চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

নিজামীর ফাঁসি খালেদার আরেক রাজনৈতিক পরাজয়

যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামীর প্রত্যাশিত ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। এ বিচারের সাফল্য বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম আরেক বিজয়। লাখ লাখ শহীদ পরিবারের দীর্ঘ প্রতীক্ষার আরেক অবসান! একইসঙ্গে এই ফাঁসি বাংলাদেশ বিরোধীদের আরেক পরাজয়। নৈতিক, রাজনৈতিক আরেকটি পরাজয় খালেদা জিয়ার! নিজামী-মুজাহিদসহ তার সর্বশেষ ক্ষমতার মন্ত্রিসভার দু’জন সদস্য, মন্ত্রী পদমর্যাদার যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসিতে মৃত্যু হলো!

খালেদা জিয়া এসব নিয়ে টু শব্দটিও করতে পারেননি! তার দলের ও জোটের তিন গুরুত্বপূর্ণ নেতার ফাঁসি হলো আর মুখরা খালেদা জিয়াকে চুপ করে কেন থাকতে হয়? খালেদা জিয়া এসব নিয়ে মুখ খুলবেনইবা কোন সাহসে? কোন নৈতিকতায়? বলতেতো পারবেন না, এদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য নয়, এরা তার ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ স্বামী জিয়ার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন!

বিজ্ঞাপন

মুক্তিযুদ্ধতো একটা দেশে বারবার হয় না। বাংলাদেশেও আর হবে না। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তার চলতি দুই নাম্বারি অবস্থান না বদলানো পর্যন্ত কোথাও রাজনীতিতে জিততে পারবেন না খালেদা জিয়া। এবং এই নিজামীর যে ফাঁসি কার্যকর হয়েছে, বিচার যে হলো এ নিয়ে জামায়াত-বিএনপির পাঁচ যুদ্ধাপরাধী নেতার, এসবতো ২০০৮ সালের নির্বাচনের সিদ্ধান্ত। সেই নির্বাচনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিশ্রুতি মেনিফেস্টোয় রেখে ১৪ দলকে নিয়ে ভোট করেছিলেন শেখ হাসিনা। আর পালটা যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে নিয়ে ভোট করেছিলেন খালেদা জিয়া! এর জন্যে নির্বাচনে তার দলের বিপুল পরাজয় ঘটে।

খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় বদর কমান্ডার নিজামী-মুজাহিদদের দেখে রাগে থরথর কেঁপেছেন দেশের মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষেরা। শহীদ পরিবারের সদস্যরা। ভোটের সুযোগে তারা এর প্রতিশোধ নিয়েছেন। দেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষেরা, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম ‘স্বাধীনতার ঘোষকের দল-স্ত্রী’র এসব রাজনৈতিক দুই নাম্বারিকে বিপুলভাবে প্রত্যাখ্যান করে। সেই নির্বাচনের বিজয়ী পার্লামেন্টের প্রথম অধিবেশনেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রস্তাব পাশ করা হয়। গঠিত হয় আন্তর্জাতিক ট্রাইবুন্যাল।

কাজেই দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ইস্যুতো হঠাৎ করে এমনি এমনি আসেনি। বিচারের উদ্দেশে চিহ্নিতদের গ্রেফতার শুরু হলে বলতে শুরু করা হয় এই ‘ট্রাইব্যুনাল, বিচার স্বচ্ছ, আন্তর্জাতিক মানের না!’এসব রাজনৈতিক দুই নাম্বারির ভাত নেই মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে। মুখে স্বীকার না করলেও খালেদা জিয়াও নিশ্চয় এখন তা বোঝেন। তাইতো পরপর যে পাঁচ যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি হয়েছে, এসব নিয়ে তার মুখ তালাবদ্ধ!

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য যুদ্ধাপরাধী সাকা চৌধুরীর ফাঁসিতে মৃত্যু হয়েছে। বিএনপি এরজন্যে কোন শোক বিবৃতি দেয়া, শোক কর্মসূচি পালন করা অথবা স্থায়ী কমিটির পরবর্তি বৈঠকে সাকা’র জন্যেও দুই হাত তুলে একটু দোয়া করারও সাহস পাননি খালেদা জিয়া। নৈতিক সাহস যদি থাকতো তার মতো কথিত ‘আপোষহীন নেত্রী’ কী কোনকিছু বাদ দিতেন?

বিজ্ঞাপন

একসময়ের কথিত ‘আপোষহীন নেত্রী’ আজ বাংলাদেশের জন্মবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে আপোষ করে এখন হাবুডুবু খাচ্ছেন রাজনৈতিক অন্ধকারের চোরাবালিতে! খালেদা জিয়া অবশ্য এসব যে সখেদে অথবা ইচ্ছে করে করেন বা করছেন তাও নয়। ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী চরমপন্থীদের বাংলাদেশে আশ্রয়দান অথবা দশ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালানে তার জড়িত হওয়ার কারণ ছিল আইএসআই’র এসাইনমেন্ট। এই এসাইনমেন্টে যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে নিয়ে চলতেও তিনি বাধ্য।

সজীব ওয়াজেদ জয় যে আইএসআই’র টাকাপয়সার কথা তুলেছেন অল্প-স্বল্প! কিন্তু রাজনীতিতে যাদের নূন্যতম স্বচ্ছতা থাকে না তাদের রাজনৈতিক অবস্থান অথবা ভবিষ্যত কী এর প্রমানতো সবাই আজকের বিএনপির সবকিছুতে স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছে। অ্যান্টি আওয়ামী লীগ রাজনীতির মূলধারা হওয়া সত্ত্বেও তারা কোথাও কোন ফ্লোর পাচ্ছেনা।

বারবার মিস করছে রাজনৈতিক সুযোগের ট্রেন। পয়্তাল্লিশ বছর আগে বাংলাদেশের মুক্তিকামী গণমানুষের স্বাধীনতার স্বপ্নকে পণ্ড তথা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম ঠেকিয়ে দিতে দেশের মানুষের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল নিজামীদের মতো একদল কুলাঙ্গার! মুক্তিযোদ্ধাদের ‘দুষ্কৃতিকারী’ আখ্যা দিয়ে তাদের কতলের নির্দেশনা দিয়েছে এই নিজামী প্রতিদিন!

১৯৭১ সালের সংগ্রাম পত্রিকার ফাইলে তার এসব নির্দেশনা প্রমাণ হিসাবে মুদ্রিত আছে। দেশের মানুষকে হত্যা করতে নিজামীর নেতৃত্বে গঠিত হয় খুনি আল বদর বাহিনী। সেই রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান হেরে যাচ্ছে, বাংলাদেশ জিতে যাচ্ছে দেখে বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য করতে বিজয়ের প্রাক্কালে দেশের সেরা বুদ্ধিজীবীদের বেছে বেছে হত্যা করা হয়!

বাংলাদেশের চরিত্রহীন অসাধু রাজনীতির কারণে বিচারের বদলে একাত্তরের পরাজিত শক্তি এই কুলাঙ্গারদের স্বাধীন বাংলাদেশে উল্টো রাজনৈতিক তৎপরতা চালানোর সুযোগ করে দেন জিয়া! বুদ্ধিজীবী হত্যার মাস্টারমাইন্ড নিজামী- মুজাহিদকে মন্ত্রী করেন খালেদা জিয়া! নিজামীদের বিচারের রায়ে যেটিকে মুক্তিযুদ্ধ আর শহীদ পরিবাসমূহের গালে চড় মারার সামিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একাত্তরের খুনি নিজামীর ফাঁসির মাধ্যমে চূড়ান্ত চড়টি এসে আছড়ে পড়লো খালেদা জিয়ার গালে!

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল
আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View