দক্ষিণ কাশ্মীরের পুলওয়ামাতে এক আত্মঘাতী জঙ্গি হামলায় ৪০ জন ভারতীয় জোয়ানের নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতি দিন দিন বেড়েই চলেছে। ওই আত্মঘাতী হামলার ১২ দিনের মাথায় ভারতীয় বিমানসেনা সীমান্ত অতিক্রম করে পাকিস্তানি ভূখণ্ডে কথিত সন্ত্রাসবাদীদের ঘাঁটিতে বোমা বর্ষণ করেছে। সরকারিভাবে এই সফল অভিযান এবং জঙ্গিঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেবার কথা ঘোষণা করা হলেও কত জঙ্গির মৃত্যু হয়েছে তা উল্লেখ করা হয়নি। অবশ্য সংবাদমাধ্যম নানা ধরনের সূত্র উল্লেখ করে মৃতের সংখ্যা ২০০ থেকে ৪০০ জন বলে দাবি করছে। যদিও এইসব কোনও সূত্রকেই নির্ভরযোগ্য বা বিশ্বস্ত বলার সুযোগ নেই। যদি মৃত্যুর সংখ্যা সংক্রান্ত নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকত তাহলে নিঃসন্দেহে ভারতীয় সরকারের পক্ষ থেকে তা জানানো হতো। বিপরীতে পাকিস্তান সরকারিভাবে বিমান হামলার কথা স্বীকার করলেও কোনও ক্ষয়ক্ষতি বা মৃত্যুর কথা অস্বীকার করেছে।
যাহোক, এরপর দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি গোলাবর্ষণ ও বিমান হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে পরস্পরের দাবি অনুযায়ী, ভারতের দুটি ও পাকিস্তানের একটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়। এর মধ্যে অভিনন্দন নামে একজন ভারতীয় পাইলট পাকিস্তানি সেনাদের হাতে আটক হন। অনেক কথা চালাচালি ও বাকযুদ্ধের পর পাকিস্তানের হাতে আটক ভারতের বৈমানিক অভিনন্দনকে মুক্তি দেয় পাকিস্তান। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছেন, শান্তিপ্রক্রিয়া চালিয়ে নিয়ে যেতেই এই উদ্যোগ। কিন্তু ভারতের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের সঙ্গে শান্তি আলোচনার কোনো উদ্যোগ এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না।
অভিনন্দনের মুক্তির পর উভয় দেশের সম্পর্কের পারদ গলবে বলে যে আশা করা হয়েছিল, তা ক্রমেই হাতাশায় পরিণত হতে চলেছে। অভিনন্দনের উপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়েছে, তাকে দিয়ে জোর করে ভিডিওবার্তায় বক্তব্য দেওয়ানো হয়েছে ইত্যাদি নানা অভিযোগ তুলে ইতিমধ্যে ভারতীয় গণমাধ্যমে পাকিস্তান বিদ্বেষকে আরও চাঙ্গা করা হয়েছে। দু’দেশই যুদ্ধযুদ্ধ জিগির তুলে সাধারণ মানুষকে ত্রস্ত ও উদ্বিগ্ন করে তোলার চেষ্টা করছে। দুই দেশই একে অপরকে মোকাবিলা করতে রণপ্রস্তুতি নেওয়ার পাশাপাশি বিশ্বনেতাদের নিজেদের পক্ষে টানার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারত-পাকিস্তান দু দেশই পরমাণু ক্ষমতায় শক্তিশালী। এই বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত দুই দেশ হয়তো সরাসরি সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়াবে না। পাকিস্তানের সঙ্গে কাশ্মীর নিয়ে বর্তমান সময়ের উত্তেজনায় সামরিক শক্তি প্রদর্শনের পাশাপাশি কূটনৈতিক উদ্যোগও জোরদার করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। পক্ষান্তরে পাকিস্তান মুখে শান্তি ও আলোচনার কথা বললেও তারাও যথাযথ রণপ্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। উভয় দেশের সরকারপ্রধানরা সামরিকসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠকও করেছেন।
একথা ঠিক যে, দুই দেশের মধ্যে যে রকম উত্তেজনা ও বৈরিতা, তাতে সত্যি সত্যিই যদি যুদ্ধ বেধে যায়, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। পুলওয়ামায় হামলার পর ভারত এর সমুচিত জবাব দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল। অন্যদিকে, পাকিস্তান বলেছিল যে আক্রান্ত হলে তারাও বসে থাকবে না। দুই দেশের কেউই অবশ্য বসে নেই। ভারত চাইছে পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদের সমার্থক বানিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সরব হতে। একই সঙ্গে ৪০ জোয়ান খুনের ‘বদলা’ নিতে জঙ্গি ঘাঁটি হিসেবে চিহ্নিত স্থানগুলোতে সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে। যেমনটি ইরাক কিংবা আফগানিস্তানে আমেরিকা করেছে। পক্ষান্তরে পাকিস্তান চাইছে, ভারতের অভ্যন্তরে জঙ্গি আক্রমণের ঘটনায় যে তাদের কোনো হাত নেই, তা প্রমাণ করতে। পাকিস্তানের দাবি, তাদের দেশ কোনো জঙ্গি হামলার উৎস নয়। এটা ভারতের ষড়যন্ত্র এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া। ভারত বাড়াবাড়ি করলে পাকিস্তান তার উচিত শিক্ষা দেবে।
পারস্পরিক ঘৃণা ও বিদ্বেষের উপর প্রতিষ্ঠিত এই দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্যই বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুটো দেশের হাতেই পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। সামরিক শক্তির দিক থেকেও এই দুই দেশ বিশ্বের সেরাদের তালিকায় রয়েছে। গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ারের ২০১৮ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সামরিক শক্তির দিক থেকে বিশ্বের ১৩৬টি দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান চতুর্থ, অন্যদিকে পাকিস্তানের অবস্থান সতেরো। জনসংখ্যার দিক থেকে পাকিস্তানের চেয়ে অনেক এগিয়ে ভারত। পাকিস্তানের জনসংখ্যা যেখানে সাড়ে ২০ কোটি, সেখানে ভারতের জনসংখ্যা ১২৮ কোটির বেশি। পাকিস্তানের সৈন্য সংখ্যা ৯ লাখ ১৯ হাজার হলেও ভারতের সেনাবাহিনীর সদস্য সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি- ৪২ লাখ।
এখন প্রশ্ন হলো, এই দুই প্রতিবেশী দেশ সত্যি সত্যিই কি যুদ্ধে লিপ্ত হবে? বিশ্লেষকদের মতে, চূড়ান্ত বিচারে যুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা কম। কারণ পরমাণু শক্তির অধিকারী এই দুই দেশই যুদ্ধের ক্ষত এবং ক্ষতি বোঝে। কিন্তু যুদ্ধ না হলে কী হবে, দুই দেশের শাসকদের যুদ্ধংদেহী মনোভাব একটা অসুস্থ পরিবেশ তৈরি করছে। বৈরিতা আর বিদ্বেষ উৎপাদন করছে। উভয় রাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যে পারস্পরিক ঘৃণা পুরো এলাকায় একটা স্থায়ী মানবিক সংকট তৈরি করছে। পাকিস্তানে তো নিয়ম করেই ভারত-বিরোধিতার বীজ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। ইন্ডিয়া অ্যান্ড উইল রিমেন আওয়ার এনিমি নাম্বার ওয়ান। জানিয়েছিলেন প্রাক্তন পাক-সেনা প্রধান আসফাক পারভেজ কিয়ানি।
ভারত সম্পর্কে ঘৃণার এই শেকড়টি পাকিস্তানের গভীরে রয়ে গিয়েছে। ছোটবেলা থেকেই পাকিস্তানের শিশুদের মনে ভারত সম্পর্কে এই ঘৃণার বীজটি বপন করে দেওয়া হয়। পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিনা রব্বানি খারও এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ছোটবেলা থেকেই পাকিস্তানের শিশুদের মনে ভারত সম্পর্কে ঘৃণা গেঁথে দেওয়া হয়। এটাই পাকিস্তানের জাতীয় পরিচয়ের মধ্যে ঢুকে গিয়েছে। প্রায় ছ’দশক ধরে পাক-শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে এই ঘৃণার লালন-পালন চলছে বলে জানিয়েছিলেন হিনা। এখন ভারতীয়দের মধ্যেও একই রকম পাকিস্তান বিদ্বেষ লালন চর্চা করা হয়। বিজেপি সরকারের শাসনামলে জাতীয়তাবাদের নামে উগ্র-পাকিস্তান ও মুসলিম বিদ্বেষ এখন ভয়াবহ অবস্থায় পরিণত হয়েছে। কাশ্মীর, মুসলিম, জঙ্গি ও পাকিস্তানকে সমার্থক মনে করে সারা ভারত জুড়ে কাশ্মীরের নাগরিকদের উপর আক্রমণ হামলা পরিচালিত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পাাকিস্তান-ভারতের মধ্যে স্বাভাবিক ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান খুব সহজে প্রতিষ্ঠিত হবে বলে মনে হয় না।
আর যে কাশ্মীর নিয়ে এত ঝামেলা হচ্ছে, রক্তপাত হচ্ছে, পাকিস্তান কখনই যুদ্ধের মাধ্যমে কাশ্মীরের দখল নিতে পারবে বলে মনে হয় না। সে ক্ষেত্রে আলোচনাই এক মাত্র পথ। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন সুসম্পর্ক আর পারস্পরিক বিশ্বাস। ঘৃণার বাতাবরণে তা সম্ভব নয়।
প্রশ্ন হলো, ভারত-পাকিস্তানের এই রণহুঙ্কার কেন? পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে তিন-তিনটি যুদ্ধ হয়েছে। তাহলে আজ দুই পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র কী করবে? তারা কি যুদ্ধের মধ্য দিয়ে সমাধানের রাস্তা পেতে পারে? যুদ্ধ কারা চায়? অস্ত্রব্যবসায়ী চায়, তার অস্ত্র বিক্রি হবে। কট্টরবাদীরা চায়, দাঙ্গা বাজেরাও চায়। কিন্তু সাধারণ মানুষ কি কখনও কোনও স্তরে যুদ্ধ চাইতে পারে?
সমস্যার সমাধান সর্বদাই আলোচনার মাধ্যমে করতে হবে। শান্তিপ্রক্রিয়ার আলাপআলোচনার কোনও বিকল্প নেই। ভারত-পাক সম্পর্কটা যেন বানরের তৈলাক্ত বাঁশে ওঠা আর নামা। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি বারংবার। এর অবশ্য কারণও আছে। আসলে, পাকিস্তানের শরীরের মধ্যেও তো আছে অনেক পাকিস্তান। আইএসআই-সেনার পাকিস্তান, মোল্লাতন্ত্রের পাকিস্তান, আবার তুলনামূলক ক্ষুদ্র অবয়বের হলেও রাজনৈতিক গণতন্ত্রের পাকিস্তান। তাই ইমরানের নেতৃত্বে পাকিস্তানের খোলসের মধ্য দিয়ে যখন আর এক পাকিস্তান বিকশিত হতে চাইছে তখন অন্যদের দায়িত্ব বেড়ে যায় অনেক অনেক বেশি।
ইতিমধ্যে পাকিস্তানের পরিচিতি হয়ে ওঠেছে ‘সন্ত্রাসবাদের আঁতুড়ঘর’ হিসেবে। পাকিস্তানের প্রধান কাজ এখন তাদের এই পরিচিতির প্রবল ধারণাকে (পারসেপশন) বিশ্বের কাছে বদলানোর। আবার ভারতেরও দায়িত্ব দেশের মধ্যে সন্ত্রাসের বিরোধিতা করতে গিয়ে পারস্পরিক শান্তিপ্রচেষ্টায় জল না ঢালা। কৌশল যাই হোক, কিন্তু শান্তির পথকে শেষ সমাধান বলে ভাবতেই হবে! আরেকটি কথা। যুদ্ধ হলে কিন্তু আর কিছু নয়, কেবল নিরীহ কিছু মানুষের রক্ত ঝরবে৷ কিন্তু, রক্তের লাল রঙের সৌজন্যে কি কোনও দিন শান্তি ফিরেছে? শান্তির রঙ যে সাদা!
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








