চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে প্রস্তাবিত ৩২ ধারায় সমস্যা কী?

ইদানীং সাইবার আক্রমণ থেকে কোনো দেশই রেহাই পাচ্ছে না। এমনকি আমেরিকা, রাশিয়ার মত বিগ পাওয়ার এবং তাদের গোপন নথিপত্রেও হ্যাকাররা সহজে ঢুকে পড়ছে। কাজেই এর থেকে বাংলাদেশকে বাঁচানোর উদ্দেশ্যেই হয়তো সরকার ৩২ ধারা অত্যন্ত কঠোর ভাবে প্রবর্তন করতে চাচ্ছে।

অনলাইনে অ্যাটাকের নেশায় একজন হ্যাকার এতোটাই মত্ত থাকে যে, সে দুনিয়ার কোন আইনকেই পরোয়া করে না। তাই সে ঢুকতে সাহস করে পেন্টাগন কিংবা এফবিআই এর মত সুরক্ষিত ডাটাবেজে। আজব ধরণের লোক এরা। কেউ এদের কখনো উন্মুক্ত মঞ্চে পুরস্কৃত করে না। এদের ছবি মিডিয়াতে ফলাও করে প্রচার করা হয় না, এরা কাজের সাফল্য নিয়ে জনসম্মুখে এসে দুটো কথাও বলতে পারে না। অর্থাৎ এই কাজের জন্য নেই কোন সামাজিক স্বীকৃতি তবুও একের পর এক হ্যাকের ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

সাধারণত বয়সে তরুণ এই সমস্ত হ্যাকারদের নেশা হলো সে তার ছোট্ট কম্পিউটার দিয়ে বিরাট বিরাট বাঁধা অতিক্রম করে কীভাবে ঢুকে যেতে পারে অতি গোপনীয় সরকারী ও মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিগুলোর তথ্যভাণ্ডারে সেটা যাচাই করা। যার পুরোটাই বেআইনি এবং সাজা যোগ্য অপরাধ।
সম্ভবত এদের কেউ যেকোনো সময় অনলাইন বা ডিজিটাল আক্রমণের দ্বারা বাংলাদেশ সরকারের ডাটাবেজ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে প্রচার ও পাচার করে দিতে পারে। যদি এমনটা কখনো হয় তবে তাদের কোন আইনের আওতায় শাস্তি দেওয়া হবে? শাস্তি দেবার মত যথেষ্ট শক্তিশালী আইন কি বর্তমানে বাংলাদেশে আছে?

প্রশ্নটা এই জন্য করছি কেননা, দেশটা সবেমাত্র ডিজিটাল হতে শুরু করেছে। একই সাথে সরকার হয়তো ভাবছে বড় কোনো সর্বনাশের আগেই এই সংক্রান্ত নতুন একটা কার্যকরী আইন করতে হবে। নতুন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মধ্যে ৩২ ধারা নিয়েই সবচেয়ে বেশি আপত্তি উঠেছে বলে মনে হয়।

এই ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বেআইনিভাবে প্রবেশের মাধ্যমে কোনো সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা বিধিবদ্ধ কোনো সংস্থার অতি গোপনীয় বা গোপনীয় তথ্য-উপাত্ত কম্পিউটার, ডিজিটাল যন্ত্র, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ধারণ, প্রেরণ বা সংরক্ষণ করেন বা করতে সহায়তা করেন, তাহলে সেই কাজ হবে কম্পিউটার বা ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ। এই অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হবে।

কথা হলো; এই আইনের যৌক্তিকতা নিয়ে মন্ত্রীপরিষদ সম্মতি দিয়েছে মাত্র। এটাকে আইন করতে হলে তুলতে হবে সংসদে। তার আগে অনেক আলোচনা পর্যালোচনা যাচাই বাছাই করে নিতে হবে। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, মন্ত্রীপরিষদের অনুমতি পাবার পর সাধারণত তেমন কোন বড় পরিবর্তন ছাড়াই সংসদে সেই সংক্রান্ত আইন পাস হয়ে যায়। তাই অনেকের মতে এই আইনে লুকায়িত একটি হুমকি আছে আর সেটা পরিষ্কার হওয়া দরকার। হুমকিটি হলো; যদি কেউ সরকার সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করে তবে, তাকে গুপ্তচরবৃত্তির দায়ে আটক করা যেতে পারে। এখানেই সাংবাদিক ভাই বোনেদের সংশয়।

আমার প্রশ্ন হলো এই ‘প্রবেশ’ কথাটা নিয়ে কি কোন গ্যাপ আছে? ‘প্রবেশ’ কি সশরীরে প্রবেশ বা ফিজিক্যাল প্রেজেন্স না ডিজিটাল ইন্টারসেপ্ট? যে সমস্ত আলোচনা শুনছি তাতে বলা হচ্ছে এই আইনের ভয়ে সরকারী দপ্তর বা সরকারী কর্মকর্তাদের অপকর্ম দুর্নীতি ও অনিয়ম অনুসন্ধান করতে যেকোনো সাংবাদিক ভয় পাবে। এমনকি শত্রুতা করে এই আইনের আওতায় ফেলে অনেক নিরীহ সাংবাদিককে আসামী করা হতে পারে। কেননা, যিনি সরকারী অফিসে থেকে অপরাধ করেন তার হাত অনেক লম্বা হয়। তার পক্ষে যেকোনো কিছু করা সম্ভব। কাজেই আসন্ন দুর্গতি ও ভয়াবহ অবস্থা সম্পর্কে অগ্রিম ভাবে সমাজ ও দেশবাসীকে সতর্ক করে দিতে সাধারণত বিভিন্ন উপায়ে যে সমস্ত তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিবেদন করতে হয় তার থেকে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকেরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। যাতে রাষ্ট্র ও দেশবাসীর ক্ষতি হবার সম্ভাবনাই বেশি।

বিজ্ঞাপন

এই ভয় কতোটা বাস্তব সম্মত তা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে সরকার পক্ষের লোকদের মধ্যে। সরকার বুঝাতে চাচ্ছে যদি কেউ বেআইনি ভাবে সরকার বা আধা সরকারী দপ্তরের কোন ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডারে (ডাটাবেজ) বা অন্য কোন অনলাইন তথ্য (যেমন অনলাইন কমিউনিকেশন বা ইমেইল) যা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয় ইন্টারসেপ্ট করে (যা কিনা হ্যাকারদের সহজাত কাজ) তবেই তাকে গুপ্তচর বলে আখ্যায়িত করা হবে। কেননা মূল আইনটি হলো ডিজিটাল কার্যকলাপ সংক্রান্ত আইন এখানে সৎ সাংবাদিকদের ভয় পাবার কিছু নেই। অথচ কথার অস্পষ্টতার কারণে সরকারের উদ্দেশ্য গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না।

নিরপেক্ষভাবে চিন্তা করলে মনে হবে এই আইন সরকারী বেসরকারি সহ দেশের সকল প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হওয়া উচিৎ। শুধু সরকারী মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা দপ্তরগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে গোটা দেশবাসীর তথ্যভাণ্ডার রক্ষা করার জন্য একটি আইন পাশ হওয়া উচিৎ। নো ট্রেসপাসিং বলে একটা সাইন প্রায়ই দেখা যায়। যার মানে হলো এই সাইন দেখেও যদি কোন ব্যক্তি সেই সাইনে উল্লেখিত নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে তবে ব্যক্তিটি বেআইনি কাজ করল বলে গণ্য হবে। কাজেই এমন আইন ডিজিটাল সীমানায় থাকবে না কেন? যেমন ধরুন শেয়ার হোল্ডিং কোম্পানিগুলোতে এই রিস্ক অনেক বেশি। ডিজিটাল ইন্টারসেপ্ট করে যদি কেউ কোন তথ্য নিয়ে নিতে পারে তবে সেই কোম্পানির শেয়ার সাথে সাথেই তলানিতে নেমে আসবে। আন্ত-রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে তো ব্যাপারটা আরও স্পর্শকাতর। এই সমস্ত কারণেই গোপনীয় তথ্য সংরক্ষণ করতে শুধু পাসওয়ার্ডই যথেষ্ট নয়, নানা ধরনের সিকিউরিটি প্যাচ প্রয়োগ করা হয়।

এমনকি পাসওয়ার্ডও বিভিন্ন ভাবে মজবুত করতে হয়। ফায়ার ওয়াল, এন্টিভাইরাস ইত্যাদি তো আছেই। এরপরও থাকে সার্বক্ষণিক সিকিউরিটি মনিটরিং সেল, অডিটর, কমপ্লাইন্স অফিসার ইত্যাদি। তবুও দুর্ভাগ্যবশত অনেক সময় তথ্য হ্যাক হয়ে যায়। কাজেই উল্লেখিত ‘প্রবেশ’ শব্দটির মধ্যে যদি কোন গ্যাপ থেকে থাকে তবে সরকারের উচিৎ হবে সেটা পরিষ্কার করে আইনি সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া। কেন যেন মনে হয় সরকার বোধ হয় উল্লেখিত ‘প্রবেশ’ শব্দটি ৩২ ধারায় সঠিক ভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে পারেনি। প্রবেশকারী মানে কি হ্যাকার? যদি তাই হয় সেটা সর্বসাধারণের জন্য পরিষ্কার হওয়া দরকার। অতীত দিনের মত আইনি ভাষা শুধু আইন বিশেষজ্ঞরাই বুঝবে এই ধারণা থেকে সরে আসতে হবে। এর ফলে কথার মারপ্যাঁচে সুবিচার পাওয়ার যে বিলম্বিতা তা থেকে দেশবাসী মুক্তি পাবে।

সবশেষে বলবো নতুন আইনের ৩২ ধারা হয়তো এভাবে লেখা যেতে পারে (ব্রাকেটে বন্দী কথাগুলো পরামর্শ)।
কোন ব্যক্তি বেআইনিভাবে প্রবেশের মাধ্যমে (বা প্রবেশের চেষ্টা করে যদি) কোন সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা বিধিবদ্ধ কোন সংস্থার অতি গোপনীয় বা গোপনীয় তথ্য-উপাত্ত (বা এর অংশবিশেষ, যা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয়, কিংবা এই সমস্ত তথ্য ও সংবাদ অধিকরণের জন্য পূর্ব অনুমতি নেওয়া হয়নি, তা যদি) কম্পিউটার, ডিজিটাল যন্ত্র, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোন ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ধারণ, প্রেরণ বা সংরক্ষণ করেন বা করতে সহায়তা (ও চেষ্টা) করেন, তাহলে সেই কাজ হবে কম্পিউটার বা ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ।

আশা করি দেশের বিজ্ঞ ব্যক্তিদের পর্যবেক্ষণ সুপারিশ ও পরামর্শ মেনে কিংবা উপরে উল্লেখিত সংশোধনী বিবেচনা করে সরকার দেশবাসীকে একটি শক্তিশালী ডিজিটাল আইন উপহার দেবে। না হলে নির্বাচনের আগে বিরোধীদলগুলো থেকে আসা চাপের মত সরকারকে সংবাদ মিডিয়ার অতিরিক্ত আরও একটি চাপ হয়তো সহ্য করতে হতে পারে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View