বিশ্ব দৃষ্টি দিবস: শৈশব থেকে বার্ধক্য—প্রতিটি বয়সেই চোখের যত্ন জরুরি

ছবি: সংগৃহীত
চোখের সমস্যা দেখা দেওয়ার পরই সাধারণত মানুষ চোখের যত্ন নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। কিন্তু ততদিনে কিছু রোগের কারণে যে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে যায়, তা আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নাও হতে পারে। তাই বিশ্ব দৃষ্টি দিবস হতে পারে চোখের যত্নে সচেতন হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
প্রতি বছর ৮ অক্টোবর বিশ্ব দৃষ্টি দিবস পালিত হয়। এবারের প্রতিপাদ্য ‘লাভ ইওর আইস’—অর্থাৎ ‘চোখকে ভালোবাসুন’। এর মূল লক্ষ্য হলো ব্যক্তিগত সচেতনতা, মানুষের অভিজ্ঞতা এবং সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে সবার জন্য সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও প্রয়োজনীয় চক্ষুসেবা নিশ্চিত করা।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতে ৫০ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে প্রায় ৯৩ শতাংশ অন্ধত্বই ছিল প্রতিরোধযোগ্য। শুধু ছানিই ছিল প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ অন্ধত্বের কারণ। অর্থাৎ সময়মতো চিকিৎসা ও প্রতিরোধের মাধ্যমে এসব দৃষ্টিহানি অনেকটাই ঠেকানো সম্ভব।
শৈশব: মায়োপিয়া থেকে চোখকে সুরক্ষা
ভারতের শিশুদের মধ্যে মায়োপিয়া বা ক্ষীণদৃষ্টি দ্রুত বাড়ছে। এ অবস্থায় চোখের গোলক স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি লম্বা হয়ে যায়। ফলে আলো রেটিনার ওপর সরাসরি না পড়ে তার সামনে গিয়ে কেন্দ্রীভূত হয় এবং দূরের বস্তু ঝাপসা দেখা যায়। দীর্ঘ সময় কাছের কাজে মনোযোগ দেওয়া এবং বাইরে কম সময় কাটানো—দুটিই এর ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
শিশুদের চোখ ভালো রাখার অন্যতম কার্যকর উপায় হলো প্রতিদিন পর্যাপ্ত সময় বাইরে থাকা। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন প্রায় দুই ঘণ্টা বাইরে কাটালে শিশুদের মায়োপিয়া হওয়ার ঝুঁকি কমতে পারে। গবেষকদের ধারণা, উজ্জ্বল প্রাকৃতিক আলো রেটিনায় ডোপামিন নিঃসরণ বাড়িয়ে চোখের অতিরিক্ত বৃদ্ধি ধীর করতে সাহায্য করে। শুধু উজ্জ্বল শ্রেণিকক্ষ বা জানালার পাশে বসা একই ধরনের সুরক্ষা দেয় না।
পড়াশোনার সময় শিশুদের ২০-২০-২০ নিয়ম মেনে চলতে উৎসাহিত করা যেতে পারে। প্রতি ২০ মিনিট পর ২০ ফুট দূরের কোনো বস্তুর দিকে অন্তত ২০ সেকেন্ড তাকাতে হবে। এতে চোখের ফোকাস করার পেশি কিছুটা বিশ্রাম পায়।
শিশু চোখে সমস্যা আছে বলে অভিযোগ না করা পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত নয়। শিশুরা অনেক সময় ঝাপসা দেখার সঙ্গে মানিয়ে নেয়। বোর্ড দেখার সময় চোখ কুঁচকে তাকানো, টিভির খুব কাছে বসা কিংবা মাথা একদিকে কাত করে দেখার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চোখ পরীক্ষা করানো প্রয়োজন। স্কুলে যাওয়ার আগে অন্তত একবার শিশুর চোখ পরীক্ষা করানো ভালো। বিশেষ করে অ্যামব্লায়োপিয়া বা ‘লেজি আই’ থাকলে দ্রুত চিকিৎসা জরুরি, কারণ দৃষ্টিশক্তির বিকাশের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই এর চিকিৎসা সবচেয়ে কার্যকর।
শিশুর মায়োপিয়া থাকলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কম মাত্রার অ্যাট্রোপিন ড্রপ এবং বিশেষ ধরনের চশমার লেন্সের মাধ্যমে মায়োপিয়ার অগ্রগতি ধীর করা সম্ভব হতে পারে। তবে এসব চিকিৎসা অবশ্যই চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ও তত্ত্বাবধানে নিতে হবে।
২০ ও ৩০-এর দশক: স্ক্রিনের যুগে চোখের বাড়তি যত্ন
কম্পিউটার, স্মার্টফোন ও অন্যান্য ডিজিটাল পর্দার সামনে দীর্ঘ সময় কাটানোর কারণে চোখের পলক ফেলার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ফলে চোখের ওপরের অশ্রুস্তর দ্রুত শুকিয়ে গিয়ে চোখে খসখসে ভাব, ক্লান্তি ও অস্বস্তি তৈরি হতে পারে।
সচেতনভাবে বারবার চোখের পলক ফেলতে হবে। কম্পিউটার মনিটর চোখের সমতলের সামান্য নিচে রাখলে চোখের পাতা চোখের বেশি অংশ ঢেকে রাখতে পারে। বড়দের ক্ষেত্রেও ২০-২০-২০ নিয়ম কার্যকর।
চোখের ক্লান্তি কমাতে ব্লু-লাইট ফিল্টারযুক্ত চশমা এখন বেশ জনপ্রিয়। তবে বিভিন্ন গবেষণার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চোখের ক্লান্তি কমাতে এসব চশমার কার্যকারিতা সীমিত। তাই প্রয়োজন না থাকলে এ ধরনের চশমায় অর্থ ব্যয় না করে চোখ পরীক্ষা করানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সামান্য অদৃষ্টিদোষ বা চোখের ফোকাসের সমস্যা থেকেও চোখে চাপ বা ক্লান্তি তৈরি হতে পারে, যা সঠিক চশমায় অনেকটাই ঠিক করা সম্ভব।
চোখের লালভাব কমানোর ড্রপ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে হবে। এসব ড্রপ সাময়িকভাবে রক্তনালি সংকুচিত করে লালভাব কমালেও পরে তা আরও বেড়ে যেতে পারে। চোখ শুষ্ক হলে সংরক্ষণকারী উপাদানমুক্ত লুব্রিকেটিং বা কৃত্রিম অশ্রুর ড্রপ ব্যবহার করা যেতে পারে।
বিশেষ সতর্কতার বিষয় হলো স্টেরয়েড আই ড্রপ। চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া কখনোই এ ধরনের ড্রপ ব্যবহার করা উচিত নয়। দীর্ঘদিন বা ভুলভাবে ব্যবহারে স্টেরয়েড ড্রপ থেকে গ্লুকোমা ও ছানি হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
৪০ ও ৫০-বছর বয়স: যে সময় চোখ পরীক্ষা এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়
৪০ বছর বয়সের পর কাছের লেখা পড়তে চশমার প্রয়োজন হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু শুধু পড়ার চশমার প্রয়োজন হচ্ছে বলেই চোখের অন্য সমস্যা নেই—এমন ধারণা ঠিক নয়। এ সময় থেকেই গ্লুকোমার ঝুঁকি বাড়তে শুরু করে।
গ্লুকোমা শুরুতে সাধারণত ব্যথা বা স্পষ্ট ঝাপসা দৃষ্টি তৈরি করে না। প্রথমে পার্শ্ববর্তী দৃষ্টিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মস্তিষ্ক অনেক সময় সেই ঘাটতি পূরণ করে নেয় বলে রোগী বিষয়টি টেরও পান না। রোগটি ধরা পড়ার আগেই স্থায়ী দৃষ্টিক্ষতি হয়ে যেতে পারে।
তাই ৪০ বছর বয়সের মধ্যে অন্তত একবার পূর্ণাঙ্গ চোখ পরীক্ষা করানো উচিত। ডায়াবেটিস, পরিবারে গ্লুকোমার ইতিহাস, উচ্চমাত্রার মায়োপিয়া বা দীর্ঘদিন স্টেরয়েড ব্যবহারের ইতিহাস থাকলে আরও আগেই পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।
শুধু চোখের চাপ মাপলেই গ্লুকোমা শনাক্ত করা যায় না। অনেক এশীয় রোগীর স্বাভাবিক চোখের চাপ থাকলেও গ্লুকোমা হতে পারে। তাই অপটিক নার্ভ পরীক্ষা, প্রয়োজন অনুযায়ী ইমেজিং এবং ভিজ্যুয়াল ফিল্ড পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।
ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রেও বিশেষ সতর্কতা জরুরি। ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি শুধু বয়স্কদের রোগ নয়। টাইপ-২ ডায়াবেটিস ধরা পড়ার সময় থেকেই নিয়মিত, সাধারণত বছরে অন্তত একবার, ডাইলেটেড রেটিনাল পরীক্ষা করা প্রয়োজন। দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হওয়ার আগেই রেটিনায় গুরুতর ক্ষতি হতে পারে।
৬০ বছরের পর: দৃষ্টি ভালো থাকলেও পরীক্ষা জরুরি
বয়স বাড়ার সঙ্গে অনেকেই মনে করেন, বই পড়তে পারছেন মানেই চোখ ভালো আছে। কিন্তু পড়ার সক্ষমতা মূলত কেন্দ্রীয় দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা করে। চোখের অন্যান্য অংশে দীর্ঘদিন ধরে রোগ তৈরি হলেও শুরুতে তা পড়ার ক্ষমতায় প্রভাব নাও ফেলতে পারে।
এই বয়সে ছানি একটি সাধারণ সমস্যা। চোখের লেন্স ঘোলা হয়ে গেলে রাতে আলোয় ঝলকানি বা চারপাশে বলয় দেখা, রং ফ্যাকাশে মনে হওয়া কিংবা বারবার চশমার পাওয়ার পরিবর্তনের মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। তবে ছানি এমন একটি রোগ, যার চিকিৎসায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে দৃষ্টিশক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
বয়সজনিত ম্যাকুলার ডিজেনারেশন বা এএমডি কেন্দ্রীয় দৃষ্টিশক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে পড়া, লেখা কিংবা মানুষের মুখ চেনার মতো কাজ কঠিন হয়ে যেতে পারে। সোজা রেখা বাঁকা দেখা এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। একটি চোখ ঢেকে অন্য চোখ দিয়ে দরজার ফ্রেম বা অ্যামসলার গ্রিডের দিকে তাকিয়ে মাঝেমধ্যে দৃষ্টি পরীক্ষা করা যেতে পারে।
এএমডি-এর ক্ষেত্রে ধূমপান একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকিপূর্ণ কারণ। তাই ধূমপান বন্ধ করা অত্যন্ত জরুরি। কিছু নির্দিষ্ট ভিটামিন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট নির্দিষ্ট রোগীর ক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এসব গ্রহণ করা উচিত নয়।
এই বয়সেও গ্লুকোমা ও ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথির ঝুঁকি থেকে যায়। তাই ৬০ বছর বয়সের পর বিশেষ করে ডায়াবেটিস, গ্লুকোমা, AMD বা চোখের রোগের পারিবারিক ইতিহাস থাকলে বছরে অন্তত একবার চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে পরীক্ষা করানো ভালো। পরীক্ষায় চোখের চাপ, অপটিক নার্ভ এবং ডাইলেটেড রেটিনাল মূল্যায়ন থাকা প্রয়োজন।
রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং বাইরে বের হলে অতিবেগুনি রশ্মি প্রতিরোধী সানগ্লাস ব্যবহার করাও গুরুত্বপূর্ণ।
যে বয়সেই হোক, চোখের যত্ন জরুরি
শুষ্ক চোখের সমস্যা এখন শুধু বয়স্কদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের মধ্যেও এটি দেখা যাচ্ছে। নিয়মিত চোখের পলক ফেলা, উষ্ণ সেঁক, চোখের পাতার পরিচ্ছন্নতা এবং প্রয়োজনে ঘরের আর্দ্রতা বজায় রাখা উপকারী হতে পারে। শুধু বেশি পানি পান করলেই শুষ্ক চোখের সমস্যা দূর হবে—এমন প্রমাণ নেই। চোখে দীর্ঘস্থায়ী খসখসে ভাব বা অস্বস্তি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
অ্যালার্জির কারণে চোখ চুলকালে চোখ ঘষা উচিত নয়। অতিরিক্ত চোখ ঘষলে কর্নিয়ার ক্ষতি হতে পারে এবং কেরাটোকোনাসের মতো রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। ঠান্ডা সেঁক এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ড্রপ ব্যবহার করা যেতে পারে।
কর্মক্ষেত্র, খেলাধুলা কিংবা ঘরের কাজেও চোখে আঘাত লাগতে পারে। খেলাধুলা, বাড়ির মেরামতের কাজ বা শক্তিশালী রাসায়নিক পরিষ্কারক ব্যবহারের সময় পলিকার্বোনেটের তৈরি সুরক্ষাচশমা ব্যবহার করা উচিত।
চোখে কোনো রাসায়নিক পদার্থ ছিটকে পড়লে চোখ ঘষা যাবে না। পরিষ্কার প্রবাহমান পানি দিয়ে অন্তত ১৫ মিনিট চোখ ধুতে হবে এবং দ্রুত জরুরি চিকিৎসাকেন্দ্রে যেতে হবে।
চোখের যত্নে অবহেলা নয়
চোখের যত্নে বড় ব্যয়ের প্রয়োজন সবসময় হয় না। বরং নিয়মিত পরীক্ষা, সচেতনতা এবং সময়মতো চিকিৎসাই দৃষ্টিশক্তি রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
শিশুদের প্রতিদিন বাইরে খেলাধুলা বা সময় কাটানোর সুযোগ দিতে হবে। ৪০ বছর বয়সের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ চোখ পরীক্ষা করাতে হবে। ডায়াবেটিস থাকলে প্রতি বছর রেটিনা পরীক্ষা জরুরি। ৬০ বছর বয়সের পর নিয়মিত চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
‘এক সপ্তাহে চোখের সমস্যা সারিয়ে দেবে’—এমন কোনো পণ্য বা চিকিৎসার বিজ্ঞাপনে সহজে বিশ্বাস করা উচিত নয়। বিশেষ করে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া স্টেরয়েড আই ড্রপ ব্যবহার করা বিপজ্জনক হতে পারে।
চোখে অস্বস্তি, ব্যথা, ঝাপসা দেখা বা দৃষ্টির পরিবর্তন হলে অপেক্ষা না করে চক্ষু চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ দৃষ্টিশক্তি হারানোর পর তা ফিরিয়ে আনার চেয়ে সময়মতো চোখের যত্ন নেওয়া অনেক বেশি সহজ।





