা সাম্রাজ্যবাদীদের একটি কৌশল। কৃষক ও শ্রমিক শ্রেণীকে যদি কেবল অসহায় দুর্ভিক্ষের মোকাবিলা করার কাজে ব্যাপৃত রাখা যায় তবে তারা আর রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে চিন্তা করার সময় পাবে না। রাষ্ট্রব্যবস্থা ও শাসনযন্ত্র সম্পর্কে কৃষক শ্রমিকদের উদাসীন রাখা গেলে সাম্রাজ্যবাদী শোষণ অব্যাহত রাখা সহজ ও সম্ভব হয়।’

দ্বিতীয়ত, সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদবিরোধী চেতনা ও মনন থেকেই প্রথম তিনি মুসলীম লীগের বিপরীতে ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ গঠন করেন। এবং এই একই কারণে তিনি ১৯৫৯ সালে ‘ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠন করেন। এই বিষয়টি এখানে একটু বিস্তৃত আলোচনা জরুরি। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের ২১ দফায় সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ভূূমিকার কথা বলা থাকলেও পূর্ব পাকিস্তানের তদানীন্তন নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ক্ষমতায় যাওয়ার পর থেকেই সাম্রাজ্যবাদের সাথে বিশেষ করে আমেরিকার সাথে ঘাটছড়া বেধে কাজ করতে শুরু করেন। তিনি আমেরিকার সামরিক জোটে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে আপোসকামিতার পাশাপাশি তার দলের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী রাজনীতিকেও নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে শুরু করেন।

সোহরাওয়ার্দী শুধু তা করেই ক্ষ্যান্ত থাকেননি এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসভায় সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে জিরো+জিরো= জিরো তত্ত্ব দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের আপামর জনগণ ও তার দলের মূলনীতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেন। আবুল মনসুর আহমদ, খোন্দকার মোশতাক, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াসহ অনেকের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে পার্টির অভ্যন্তরে নেতিবাচক চিন্তার ক্যু করে ভাসানীকে কোণঠাসা করতে চেয়েছেন। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদবিরোধী রাজনীতি যার রক্তে শোণিত আছে তিনি কি সাম্রাজ্যবাদীদের আপোসকামিতার ফাঁদে পা দিবেন? তিনিও দেননি। মওলানা ভাসানী দলের বিপদ বুঝতে পেরে ১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনের মাধ্যমে দলের অভ্যন্তরে ও জনগণকে সাথে নিয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদ প্রশ্নে সোহরাওয়ার্দীর আপোসকামী রাজনীতির বিপক্ষে কঠোর অবস্থান ও হুশিয়ারী উচ্চারণ করেন।

বিজ্ঞাপন

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী

তিনি সোহরাওয়ার্দীকে সম্বোধন করে বলেছিলেন, ‘শহীদ তুমি আজ আমাকে পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তির সমর্থন করতে বলছো। তুমি যদি আমাকে বন্দুকের নলের সামনে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞেস করো, আমি বলবো না! তুমি যদি আমাকে কামানের নলের সামনে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞেস করো, আমি বলবো না! না! তুমি আমাকে যদি আমার কবরের উপরে গিয়েও জিজ্ঞেস করো সেখান থেকে আমি চিৎকার করে বলবো, না! না!’ একইভাবে তিনি ‘কাগমারীর ডাক’ শিরোনামে যে প্রচারপত্র ১৯৫৭ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি বিলি করেছেন সেখানে তিনি ৬টি লক্ষ্য উল্লেখ করেন, তার মধ্যে ৪ নম্বর লক্ষ্যটি ছিলো সাম্রাজ্যবাদ বিরোধীতা। তিনি এখানে লিখেছিলেন, ‘সাম্রাজ্যবাদীর কবল হইতে এশিয়া আফ্রিকার মুক্তির ডাক’।

একইভাবে তিনি কাগমারী সম্মেলনে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ‘আমি কোনো প্রকার যুদ্ধজোটে বিশ্বাস করি না। বিশ্বশান্তির পরিপন্থী যেকোনো প্রকার যুদ্ধজোট মানব সভ্যতা ও মুক্তির পথে বাধাস্বরুপ। যত কঠিন বাধাই আসুক না কেন, আমি পাকিস্তানের জনগণের ভবিষ্যৎ কল্যাণের জন্য স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির জন্য সংগ্রাম করে যাব।’

তৃতীয়ত, একাধিকবার চীন সফর, হাভানা ত্রিমহাদেশীয় সম্মেলন ও ভারতের সাম্রাজ্যবাদী ভূমিকার সমালোচনার মাধ্যমে মাওলানা ভাসানী সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ভূমিকা নেওয়ার জন্য কাজ করেন। তখনকার সময়ে চীন সরকার কর্তৃক আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদের সমালোচনার জন্য তিনি বারবার চীন সফর করেন। মাওলানা ভাসানীর সাম্রাজ্যবাদবিরোধী র‌্যাডিক্যাল আন্দোলন তখনকার সময়ে এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার নিপীড়িত জাতি জণগোষ্ঠীর মধ্যে আশার সঞ্চার করে।

বিশেষ করে হাভানা ত্রিমহাদেশীয় মহাসম্মেলনে ভাসানীর যোগদান ও বক্তৃতার রাজনৈতিক তাৎপর্য অনেক। তিনি ঐ সম্মেলনে সাম্রাজ্যবাদের নতুন নতুন আগ্রাসনকে সামনে এনে বলেছিলেন, ‘এখন আমাদের কর্তব্য হচ্ছে, নতুন ও পুরনো উপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে বিভিন্ন দেশের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনসমূহকে সক্রিয় ও সম্মিলিত সমর্থন দান করা।’ ওই সময়ে বিশেষ করে ভিয়েতনাম, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার উপর যুদ্ধ ও সামগ্রিকভাবে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন রোধে ভাসানীর এই উচ্চারণ নিপীড়িত মানুষকে আশাবাদী করে তোলে।

মওলানা ভাসানীর মৃত্যু জাতীয় স্বাধীনতার আন্দোলন, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রাম ও মানবমুক্তির সংগ্রামকে অনেকভাবে বাধাগ্রস্ত করে। মওলানা ভাসানীর মৃত্যু আমাদের জাতীয় জীবন কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে তা আমরা দেখতে পাই একটি রিপোর্টে। ১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর তারিখে মহান এ নেতার মৃত্যুর পর ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ সম্পাদকীয়তে ‘একটি শতাব্দীর মৃত্যু’ শিরোনামে লেখা হয়েছিল, “শতাব্দীর সূর্য অস্থমিত হইল। উপমহাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গণের জ্যোতিস্মান নক্ষত্র, মজলুম জনগণের অবিসংবাদিত নেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী দীর্ঘ রোগ ভোগের পর কোটি কোটি মানুষকে শোক সাগরে ভাসাইয়া গত পরশু উত্তীর্ণ সন্ধ্যায় লোকান্তরে অন্তর্হিত হইলেন।”

ভাসানীর মৃত্যু সাহসিকতাপূর্ণ বাধাগ্রস্থবিরোধী আন্দোলনের গতিকে শ্লথ করে দেয়। তাই মওলানা ভাসানীর মৃত্যুবার্ষিকী পালন আমাদেরকে মনে করিয়ে দেয় তার সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনের ঐতিহ্য ও স্বর্ণালী সময়কে। মনে করিয়ে দেয়, স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে পরাক্রমশালী বিরোধী শিবিরের সাথে আন্দোলন কর্মসূচিকে। তাকে স্মরণ করার মানেই হলো, সাম্রাজ্যবাদী শোষণ, যুদ্ধ ও অনৈতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ব্যক্তি, দল, গ্রুপ, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সম্মিলিতভাবে অবস্থান নেওয়ার প্রয়োজনীয় সংগ্রাম ও ভূমিকার কথা।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)

বিজ্ঞাপন