প্লাস্টিক উৎপাদনকারীদেরও দায়িত্ব নিতে হবে: পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী
‘প্লাস্টিকমুক্ত ক্যাম্পাস ম্যানুয়াল’ উদ্বোধন, শিক্ষার্থীদের পরিবেশ রক্ষায় নেতৃত্ব দেওয়ার আহ্বান

পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী প্লাস্টিক উৎপাদনকারীদের দায়িত্বের বিষয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন, পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য।. Channel i News – চ্যানেল আই নিউজ
প্লাস্টিক দূষণ রোধে শুধু সরকারের ওপর নির্ভর না করে উৎপাদক থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী—সবাইকে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, প্লাস্টিক উৎপাদনকারীদেরও তাদের পণ্যের পরিবেশগত প্রভাবের দায় নিতে হবে। পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হলে কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও জরুরি।
রোববার পরিবেশ অধিদপ্তরের অডিটোরিয়ামে এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো) আয়োজিত ‘প্লাস্টিকমুক্ত ক্যাম্পাস ম্যানুয়াল’ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশের বিদ্যালয়গুলোতে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও টেকসই পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে ‘প্লাস্টিকমুক্ত ক্যাম্পাস ম্যানুয়াল’ প্রকাশ করেছে এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো)। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসির সহযোগিতায় তৈরি এই ম্যানুয়ালটি শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য পরিবেশবিষয়ক ব্যবহারিক নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করবে।
অনুষ্ঠানে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, “এনফোর্সমেন্ট ছাড়া পরিবেশগত কাজ সফল করা সম্ভব নয়। সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে। গত সপ্তাহে ইপিআর (বর্ধিত উৎপাদক দায়িত্ব) পাস হয়েছে, তাই প্লাস্টিক উৎপাদনকারীদেরও দায়িত্ব নিতে হবে।”
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা যদি বিদ্যালয় ও আশপাশের বাগান পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব নেয় এবং পরিবেশ রক্ষায় সক্রিয় হয়, তাহলে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। পরিবেশের স্বার্থে ইটভাটায় কাঠ পোড়ানো বন্ধ করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, “আমাদের মূল সমস্যা হলো, আমরা পরিবেশের চেয়ে ব্যবসায়িক লাভকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি, যা ঠিক নয়।”
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, ব্যাপকভাবে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহারের কারণে দেশের পরিবেশগত সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, মানুষের আচরণগত পরিবর্তনও জরুরি। আর সেই পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে বিদ্যালয় থেকেই।
২০২২ সাল থেকে দেশের আটটি বিভাগে ‘প্লাস্টিকমুক্ত ক্যাম্পাস’ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে এসডো। উদ্যোগটির প্রথম ধাপে ১৬টি বিদ্যালয়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। দ্বিতীয় ধাপে আরও সাতটি বিদ্যালয় যুক্ত হয়েছে।
এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের পরিবেশবিষয়ক জ্ঞানকে বাস্তব জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা এবং আচরণগত পরিবর্তনের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব জীবনাচরণে উৎসাহিত করা। বিদ্যালয়, পরিবার ও কমিউনিটিতে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে ধীরে ধীরে তা নির্মূল করার লক্ষ্যও রয়েছে উদ্যোগটির।
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও পরামর্শের ভিত্তিতে তৈরি ম্যানুয়ালটিতে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের মতামত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগী সংগঠন ব্রেক ফ্রি ফ্রম প্লাস্টিক (বিএফএফপি) ও প্লাস্টিক সলিউশনস ফান্ডের গবেষণাভিত্তিক পরামর্শও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ম্যানুয়ালটিতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য বর্জ্য আলাদা করা, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের বিকল্প ব্যবহার, পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্য ব্যবহারে উৎসাহ এবং বিদ্যালয়ভিত্তিক পরিবেশবান্ধব কার্যক্রমের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের পরিবেশ রক্ষায় নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি বিদ্যালয়গুলোতে ‘জিরো-ওয়েস্ট’ চর্চা গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।
অনুষ্ঠানে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব ইনচার্জ ড. ফাহমিদা খানম বলেন, বিদ্যালয়ে ভালো কাজ করা শিক্ষার্থীদের পরিবেশ অ্যাম্বাসেডর হিসেবে তৈরি করা যেতে পারে। তাদের মাধ্যমেই আশপাশের অন্যান্য বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা বন্ধুদের কাছ থেকে পাওয়া বার্তা বেশি গুরুত্ব দিয়ে শোনে। তাই পরিবেশবান্ধব অভ্যাস গড়ে তুলতে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে পরিবেশ আন্দোলন গড়ে তোলা যেতে পারে।
একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে দৈনন্দিন জীবনেও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। খাবার অর্ডারের সময় সিঙ্গেল-ইউজ প্লাস্টিক না দেওয়ার অনুরোধ জানানো এবং কাগজের প্যাকেট ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। পাশাপাশি কাগজের তৈরি ব্যাগের ব্যবহার বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন।
পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. লুৎফর রহমান বলেন, শিক্ষার্থীরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল হয়ে উঠলে দেশের অনেক পরিবেশগত সমস্যা সমাধান করা সম্ভব। অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এখান থেকে পাওয়া জ্ঞান অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দিলে পরিবেশ রক্ষায় তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তিনি জানান, সচিবালয়ে এখন প্লাস্টিকের বোতল রাখা হয় না; সেখানে কাচের গ্লাস ব্যবহারের চর্চা করা হচ্ছে।
এসডোর চেয়ারম্যান সৈয়দ মার্গুব মুর্শেদ বলেন, পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একক কোনো উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। পরিচ্ছন্ন ও টেকসই বাংলাদেশ গড়তে সরকার, বেসরকারি খাত, সুশীল সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও তরুণদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
এসডোর নির্বাহী পরিচালক সিদ্দীকা সুলতানা বলেন, তরুণ শিক্ষার্থীদের কাছে পরিবেশ শিক্ষাকে আরও বাস্তব ও কার্যকর করে তুলতে এসডো প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা দিয়ে বিদ্যালয়গুলোতে টেকসই অভ্যাস এবং পরিবেশবিষয়ক নেতৃত্ব গড়ে তুলতে চান তারা।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসির ডিএমডি ও জিসিআরও উসমান রাশেদ মুইন বলেন, পরিবেশ সচেতনতা ও টেকসই চর্চা গড়ে তোলার উদ্যোগে সহযোগিতা করতে তাদের প্রতিষ্ঠান প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। শিক্ষার মাধ্যমে তরুণদের পরিবেশ রক্ষায় যুক্ত করা দায়িত্বশীল ও পরিবেশবান্ধব সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, পরিবেশগত পারফরম্যান্সের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান উদ্বেগজনক। এ অবস্থায় বিদ্যালয় পর্যায় থেকেই পরিবেশবান্ধব আচরণ গড়ে তোলা প্রয়োজন। ‘প্লাস্টিকমুক্ত ক্যাম্পাস’ উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শুধু প্লাস্টিক দূষণের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জানানো নয়, বরং নিজেদের বিদ্যালয় ও কমিউনিটিতে পরিবেশ রক্ষার নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হবে।
এসডো মনে করে, বিদ্যালয়কে পরিবেশবান্ধব আচরণ শেখার একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে তার প্রভাব শ্রেণিকক্ষের বাইরেও পরিবার ও সমাজে ছড়িয়ে পড়বে। এ কারণে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, উন্নয়ন সহযোগী ও সুশীল সমাজের সংগঠনগুলোকে উদ্যোগটির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।






