চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ধ্রুব, আমার পরম আত্মীয়

আজ ধ্রুব এষের জন্মদিন

এক.
তাকে আমি কতবছর ধরে চিনি!
হিসেব করলে তিরিশ বছর তো হবেই! নাকি তারও বেশি। হ্যাঁ, বেশিই তো। ১৯৮৭ সালে প্রথম তাঁকে দেখি চারুকলায়। আমার সেজ মামা আর্ট কলেজে পড়তেন। এসএসসি পাশ করে সিটি কলেজে ভর্তি হয়েছি- কিন্তু মনের ভেতর আকুপাকু করছে আর্ট কলেজে পড়ে শিল্পী হবো। স্কুলে পড়ার সময় ‘বসুন্ধরা’ সিনেমা দেখেছিলাম। মনে ধরেছিল সিনেমার নায়কের কথা। আমার আর কি দোষ! ঐ বয়সে সিনেমা দেখে এরকম একটু আধটু আর্টিস্ট হওয়ার ইচ্ছে মনে ‘চাগাড়’ দিতেই পারে। আমারও তাই হয়েছিল। আর্ট কলেজে ভর্তির জন্য কোচিং করি, ফিগার আঁকি, নকশা আঁকি। পরীক্ষাও দিলাম কিন্তু বরাবরের মতো আশা ভঙ্গ হলো আমার। চান্স পেলাম না। তাতে কি! মনোবল হারালাম না। আমার সেজ মামা যেহেতু আগে থেকেই আর্ট কলেজে পড়ে সুতরাং আমি সেই সুযোগের অপব্যবহার করা শুরু করলাম। প্রায় সময়ই চলে যেতাম চারুকলায়। আমার সঙ্গে কোচিং করত যারা তারা তো চান্স পেয়েছে- সেই সুযোগটাও আমি শতভাগ কাজে লাগাই। সিটি কলেজের ক্লাস ফেলে আমি আড্ডা দিতে চলে যাই সেখানে। মামার বন্ধুরা আমার বন্ধু হয়ে যায়। আমি তাদের সঙ্গে সকাল দুপুর বিকেল আড্ডা মারি, গল্প করি, টেবিল টেনিস খেলি, পুকুরের পেছনের মাঠে ক্রিকেট খেলি- দুপুরের পর শাহবাগ থানার পেছনে জঙ্গলের ভেতর মোল্লার দোকানে ( ৯২- ৯৩ সালের দিকে মোল্লার ভাতের দোকানটি বন্ধ হয়ে যায়…) ডিম-পরোটা খাই। আর মোল্লা লোকটাও একেবারে রবীন্দ্রনাথের মত দেখতে। একারণে অবশ্য কেউ কেউ মোল্লাকে রসিকতা করে মোল্লানাথ বলে ডাকত। মোল্লা লোকটা একটু বাউল স্বভাবের ছিল। অনেক লম্বা ছিল- সব সময় পাঞ্জাবি পাজামা পরত। তাকে দেখলে এক ধরণের ভয় ধরানো সমীহ কাজ করত। মোল্লার দোকানে আর্ট কলেজের অভুক্ত ছেলেমেয়েরা ভাত খেয়ে, ডিম পরোটা খেয়ে বিল না দিয়ে মোল্লাকে বিলটা খাতায় লিখে রাখতে বলেছে! মোল্লা কিছু বলত না। বাকির খাতার হিসেব পাবে না জেনেও মোল্লা দিনের পর দিন তাদের খাবার দিয়েছে। এক অদ্ভুত লোক ছিল মোল্লা!
সেই তখন থেকে ধ্রুব এষকে চিনি। পাট খড়ির মতো ঢ্যাঙা লম্বা একমানুষ। মামার বন্ধুদের সবাইকে আমি মামা বলে সম্বোধন করতাম। তাকেও মামা বলতাম। এরপর কিভাবে কিভাবে যেন এই মানুষটা আমার আপন মামার চেয়েও আপন মামা হয়ে গেলেন।

দুই.
বাংলা প্রচ্ছদে ধ্রুব এষকে বলা হয় সুররিয়ালিজমের প্রবর্তক, সালভাদর দালি – কেউ কেউ আবার তাঁকে বলেন বর্তমান বাংলা প্রচ্ছদের একচ্ছত্র অধিপতি। পৃথিবীতে যে যেভাবে বলুক না কেন ধ্রুব এষ গত তিন দশকে তাঁর নিত্য নতুন, বহুমাত্রিক প্রচ্ছদ দিয়ে সত্যি সত্যিই একটি ঘোরের সৃষ্টি করেছেন। এক হাতে ধ্রুবর মত এত প্রচ্ছদ এ পৃথিবীতে এযাবৎ আর কেউ করেন নি। তাঁর করা প্রচ্ছদ দেখলে মন প্রসন্ন হয়, হৃদয় স্ফীত হয়। আর কি হয়? আর একটা জিনিস হয়- বুকের ভেতর এমায়ার জগতের যে নানা আলো আছে, রহস্য আছে, ছল আছে- সেসব খেলা করে। এসব করে করে ধ্রুব এষ নির্বিকারভাবে আমাদের মধ্যে এক অদ্ভুত ঘোর তৈরি করেছেন। প্রায় তিরিশ হাজার প্রচ্ছদ এঁকেছেন এই শিল্পী। সম্ভবত তাঁর চেয়ে বেশি প্রচ্ছদ আর কেউ আঁকেন নি।

বিজ্ঞাপন

শুধু কি ছয়- নয় ইঞ্চির প্রচ্ছদ তৈরি করেন ধ্রুব এষ!
না, দুই হাতে দশ হাতেরও অধিক কাজ আর কাজের ঘের রচনা করেন এই শিল্পী। কি গল্প, কি ছড়া, কি সায়েন্স ফিকশন, কি অতিপ্রাকৃত উপন্যাস, রহস্য গল্প, কি রূপকথা আর কি কি বলা যায়! ধ্রুব এষকে নিয়ে চারদিকে যে বিস্ময়ের ছাউনি সেটা সে একদিনে তৈরি করে নি- অনেকদিন ধরে যতন করে তৈরি করেছে। ছবি আঁকার সময় সে ধ্যানী, গল্প লেখার সময় সে ধ্যানী, আড্ডা দেয়ার সময় মহা আড্ডাবাজ, সিনেমা দেখার সময় তার চেয়েও অধিক ধ্যানী। প্রচুর সিনেমা দেখে সে- রাজ্যের সিনেমা তার কালেকশনে। তাঁর ঢেরায় গেলে দেখাবে সব। বলতে গেলে সে সিনেমার দুর্দান্ত পোকা। দুনিয়ার এমন কোন সিনেমা নেই, এমন কোন ডকুমেন্টারি নেই যে ধ্রুব দেখে নি।

তিন.
ধ্রুবকে চিনি, জানি আর মানি। এই শহরে আমি সে আমার পরম আত্মীয়। আমার ছেলেমেয়ের অতি আদরের নানাভাই সে। আমি সব সময় তাঁকে মহাত্মা বলে ডাকি। তিনি আমার কাছে মস্ত এক মহাত্মা। ঢাকা শহরে আত্মীয় অনাত্মীয় মিলে অনেক স্বজন থাকা সত্ত্বেও ধ্রুব এষকে আমি খুব ‘বালা পাই’। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে ‘বালা পাই’ শব্দের অর্থ হল ভালোবাসি। তিনি জন্মেছেন সুনামগঞ্জে- আরও খুলে বললে সুনামগঞ্জের উকিলপাড়ায়।। বাবা শ্রী ভূপতি এষ, মা শ্রীমতী লীলা এষের চার ছেলের মধ্যে সবার বড়। ছোটবেলা থেকে শুনে শুনে বড় হয়েছি সংসারের বড় ছেলেরা নাকি খুব বোকা স্বভাবের হয়- বিশ্বাস করিনি আমি। কিন্তু ধ্রুব এষের সঙ্গে পরিচয়ের পর, তাঁকে জানার পর একথা যে চির সত্য তা বুঝে নিয়েছি। ধ্রুব এষকে প্রথম দেখায় যে কেউ ভাববে মানুষটা বুঝি খুব চালাক চতুর- কিন্তু না, এই চালাক চতুর ভাব-সাবঅলা চেহারার মধ্যে চিরকালীন এক বোকা মানুষ ধ্রুব এষ। সংসারের ভালো মানুষগুলো চিরকাল এরকম বোকাটে স্বভাবের হয়।
বোকা না হলে কি কেউ এরকম লেখা লিখতে পারে!
চাল চুলো নেই ছন্নছাড়া
নেই একটু খড় কিংবা কুটো
কাকতাড়ুয়ার মতন মাঠের
মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে দুটো
হাত নেড়ে তাও নিচ্ছে কেলাস
একটা ছোট হলুদ পাখির,
বলছে আহা ফাস্টো কেলাস।
হাত আছে তোর আঁকা আঁকির
আঁক দেখি মেঘ একটা হরিণ
একটা পাহাড় দূর তারও পর
আঁক নদীটা না হলে অ্যাই
থাক দাঁড়িয়ে বেঞ্চির ওপর।
আঁকছি বাপু, বলেই হলুদ
পাখি ছোট্ট আঁকতে থাকে
পাহাড় হরিণ মেঘ নদী আর
ছন্নছাড়ার হৃদয়টাকে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন