ফুটপাতের দোকান, বাজার-ঘাট, বাসস্ট্যান্ডসহ বিভিন্ন খাতে চাঁদাবাজির প্রবণতা বাড়ছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এসব নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে সংঘাত-সংঘর্ষ, এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি অস্ত্রধারী ও পেশাদার সন্ত্রাসীরাও এতে জড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর সরকার গঠনের শুরুতে চাঁদাবাজি ও দখলবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিল বিএনপি সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও এ বিষয়ে একাধিকবার কঠোর বার্তা দেন। তবে ছয় মাসের মাথায় সেই অবস্থানে কিছুটা শিথিলতা এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে বিভিন্ন এলাকায় আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে চাঁদাবাজ ও দখলদার চক্র।
সম্প্রতি রাজধানীর নিউমার্কেট, মিরপুর, পল্লবী ও মৌচাক এলাকায় চাঁদা আদায়, ফুটপাত দখল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে একাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গত ১১ আগস্ট রাতে নিউমার্কেট এলাকায় ফুটপাতের দোকান দখল ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে যুবদল ও ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে আহত হন ১৬ জন। ঘটনার পর স্বেচ্ছাচারিতা, পেশিশক্তি প্রদর্শন ও আতঙ্ক সৃষ্টির অভিযোগে দুই সংগঠনের ১০ নেতাকর্মীকে বহিষ্কার এবং একজনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।
এর আগে ৮ জুন মৌচাকের আনারকলি মার্কেটের সামনে সালিশ বৈঠকের মধ্যে স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক নেতা বিল্লাল হোসেন ছুরিকাঘাতে নিহত হন। তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ফুটপাতের দোকান থেকে চাঁদা তোলা নিয়ে বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। মামলায় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের আসামি করা হয়; এ পর্যন্ত এজাহারভুক্ত নয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
পল্লবীর বাউনিয়াবাদ মসজিদ মার্কেট এলাকায় গত ২২ জুলাই দেশীয় অস্ত্র নিয়ে দোকানে হামলা, ভাঙচুর ও ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে মামলা হয়েছে। অন্যদিকে দিনাজপুরে গত ৬ জুলাই অপহরণ করে ১২ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবির অভিযোগে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংশ্লিষ্ট সংগঠনের পাঁচ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
চাঁদাবাজির অভিযোগে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার নজির রয়েছে। গত ২৯ জুলাই চাঁদাবাজি, দখলদারি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগে চাঁদপুরে বিএনপির তিন নেতাকে বহিষ্কার করা হয়। এর আগে নারায়ণগঞ্জে চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ায় বিএনপির এক নেতাকে বহিষ্কার করা হয়। গত ২৯ জুলাই যশোর থেকে চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনসহ চারজনকে চাঁদাবাজির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র ও চাঁদাবাজিসহ ১৩টি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িতদের তালিকা তৈরি ও হালনাগাদ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দখলদারিত্ব ও অন্যান্য অপরাধের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপের পাশাপাশি রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ করাও জরুরি।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক বলেন, চাঁদাবাজি আগেও ছিল, এখনো রয়েছে; কোথাও কোথাও তা আরও বেড়েছে। তাঁর মতে, এটি বন্ধে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। সরকারের শুরুতে নেওয়া পদক্ষেপের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা গেলে চাঁদাবাজি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
সাবেক আইজিপি মো. আবদুল কাইয়ুম বলেন, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সরকার, রাজনৈতিক দল ও সমাজের সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি পুলিশ প্রশাসনকে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু বিচ্ছিন্ন অভিযান বা দলীয় বহিষ্কার নয়, চাঁদাবাজির অর্থনৈতিক উৎস, রাজনৈতিক আশ্রয় ও স্থানীয় আধিপত্যের কাঠামো ভেঙে দিতে না পারলে ফুটপাত থেকে বাজার—কোথাও চাঁদাবাজির দৌরাত্ম্য স্থায়ীভাবে বন্ধ করা কঠিন।









