চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

কামান্না ট্র্যাজেডি: বেঁচে আসা মুক্তিযোদ্ধাদের মুখে সেই স্মৃতি

আজ ২৬ নভেম্বর। কামান্না ট্র্যাজেডি দিবস। একাত্তরে বিজয়ের শেষ লগ্নে এই দিনে তৎকালীন মাগুরা মহকুমার উত্তরপাশ সংলগ্ন শৈলকূপা থানার কামান্না গ্রামে পাকহানাদারদের প্রতিরোধে অবস্থানরত মাগুরার ২৭ বীর মুক্তিযোদ্ধার একসাথে জীবনদান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অহংকারময় অধ্যায়। স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নে বিভোর এই শহীদ যোদ্ধারা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়ে দেশের জন্যে নিজ জীবনকে সমর্পণ করেছিলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই বয়সে ছিলেন রক্ত টগবগে কিশোর এবং তরুণ। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ এই কিশোর-তরুণরা স্কুলের বই-খাতা টেবিলে রেখে রণাঙ্গনে আঁকতে গিয়েছিলেন বিজয়ের লাল-সবুজ পতাকা।

কিন্তু বিজয়ের লাল সূর্য ওঠার আগে ২৬ নভেম্বর ভোরে ২৭ মুক্তিযোদ্ধার রক্তে স্নাত হয় কামান্নার মাটি। এতগুলো তরুণ প্রাণের একসাথে জীবন উৎসর্গের ঘটনায় শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল মাগুরাবাসী। সেই শোক, সেই কান্না, সেই আহাজারি গত ৪৮ বছরেও শেষ হয়নি। এখনও মাগুরার হাজীপুর, ফুলবাড়ি, আরালিয়া, মির্জাপুর, শ্রীমন্তপুর, হৃদয়পুর, শিবরামপুর, পারনান্দুয়ালী, দাইরপোল, বারইপাড়াতে পা রাখলেই অনুভব করা যায় শোকার্ত শহীদ পরিবারের দীর্ঘশ্বাস।

কামান্না যুদ্ধে যে ২৭ বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন তারা হলেন-শহীদ আব্দুল মোমিন উদ্দীন (ফুলবাড়ি, মাগুরা), শহীদ মো. কাদের বিশ্বাস (মোর্তোজাপুর, শ্রীপুর), শহীদ মো. শহীদুল ইসলাম (পশ্চিম বেরেইলা, মাগুরা), শহীদ মো. ওয়াহিদুজ্জামান (ফুলবাড়ি, মাগুরা), শহীদ রিয়াত মন্ডল (আলীধানী, মাগুরা), শহীদ আব্দুল মোতালেব (ইছাখাদা, মাগুরা), শহীদ আলী হোসেন (আরালিয়া, মাগুরা), শহীদ শরিফুল ইসলাম (কালালক্ষীপুর, ঝিনেদা), শহীদ মুন্সী আলীমুজ্জামান ওরফে আরিফ মুন্সী (বিষ্ণুপুর, মাগুরা), শহীদ মো. গোলাম কওসার মোল্লা (মির্জাপুর, মাগুরা), শহীদ মনিরুজ্জামান খান ওরফে মনি খাঁ ( হ্নদয়পুর, মাগুরা), শহীদ সেলিম ওরফে কেটে (শিবরামপুর, মাগুরা), শহীদ হোসেন আলী ( শ্রীমন্তপুর, মাগুরা), শহীদ রাশেদ হোসেন (শিবরামপুর, মাগুরা), শহীদ গোলজার খাঁ (মালিগ্রাম, মাগুরা), শহীদ আনিসুর রহমান (আরিয়াকান্দি, মাগুরা), শহীদ অধীর কুমার শিকদার (হাজীপুর, মাগুরা), শহীদ তাজুল ইসলাম তাজু (পারনান্দুয়ারী ব্যাপারীপাড়া), শহীদ গৌরচন্দ্র রায় (হাজীপুর, মাগুরা), শহীদ আলমগীর ( হাজীপুর, মাগুরা), শহীদ আব্দুর রাজ্জাক রাজা (দাইরপুল, মাগুরা), শহীদ আকবর (অজ্ঞাত), শহীদ সালেক মোল্লা (দ্বারিয়াপুর, শ্রীপুর, মাগুরা), শহীদ সলেমান শিকদার (নরসিংহাটি, মঘি, মাগুরা), শহীদ মাছিম মিয়া (হ্নদয়পুর, হাজীপুর, মাগুরা), শহীদ আব্দুর রাজ্জাক রাজা (বারইপাড়া, শ্রীকোল, মাগুরা), শহীদ নিখিল কুমার মন্ডল (বাগডাঙ্গা, মাগুরা)।
‘কামান্না ট্র্যাজেডি’ থেকে ভাগ্যক্রমে বেঁচে আসা বীর মুক্তিযোদ্ধারা হলেন- এস এম আব্দুর রহমান (হাজীপুর), এম এ সামাদ (বরিশাট ব্যাপারীপাড়া), সমেশ চন্দ্র দে (শ্রীকুণ্ঠী), আব্দুস সালাম (ইছাখাদা), আবুল বাশার বাঁশি (ফুলবাড়ি), মো. আব্দুল জলিল (পারনান্দুয়ালী), লিয়াকত আলী (বাখড়া-মকর্দ্দোমখোলা), আজিজ মোল্লা (আঠারোখাদা), লিয়াকত আলী (নিউ পল্টন লাইন), ওসমান গণি মোল্লা (পারনান্দুয়ালী মোল্লাপাড়া), সিরাজুল ইসলাম সিরাজ (হাজীপুর), গোলাম রসুল (হাজীপুর)তাঁদের জবানীতে বলেছেন সেই ভয়াবহ দুঃসহ অভিজ্ঞতা।

তবে উল্লিখিতদের মধ্যে সমেশ চন্দ্র দে কয়েক বছর হলো মারা গেছেন। কামান্নার ট্র্যাজেডি থেকে ভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে আসা সব যোদ্ধার সাথেই আমার কথা বলার সুযোগ হয়। রক্তাক্ত ইতিহাসের সেইসব সাক্ষীদের স্মৃতি থেকেও কামান্নার ঘটনা একবিন্দু মুছে যায়নি। বেঁচে আসা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মুখেই শুনি কামান্না ট্র্যাজেডির কথা।

‘কদবেল কুড়াতে গিয়ে দেখতে পাই পাক হানাদাররা আসছে’ -আবুল বাশার বাঁশি

“কামান্নাতে যে গ্রুপটি গিয়েছিল সেখানে আমি ছিলাম সবচেয়ে কম বয়সের মুক্তিযোদ্ধা। তখন আমি হাজীপুর স্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে পড়ি। যদ্দুর মনে পড়ে খাওয়া-দাওয়া শেষে রাত ১০ টা থেকে ১২টা পর্যন্ত ডিউটি করে আমি ঘুমিয়ে পড়ি। ভোর রাতের দিকে আমার পায়খানা লাগে। পায়খানার চাপে আমি একা একা উঠে পড়ি। অন্য মুক্তিযোদ্ধারা সব ঘুমিয়ে। ঘর থেকে বেরিয়ে দেখি চারিদিকে তীব্র কুয়াশা। আমি গারু (হিন্দুদের ব্যবহৃত বদনা বিশেষ) হাতে টিউবওয়েলের কাছে যাই। ওখানে ছিল একটা বড় কদবেল গাছ। গারু ভরে পানি নিয়ে যাওয়ার সময় দেখি মাটিতে পাকা কদবেল পড়ে আছে। কদবেলের লোভ আমি সামলাতে পারি না। কদবেল কুড়িয়ে একটা পকেটে ভরি আরেকটা হাতে রাখি।

এমন সময় আমার কানে আওয়াজ আসতে লাগল। আমার মনে হলো মানুষ আসার শব্দ। প্রথম চোটে আমি ভাবলাম স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সোনা মেম্বরের দল বোধ হয় আমাদের সাথে যোগ দিতে আসছে। শুনছিলাম তারা আমাদের সাথে যোগ দেবে। আমি এসব ভাবতে ভাবতে ৫ থেকে ৬ পা রাস্তার দিকে এগিয়েছি। সামনে এগুতেই দেখি পাকবাহিনী আসছে। আমি হতবাক হয়ে যাই। কী করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। পাকসেনারা আমার নিকটে চলে আসে। আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকি। আমার পরনে হাফপ্যান্ট। এক পাকসেনা আমার ঘাড়ে হাত রেখে বলে ‘ওদারসে যাও’। বুঝতে পারি এরা কী করতে এসেছে। আমি দ্রুতই পাশ ঘুরে সামনে চলে আসি। সামনে এসেই আমি আরালিয়ার সাহসী মুক্তিযোদ্ধা আলী হোসেন ভাইকে ডাক দিয়ে বলি ‘ আলী হোসেন ভাই পাকসেনা আসছে পজিশন নেন’। ভাবতে থাকি আলী হোসেন ভাই পজিশন নিয়ে ফায়ার ওপেন করলে আমাদের যোদ্ধারা যে যার মতো পালাতে পারবে।

মুখের কথা মুখেই থাকল। আলী হোসেন ভাই বের হওয়ার আগেই পাকসেনারা ফায়ার ওপেন করে। এরপর ফায়ার আর ফায়ার। আমি কামান্না স্কুলের দিকে দৌঁড় দিই। আমাদের অনেক যোদ্ধা গুলি খেয়ে পড়ে যায়। আমি গড়িয়ে গড়িয়ে কুমার নদের দিকে চলে যাই। এক পর্যায়ে কাদা আর পানির ভেতর নেমে মাথার ওপর কচুরিপানা দিয়ে একেবারে চুপ হয়ে পড়ে থাকি। অনেকক্ষণ ধরে ওরা ব্রাশ ফায়ার করতে থাকে। ফায়ার থামলে আমি সাঁতরিয়ে ওপার ফাদিলপুর গ্রামে চলে যাই। ওখানে গিয়ে দেখি আমার শরীরে আর কোনো শক্তি নেই। নদীর পারের জঙ্গল থেকে লোকজন বেরিয়ে এসে আমাকে টেনে তুলে জঙ্গলের ভেতর নেয়। দেখি জঙ্গল ভরা মানুষ। ফায়ার শোনার পর সবাই জঙ্গলের ভেতর পালিয়েছে। আমি লোকজনকে সব ঘটনা খুলে বলি। এরপর আমি পাশের গ্রাম যুগনি-বাগনি-পদ্মনগর হয়ে কোদালিয়া গ্রামে গিয়ে আশ্রয় নিই।”

‘ক্যাশ বক্সের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রেখে কোনোভাবে রক্ষা পাই’ এস. এম. আব্দুর রহমান

মুক্তিযোদ্ধা এস এম আব্দুর রহমান। সাবেক ব্যাংক কর্মকতা। গ্রামের বাড়ি মাগুরা সদর উপজেলার হাজীপুরে। বর্তমানে শহরের ভায়না এলাকার শান্তিবাগে বসবাস করেন। বাবার নাম মরহুম শেখ আব্দুর সামাদ, মায়ের নাম মরহুমা আয়েশা খাতুন। কামান্নার যুদ্ধে এই গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন। বেঁচে থাকার কথা ছিল না তার। কিন্ত ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, তার বেঁচে থাকাটা নিতান্তই ভাগ্য প্রসূত, আল্লাহর অশেষ রহমত ছাড়া আর কিছু নয়।

মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রহমান বিহারের চাকুলিয়া থেকে গেরিলা ট্রেনিং শেষে দেশ স্বাধীন করার তীব্র অভিপ্রায় নিয়ে সীমান্ত পার হয়ে শালিখা থানার ধনেশ্বরগাতি ইউনিয়নের গজদুর্বা গ্রামে এসে অন্যান্য গেরিলাদের সাথে মিলিত হন। সেদিনের সেই রাতের ঘটনা স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘নভেম্বর মাসে এমনিতেই শীত ছিল বেশী। এছাড়া কুয়াশাও ছিল প্রচন্ড। যদ্দুর মনে পড়ে ডিউটি শেষে রাতে আমরা সবাই গণবিছানায় শুয়ে পড়ি। কম বেশি সবাই ঘুমে বিভোর। আমিও ঘুমিয়ে পড়ি। হঠাৎ গুলির তীব্র শব্দে আমার ঘুম ভেঙে যায়। চারপাশ থেকে শুধু দ্রিম দ্রিম আওয়াজ হতে থাকে। গুলির শব্দে ঘুম ভাঙতেই আমি উঠে বসি। কিছু একটা করার জন্য আমি দাঁড়িয়ে পড়ি। সঙ্গে সঙ্গে পাকবাহিনীদের ছোঁড়া একটি গুলি আমার বাম পা ভেদ করে বেরিয়ে যায়। আমাদের যোদ্ধারাও পাল্টা গুলি করছে। এমন অবস্থায় আমি আস্তে আস্তে ক্রলিং করে মই বেয়ে ঘরের পাটাতনের ওপরে উঠি। ওখানে উঠে দেখি একটা ক্যাশবাক্স। আমি কোনোরকমে ক্যাশবাক্সের আড়ালে জড়সড় হয়ে নিজেকে লুকিয়ে রাখি। ক্যাশবাক্সে যে সব খাতা ছিল ওগুলো দিয়ে নিজের শরীর ঢেকে একেবারে নাই হয়ে পড়ে থাকি। আমি ওপরে শুয়ে শুয়ে দেখতে পাই, পাকসেনারা রুমে ঢুকে সহযোদ্ধাদের গুলি করে হত্যা করছে। সে এক নির্মম নিষ্ঠুর দৃশ্য। আমি সহযোদ্ধাদের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার শব্দ শুনতে পাই। ধরে নিই আমিও আর বাঁচব না। জীবন-মৃত্যুর এই সন্ধিক্ষণে আল্লাহকে ডাকতে থাকি। আমার গুলিবিদ্ধ পা থেকে টপটপ করে রক্ত নিচে পড়তে থাকে।

পাক আর্মিরা অপারেশন করে চলে যায়। চারিদিকে পড়ে থাকে লাশ আর লাশ। কাউকে ডাকার উপায় নেই। পাক আর্মিরা চলে যাওয়ার বেশ পর গ্রামবাসীরা আমাদের উদ্ধার করতে আসে। আমার সহযোদ্ধা মাগুরা সদর থানার আঠারোখাদা গ্রামের আজিজ ভাইসহ অন্যরা আসে। রক্তাক্ত অবস্থায় আজিজ ভাই এবং অন্যরা আমাকে ওপর থেকে নিচে নামিয়ে আনে। উদ্ধার করে আমাকে পাশেই সিরাজ কাজীর বাড়িতে নেওয়া হয়। ওখানে আমার চিকিৎসা করা হয়। তারপর ডাক্তার মতলেব আমার চিকিৎসা করেন। পরে ক্যাপ্টেন ওয়াহবের সাথে যে ডাক্তার থাকতেন উনি আমার চিকিৎসা করেন।

আমার পায়ে এখনও গুলির চিহ্ন রয়েছে। কামান্নার যুদ্ধে বাঁচবো এটা কখনই ভাবিনি। ঐ যুদ্ধে যারা শহীদ হন তাদের বেশিরভাগই ছিল আমার নিজ গ্রাম হাজীপুরের। ২৬ নভেম্বর এলে শহীদ এই সহযোদ্ধাদের কথা বড় বেশি মনে পড়ে।’

‘গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরও আমি হানাদারদের দিকে ব্রাশফায়ার করি’-এম এ সামাদ

কামান্না যুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হয়ে বেঁচে আছেন আরেক সাহসী গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা এম এ সামাদ। এই বীর মুক্তিযোদ্ধার আদি নিবাস শ্রীপুর উপজেলার শ্রীকোল ইউনিয়নের বরিশাট গ্রামে। বর্তমানে তিনি পারনান্দুয়ালী ব্যাপারীপাড়াতে বসবাস করেন। তার বাবার নাম- মরহুম হারুনার রশিদ, মায়ের নাম- মরহুমা সবুরা খাতুন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধা সামাদ প্রথমে ভারতের মাজদিয়া ইয়থ ক্যাম্পে যোগ দেন। এরপর কল্যাণী হয়ে বিহারের চাকুলিয়া থেকে গেরিলা ট্রেনিং নিয়ে বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে মাগুরাতে এসে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাই চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে থাকেন। তিনি ছিলেন গ্রুপ কমান্ডার। তার অধীনে ছিল আরো কয়েকজন গেরিলা যোদ্ধা।

সেই রাতের ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে এম এ সামাদ বলেন, ‘শেষ রাতে পাক আর্মিরা হঠাৎ করে আমাদের তিন পাশ ঘিরে বেপরোয়া গুলিবর্ষণ করতে থাকে। স্বভাবতই আমরা দিকবিদিক হারিয়ে ফেলি। জীবন বাঁচানোর জন্যে মরিয়া হয়ে উঠি। হানাদারদের প্রথম আক্রমণেই অনেক সহযোদ্ধাকে আমরা হারিয়ে ফেলি। আমার কাছে ছিল একটা এলএমজি। ওদের প্রচন্ড গুলিবর্ষণের মাঝেই আমি এলএমজি পিঠে নিয়ে দ্রুত ক্রলিং করে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ি। ক্রলিং করে আমি ডানদিক দিয়ে এগিয়ে নদীর ধারের দিকে যাই। ওখানে একটা গাছের গোড়ায় শেল্টার নিই। গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে আমি ব্রাশ টানতে থাকি। আমি প্রায় দুইশত রাউন্ড গুলি করি। হঠাৎ বাম পাঁজরে গুলিবিদ্ধ হই। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আমি এলএমজি পিঠে নিয়ে ক্রলিং করতে থাকি। এরপর বেয়নেট দিয়ে আমার গেঞ্জি শরীর থেকে ছিঁড়ে ফেলি। দেখি শরীর থেকে আমার রক্ত বের হচ্ছে। আগে থেকে আমাদের গেরিলাদের কাছে এক ধরনের ওষুধ থাকতো। প্রয়োজনে সেটা গুলিবিদ্ধ স্থানে লাগানোর প্রশিক্ষণ ছিল। আমি আমার গুলিবিদ্ধ জায়গাতে ঐ ওষুধ লাগাই আর গেঞ্জি দিয়ে জায়গাটা বেঁধে ফেলি। বুঝতে পারি শরীর থেকে আর রক্ত বের হচ্ছে না। এরপর আমি এলএমজি পিঠে নিয়ে ক্রলিং করে গোবরের বড় এক গাদার কাছে পজিশন নিয়ে বসে থাকি। পাকবাহিনী চলে গেলে গ্রামবাসী আমাকে উদ্ধার করে। প্রথমে গ্রামবাসী স্থানীয় এক ডাক্তারকে দিয়ে আমার চিকিৎসা করায়। তারপর ঝিনেদাতে গিয়ে আমি চিকিৎসা নিই। কামান্নার যুদ্ধে আমার এক আত্মীয়ও মারা যায়। ওর নাম তাজরুল ইসলাম তাজু। বয়সে ও আমার ছোট ছিল। মনে আছে পাকবাহিনী হামলা করলে তাজু আমাকে বলে, মামা আমাকে বাঁচান। কিন্ত তাজু ওখানেই শহীদ হয়। শহীদ হয় আমার অন্য সহযোদ্ধারাও।’

‘মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে আসবো আমি কোনোদিন ভাবিনি’-মো. লিয়াকত আলী (বড়)

কামান্নায় পাকবাহিনীর নৃশংস হামলায় যে তিন গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম মো. লিয়াকত আলী। বাবার নাম মরহুম আব্দুল লতিফ মোল্লা। মায়ের নাম জহুরুন নেসা। বাড়ি শ্রীপুর উপজেলার সব্দালপুর ইউনিয়নের বাখড়া-মকর্দ্দোমখোলাতে। মুক্তিযোদ্ধা লিয়াকাতের মায়ের বাবা বাড়ি ছিল হাজীপুরে। স্বভাবতই শৈশব কৈশোর তার কাটে ওখানে নানাবাড়িতে। হাজীপুর গ্রামে থেকেই তিনি লেখাপড়া করতেন। এ কারণেই সর্বশেষ হাজীপুর আঞ্চলিক বাহিনীর সাথে কামান্নায় অবস্থান নিয়েছিলেন।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই এই যোদ্ধা প্রথমে ভারতের চাঁপড়া ক্যাম্পে যান। ওখানে স্টোরকিপারের দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের তৎকালীন নেতা মীর্জা সুলতার রাজার তত্ত্বাবধানে ছিলেন তিনি। ওখানে থাকা অবস্থায় তিনি দেখেন হাজীপুরের তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের বড় অংশ বিহারের চাকুলিয়াতে যাচ্ছেন গেরিলা প্রশিক্ষণ নিতে। ঐ দলের সাথে ভীড়ে যান তিনি নিজেও। প্রশিক্ষণ শেষে ভারতীয় সীমান্ত অতিক্রম করে শালিখা থানার ধনেশ্বরগাতি ইউনিয়নের গজদুর্বা গ্রামে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাই চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে অবস্থান নেন। আঞ্চলিক বাহিনীর সাথে তিনিও যান কামান্নাতে।

কামান্নার সেই ভয়াবহ ঘটনা এখনও তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। সেই দুঃসহ নির্মম ঘটনার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা লিয়াকত বলেন, সেই রাতে ছিল খুব ঠান্ডা এবং চারিদিকে ছিল ঘন কুয়াশা। শেষ রাতের দিকে গুলির শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। বুঝতে পারি আমাদের ওপর হামলা করেছে পাকআর্মিরা। বৃষ্টির মত গুলি ছুঁড়ছে ওরা। অপ্রস্তত থাকায় স্বভাবতই আমরা দিশেহারা হয়ে পড়ি। আমি রাইফেল নিয়ে ঘরের পশ্চিমের দিকে বাঁশঝাড়ের দিকে যাই। মনে পড়ে এ সময় হাজীপুরের রাজা আমাকে বলতে থাকে মামা আমাকে বাঁচান। রাজা গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে যায়। আমি একটা কাঁঠাল গাছের পাশে নিজেকে আড়াল করতে চেষ্টা করি। কিন্তু বিধি বাম। হানাদাররা আমাকে দেখে ফেলে। সঙ্গে সঙ্গে আমাকে টার্গেট শুট করে। আমার বুক ভেদ করে গুলি বেরিয়ে যায়। আমি ওপুড় হয়ে মাটির ওপর শুয়ে পড়ি। শুয়ে পড়া অবস্থায় কলেমা পড়তে থাকি। এ সময় দু’জন পাক আর্মি ‘ইয়েতে মুসলিম’ বলে ধরে নিয়ে সামনে এগুতে থাকে। আমি নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে যাচ্ছি। এমতাবস্থায় আমার দিকে আমাদের কেউ গুলি করে। সঙ্গে সঙ্গে ঐ দুই পাক আর্মি আমাকে ফেলে রেখে চলে যায়। আমি আহত অবস্থায় পড়ে থাকি। শরীর থেকে অনেক রক্তক্ষরণ হয়। অবশেষে গ্রামবাসী আমাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। মতলেব নামে এক ডাক্তার আমার চিকিৎসা করেন।’

‘সেদিন কেবলই ইশ্বরের কৃপায় জীবন রক্ষা পায়’-সমেশ চন্দ্র দে

বীর মুক্তিযোদ্ধা সমেশ চন্দ্র দে। পিতা স্বর্গীয় সন্তোষ কুমার দে। মায়ের নাম গৌরী রানী দে। বাড়ি মাগুরা সদর থানার চাউলিয়া ইউনিয়নের শ্রীকুন্ঠী গ্রামে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জুন-জুলাই মাসের দিকে এই তরুণ প্রথমে ভারতের কৃষ্ণনগরে ইয়থ ক্যাম্পে যোগ দেন। এখানে প্রাথমিক পর্যায়ে চারদিন প্রশিক্ষণ নেন। এরপর গেরিলা প্রশিক্ষণ নিতে বিহারের চাকুলিয়াতে যান। প্রশিক্ষণ শেষে কল্যাণী আসেন। ছুটি নেন এক সপ্তাহের। ছুটি শেষে কৃষ্ণনগর থেকে নিজের নামে ইসু করা অস্ত্র নিয়ে বয়রা ক্যাম্প হয়ে কাশীপুর দিয়ে যশোরের চৌগাছা হয়ে শালিখা থানার ধনেশ্বরগাতি ইউনিয়নের গজদুর্বা গ্রামে এসে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস হাই চৌধুরীর সার্বিক তত্ত্বাবধানে থাকেন। তার গ্রুপ কমান্ডার ছিলেন অধীর কুমার শিকদার।

সমেশ চন্দ্র দে সেই রাতের স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘আমি ঘরের উত্তর দিকের বারান্দাতে শুয়ে ছিলাম। আমার পাশে চিত্তরঞ্জন বসু। ঘটনার ঠিক আধা ঘণ্টা আগে আমি একবার প্রসাব করে আসি। রাতে ছিল প্রচণ্ড কুয়াশা। চারিদিকে কিছু দেখার উপায় ছিল না। হঠাৎ করেই এক রাউন্ড গুলির শব্দ পাই। আমি চিত্তকে বলি গুলির শব্দ মনে হলো। খুব সম্ভবত এ সময় রাশেদ (শিবরামপুর) প্রসাব করতে বের হয়। ওখানে একটা লিচু গাছ ছিল। কদবেল গাছসহ চারপাশে আরো অনেক গাছগাছালি ছিল। আমাদের বাঁশি (এফএফ) কোনো এক ফাঁকে দরজা খুলে কদবেল কুড়াতে বের হয়। ও বের হয়েই দেখে পাকহানাদাররা। ও চিৎকার করে বলে আলী ভাই মিলিটারি। মুখের কথা মুখে থাকতেই শুরু হয় প্রচন্ড ফায়ার। আমি উত্তরে দাঁড়িয়ে ফায়ার দিতে থাকি। একসময় আমি ও চিত্ত দরজা দিয়ে বের হয়ে পড়ি। দু’জনেই ক্রলিং করে নদীর কিনারাতে যাই। ওখান থেকে কোনোমতে এক মাইল দূরের এক গ্রামে যাই। সেদিন কেবলই ঈশ্বরের কৃপায় জীবন রক্ষা পাই। সেদিন আমি বেঁচে এলেও আমাদের গ্র“পের সহযোদ্ধা তাজুল, অধীর, গৌরসহ গেরিলা বাহিনীর আরো অনেক সহযোদ্ধা মারা যায়। সেই প্রিয় মুখগুলো সবসময় আমার চোখে ভেসে উঠে।’

বিজ্ঞাপন

‘তাজুলের লাশ দেখে আমি কাঁদতে থাকি’-মো. আব্দুল জলিল

মো. আব্দুল জলিল। বাড়ি মাগুরা সদর থানার পারনান্দুয়ালী ব্যাপারীপাড়াতে। বাবার নাম গোলজার বিশ্বাস। আব্দুল জলিল পুলিশ বিভাগে চাকরি করতেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি সৈয়দপুর থেকে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে যান। তারপর সশস্ত্র অবস্থায় বাংলাদেশে ঢোকেন। যোগ দেন হাজীপুরবাহিনীতে। সবশেষে হাজীপুর এলাকা থেকে কামান্নাতে অবস্থান নেন। অনেকের মতো তিনিও সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান।

কামান্না যুদ্ধের বর্ণনা এবং নিজের বেঁচে থাকার সেই ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, ‘আমার কাছে একটা এলএমজি ছিল। কিন্তু আমি ফায়ার দেওয়ার কোনো সুযোগ পাইনি। কাছ থেকে অন্য এক মুক্তিযোদ্ধা এলএমজি নিয়ে ফায়ার দেয়। এর মধ্যে দেখি অনেকেই গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে গেছে। আমি কী করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। একসময় আমি ছাদে গিয়ে উঠি। ওখানে গিয়ে একটা চাটাই মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ি। আমার পাশে ছিল মুক্তিযোদ্ধা গোলজার। ও খুব সাহসী ছিল। ওপরে শুয়ে বুঝতে পারি নিচে অনেক কিছু হচ্ছে। এর মধ্যে গোলাগুলি একটু থেমে যায়। খানসেনাদের হুকুম মোতাবেক কয়েকজন রাজাকার ঘরের ভেতরে প্রবেশ করতে থাকে। আমি দোয়া ইউনুস পড়তে থাকি। মুহূর্তেই আমার কানে ভেসে আসে এক খান সেনা বলছে- (উদার মুক্তি হ্যায়) উত্তরে রাজাকার বলে ‘ওস্তদ মুক্তি নেহী হায়।’ এর মধ্যে মনে হয় একটা ফায়ার হলো। অমনি নিচে খানসেনারা ক্লোজ বলে যাদেরকে ধরেছিল এরকম কয়েকজন মুক্তিসেনাকে ফের গুলি করলো। অপারেশন শেষ করে পাক হানাদাররা চলে গেলো।

আমি বের হয়ে কোনোরকম নদীর কিনারে গেলাম। তখন অনেক লোক চলে এসেছে স্পটে। আমি আর হুলিনগরের বিষ্ণুপদ সাঁতরিয়ে ওপার গিয়ে ফাদিলপুরের আশেপাশে উঠলাম। তারপর বেলা বাড়ার পর আবার ওপার থেকে স্পটে এলাম। আমার নিকটাত্বীয় তিনজন সামাদ মামা, আতিয়ার এবং তাজুল ছিল এই যুদ্ধে। আমি এদেরকে খুঁজতে লাগলাম। খুঁজতে এসেই দেখি তাজুল গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। তাজুলের লাশ ধরে আমি কাঁদতে থাকলাম। এরপর আরো কতো ঘটনা। ওখান থেকে আমি পায়ে হেঁটে চলে আসি শ্রীপুর থানার সারঙ্গদিয়া গ্রামে আমার এক ভগ্নিপতির বাড়িতে। আসলে আমার কল্পনাতেও ছিল না এই যুদ্ধ থেকে আমি প্রাণে বাঁচব। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে এখনও বেঁচে আছি এটি করুণাময়ের ইচ্ছে ছাড়া আর কিছু নয়।’

‘কামান্না থেকে প্রাণে বেঁচে আসবো কখনই ভাবিনি’-মো. লিয়াকত আলী (ছোট)

মো. লিয়াকত আলী। ঢাকা মেডিকেল কলেজের গণপূর্ত বিভাগে চাকরি করেন। বাবার নাম মৃত এলেম উদ্দিন আহমেদ। মায়ের নাম আমেনা খাতুন। গ্রামের বাড়ি নড়াইল জেলার লোহাগড়া উপজেলার পাচুরিয়া গ্রামে। ৫ ভাই আর ১ বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। হাজীপুরে নানা বাড়ি হওয়ার সুবাদে কামান্নার যুদ্ধে তিনিও ছিলেন। বেঁচে আসা মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে তিনিও একজন।

একাত্তরে তিনি ঢাকার নতুন পল্টন লাইন স্কুলে পড়তেন। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হলে হাজীপুরে নানা রজব আলী মিয়ার বাড়িতে চলে যান। ওখানে গিয়ে মামা গোলাম মর্তুজা মিয়ার সাথে কলকাতায় যান। প্রথমে ইয়থ ক্যাম্পে থাকেন। তারপর উচ্চতর ট্রেনিং নেওয়ার জন্যে বিহারের চাকুলিয়াতে যান। ওখানে এক মাস ট্রেনিং নেন। পরে কল্যাণী হয়ে গেরিলা দলের সাথে মাগুরাতে ঢুকে পড়েন। গেরিলা দলের কমান্ডার এসএম আব্দুর রহমানের গ্র“পে থাকেন তিনি।

সেই রাতের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা লিয়াকত বলেন, ‘ঐ রাতে প্রাণে বাঁচব এটি ছিল কল্পনারও বাইরে। পাকা হানদাররা অতর্কিতে হামলা শুরু করলে আমরাও পাল্টা আক্রমণ শুরু করি। আমি আমার হাতে থাকা থ্রী নট থ্রী রাইফেল থেকে জানালা দিয়ে এক রাউন্ড গুলি করি। এক ফাঁকে আমি ঘর থেকে বের হয়ে দৌড় দিই। সে সময় দেখি খালাতো ভাই আনিস একটা গাছের পাশে দাঁড়িয়ে গুলি করছে। আমি আঁকা বাঁকা হয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে কুমার নদীর পাড়ে গিয়ে শুয়ে পড়ি। ওখানে আরেক যোদ্ধা বাঁশিকে লুকিয়ে থাকতে দেখি। বাঁশি নদী সাতরিয়ে ওপার চলে যায়। আমিও কোনো রকম সাঁতরিয়ে ওপার যায়। ওপারে গিয়ে আমি একটি বাড়িতে আশ্রয় নিই। তারা আমাকে পরার জন্যে একটা লুঙ্গি দেয়। এর মধ্যে সাধারণ মানুষের কাছে পাকবাহিনীর বর্বরতার খবর পৌছে গেছে। লোকজনের চোখেমুখে দারুণ আতঙ্ক। একেক জন একেক রকম সংবাদ নিয়ে আসছে। চারিদিকে উড়ো সংবাদের ছড়াছড়ি। শুনি ফের পাক আর্মি আসছে। আমি আবার লুকিয়ে থাকি একটা মাচার নিচে। বেলা বারোটা একটার দিকে আমি হাঁটতে হাঁটতে চলে আসি আমার এক মামার শ্বশুর বাড়িতে।’

‘সহযোদ্ধা ওহিদ আমার হাতের ওপর মারা গেলো’-ওসমান গণি

ওসমান গণি। বাড়ি মাগুরা পৌরসভার পারনান্দুয়ালী মো¬ল্লাপাড়াতে। পিতার নাম মরহুম আদিল উদ্দীন মোল্লা। মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে যশোর ক্যাণ্টনমেন্টে ফাস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে কর্মরত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বিষয়খালী হয়ে নিজ এলাকা মাগুরাতে চলে আসেন। মাগুরা থেকে আবার সীমান্ত অতিক্রম করে সোজা ভারতে চলে যান। তারপর সশস্ত্র অবস্থায় ফের মাগুরাতে ঢুকে প্রথমে শৈলকূপার সোনা মোল্ল¬ার গ্র“পে যোগ দেন। পরবর্তীতে কাজী ইউসুফের নেতৃত্বে আঠারোখাদা-হাজীপুর এলাকায় আঞ্চলিক বাহিনী তৈরি হলে মুক্তিযোদ্ধা ওসমান গণি এই বাহিনীতে যোগ দেন। কামান্নার যুদ্ধে এই মুক্তিযোদ্ধাও ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান।
সেদিনের সেই ভয়াবহ স্মৃতির কথা মনে উঠলে এখনও হু হু করে কেঁদে ওঠেন মুক্তিযোদ্ধা ওসমান গণি। বেঁচে থাকার কারণে অনেক ঘটনারই তিনি নির্মম সাক্ষী। ওসমান গণির ভাষায় তাঁর হাতের ওপরে মারা যান বীর মুক্তিযোদ্ধা ফুলবাড়িয়ার ওহিদুজ্জামান। সেদিন রাতের ঘটনা আর নিজের বেঁচে থাকা তিনি বর্ণনা করেন এভাবে-‘ ঐরাতে আমার ডিউটি ছিল রাত ১০ টা থেকে ২ টা পর্যন্ত। আমি যথারীতি আমার ডিউটি শেষ করে ঘুমিয়ে পড়ি। শেষ রাতে হঠাৎ করেই গুলির দ্রিম দ্রিম আওয়াজ শুনতে পাই। ঘুমের ঘোরের মাঝেই বুঝতে পারি অ্যাটাক হয়েছে। তড়িঘড়ি উঠে পড়ি। বাঁচার পথ খুঁজতে থাকি। তীব্র গুলির আওয়াজ চারপাশে। কে কোথায় যাচ্ছে কিছুই বুঝতে পারি না। এর মধ্যে সহযোদ্ধাদের অনেকেই শত্রুর আক্রমণে শহীদ হয়ে গেছে। চরম গোলাগুলির মধ্যে একবার মিনিট কয়েকের জন্যে একটা বিরতি ঘটে। আমি ঝুঁকি নিয়ে ক্রলিং করে ঘর থেকে বের হয়ে দৌড়ে পাশে অন্য একটা ঘরে উঠি। সেই ঘরটা ছিল অন্য কোনো এক হিন্দুবাড়ি। এক পর্যায়ে আমার পরনে কোনো কাপড় ছিল না। আমি ঘরে ঢুকেই দেখি একটা কাপড়ের ওপর সন্দেশ রাখা। আমি লজ্জা নিবারণ করতে ঐ কাপড়টা পরি এবং ঐ বাড়ির ছাদে উঠে লুকিয়ে থাকি।

গোলাগুলি থেমে গেলে কয়েকজন লোক ঘরে ঢুকে। তাদেরকে আমি বলি বাঁচানোর জন্যে। তারা আমাকে ছাদ থেকে নামায়। ছাদ থেকে নেমে বাইরে এসে দেখি ফুলবাড়িয়ার ওহিদুজ্জামান গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। ওহিদ তখনও বেঁচে আছে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেনি। মুক্তিযোদ্ধা ওহিদকে আমি ক্যাম্পে সবসময় ‘শ্বশুর’ বলে ডাকতাম। আমি গুলিবিদ্ধ ওহিদকে ধরি। ওহিদ আমাকে দেখেই বলতে থাকে ওসমান আমাকে বাঁচা। একসময় ও পানি খেতে চায়। একটা ঘটি থেকে পানি এনে ওকে খাওয়ায়। এরপর ওহিদ আমার হাতের ওপর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। এর মধ্যে দেখি আমাদের আরেক যোদ্ধা পারনান্দুয়ালীর আতিয়ার কাঁদছে। ও কান্নাকাটি করে বলছে ওর এক আত্মীয়কে ও খুঁজে পাচ্ছে না। মনে পড়ে ওখান থেকে আমরা কামান্নার পূর্বে একটি গ্রাম তেঁতুলিয়াতে চলে যায়। ওখানে গিয়ে বেশ কয়েকদিন মুক্তিযোদ্ধা বিশারতের অধীনে থাকি। কামান্না আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ঘটনা। এই ঘটনা মনে পড়লে আমার চোখ পানিতে ভেসে যায়।’

‘বাঁচার জন্যে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতরাতে থাকি’-মো. আব্দুস সালাম

মো. আব্দুস সালাম। বাড়ি মাগুরা সদর উপজেলার হাজরাপুর ইউনিয়নের ইছাখাদা গ্রামে। বাবার নাম আফজাল মোল্লা। ২৬ নভেম্বর সংঘটিত কামান্না যুদ্ধের অন্যতম একজন মুক্তিযোদ্ধা। এই যুদ্ধে যে সব মুক্তিযুদ্ধে সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান তিনিও তাঁদেরই একজন।
এই বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন এফএফ বাহিনীর সদস্য। সহযোদ্ধাদের সাথে তিনিও গজদুর্বা থেকে কামান্নাতে গিয়ে অবস্থান নিয়েছিলেন। যুদ্ধকালীন সময়ে আব্দুস সালাম মাগুরা একাডেমী স্কুলের ছাত্র ছিলেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তিনি রানাঘাট ইয়থ ক্যাম্পে প্রথম প্রশিক্ষণ নেন। তারপর বিহারের চাকুলিয়া থেকে গেরিলা প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশ শত্র“মুক্ত করার প্রত্যয়ে ঝিনেদার কালিগঞ্জ এলাকা দিয়ে মাগুরা নিজ এলাকাতে এসে সশস্ত্র অবস্থান নেন।

কামান্না যুদ্ধের বর্ণনা এবং নিজের বেঁচে থাকার সেই ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, ‘যদ্দুর মনে পড়ে গজদুর্বা হয়ে রাউতারা দিয়ে যুগনির আশেপাশের পথ ধরে ফাদিলপুরে যাই। তারপর ঘাট পার হয়ে কামান্নাতে অবস্থান নিই। রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষে পর্যায়ক্রমে ডিউটি পড়ে। রাত দুটোর দিকে আমার ডিউটি শেষ করে আমি শুয়ে পড়ি। মনে হয় ফজরের আযানের আগেই পাকহানাদাররা আমাদের ঘিরে ফেলে। প্রথমে এক রাউন্ড গুলির শব্দ শুনি। এরপর টানা ব্রাশফায়ার শুরু হয় আমাদের অবস্থানের ওপর। আমরা খেই হারিয়ে ফেলি। আমাদের যোদ্ধারা প্রতিরোধের চেষ্টা করতে থাকে। আমি রাইফেল নিয়ে বের হয়ে পড়ি। আমাদের অনেকেই তখন বাঁচার আপ্রাণ চেষ্টা করছে।

একসময় আমার আঙুলে গুলি লাগে। এ অবস্থায় আমি কোনোরকমে ঘর থেকে বের হয়ে দক্ষিণ দিকের বারান্দার পাশ দিয়ে একটা লিচু গাছের আড়ালে অবস্থান নিই। এরপর ক্রলিং করতে করতে নদীর দিকে যাই। তারপর বাঁচার জন্যে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতরাতে থাকি। আমি, বাঁশি এবং লিয়াকত (ছোট) এই তিনজন দুই কিলোমিটার দূরে গিয়ে উঠি। ওখানে আমি কোনো এক বাড়িতে আমরা আশ্রয় নিই। একদিন ঐ বাড়িতে থাকি। তারপর ওখান থেকে আলমখালীতে ফিরে আসি এবং মতলেব ডাক্তারের কাছ থেকে চিকিৎসা গ্রহণ করি।’

‘সেদিন কীভাবে যে প্রাণে বাঁচলাম তা আল্লাহ-ই জানেন’-সিরাজুল ইসলাম সিরাজ

সিরাজুল ইসলাম সিরাজ। জন্ম ফরিদপুর জেলার নগরকান্দা উপজেলার রাধানগর গ্রামে। ছোটবেলায় কাজের সন্ধানে মাগুরাতে এসে আশ্রয় নেন হাজীপুর ইউনিয়নের আরিয়াকান্দি গ্রামের মকবুল হোসেনের বাড়িতে। ঐ বাড়িতে তিনি শ্রমিকের কাজ করতেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে শ্রমিক সিরাজও মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার কিছুপর এই যোদ্ধা ঢাকাতে চলে আসেন এবং দীর্ঘদিন রিকসা চালিয়ে জীবনযাপন করেন। বর্তমানে তিনি ঢাকাতেই থাকেন।

কামান্নার ঘটনা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘মার্চে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই আমি সাত্তার নামে এক পুলিশের সাথে বিষয়খালীর যুদ্ধে সহযোগী হিসেবে অংশগ্রহণ করি। গুলির বাক্স বহন করার দায়িত্ব ছিল আমার। ঐ যুদ্ধে আমি আহত হই। এরপর মে মাসের দিকে আমি রানাঘাটে যাই। ওখান থেকে একটা ক্যাম্পে নিয়ে যায় আমাদের। এসকে ব্যানার্জি নামে এক ক্যাপ্টেনের তত্ত্বাবধানে থাকি আমি। এরপর গেরিলা প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্যে আমাকে বিহারের চাকুলিয়াতে প্রেরণ করে। ওখানে একমাস প্রশিক্ষণ শেষে নানা ঘটনা প্রবাহের মধ্যে বাগদা হয়ে দেশের অভ্যন্তরে ঢুকে মাগুরাতে চলে আসি। মাগুরা এলাকাতে এসে আমি গেরিলা কমান্ডার এসএম আব্দুর রহমানের তত্ত্বাবধানে থাকি। মূলত তাঁর বডিগার্ড হিসেবে কাজ করি।

অন্যদের সাথে আমিও গজদুর্বা থেকে শৈলকূপার কামান্নাতে এসে অবস্থান নিই। যদ্দুর মনে পড়ে মধ্যরাতে আমি ডিউটি শেষ করে ঘুমিয়ে পড়ি। ভোর রাতে বুঝতে পারি অ্যাটাক হয়েছে। চারিদিকে গুলি আর গুলি। দেখি সহযোদ্ধা আতিয়ার রান্নাঘরের দিকে তাক করে গুলি করছে। এর মধ্যে কে কোথায় অবস্থান নিচ্ছে কিছুই বুঝা যাচ্ছিল না। আমি এক সময় ক্রলিং করে পাশেই বাগানে ঢুকে পড়ি। এরপর ওখান থেকে তেতুলিয়া গ্রামে এসে আশ্রয় নিই। সেদিন কীভাবে যে প্রাণে বাঁচলাম তা আল্লাহ-ই জানেন। আসলে সেদিনতো মোটেও বাঁচার কথা ছিল না।

‘গোলজারের রক্ত আমি গায়ে মেখে শুয়ে থাকি’-গোলাম রসুল

মুক্তিযোদ্ধা গোলাম রসুল। বাড়ি মাগুরা সদর উপজেলার হাজীপুরের দক্ষিণপাড়াতে। ৬৫ সালে আনসারবাহিনীতে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ভারতের রানাঘাট ইয়থ ক্যাম্পে গিয়ে রিপোর্ট করে নিজ এলাকায় চলে আসেন। যোগ দেন হাজীপুর আঞ্চলিকবাহিনীতে।
সেদিনের ঘটনা সম্পর্কে গোলাম রসুল বলেন, ‘ভোর বেলা গুলির শব্দ শুনতে পাই। বুঝতে পারি পাকহানাদাররা অ্যাট্যাক করেছে। সবাই বাঁচার জন্যে তৎপর হয়ে উঠি। এক পর্যায়ে খানিকটা গোলাগুলি থেমে গেলে আমি, গোলজার, জলিলসহ বেশ কয়েকজন ছাদে গিয়ে লুকিয়ে থাকি। ওখানে একটা চাটাই-এর নিচে লুকিয়ে থাকি। লুকানো অবস্থায় বুঝতে পারি অনেক সহযোদ্ধার মৃত্যু হয়েছে। পাকসেনারা দ্রুত আমাদের সহযোদ্ধাদের হত্যা করে পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফেলে। একসময় পাকসেনারা রাজাকারদের সাথে নিয়ে ঘরে ঢুকে। তখন মনে মনে ভাবি আর বোধ হয় বাঁচতে পারব না। আল্লার নাম নিতে থাকি। মিলিটারি আসতে দেখে আমার পাশেই গুলজার নিজ রাইফেল দিয়ে নিজের শরীরে গুলি করে। আমি গুলজারের রক্ত গায়ে মেখে মৃত্যুর ভান করে শুয়ে থাকি। কিছুক্ষণের মধ্যেই পাক মিলিটারি ঘরের ভেতর প্রবেশ করে। ওরা চারদিকে রক্ত দেখে ভাবে সবার মৃত্যু হয়েছে। পাকআর্মিরা চলে যাই। আমি ওখান থেকে বের হয়ে নদী সাঁতরে ওপারে ফাদিলপুর চলে যাই। ওখানে আইনাল সর্দার নামে একজনের বাড়িতে আশ্রয় নিই। সেদিন কিভাবে বেঁচেছি আমি নিজেই জানি না।’

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

শেয়ার করুন: