তারকাদের ডিভোর্সের খবরে আমাদের এত আগ্রহ কেন? মনোবিজ্ঞান কী বলছে

তারকার ডিভোর্সের খবর প্রকাশ হলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় আলোচনা। কেন সম্পর্ক ভাঙল, কে আগে দূরে সরে গেল, তাদের মধ্যে আসলে কী হয়েছিল এসব জানতে অনেকেরই আগ্রহের কমতি থাকে না। কখনো পুরোনো ছবি খোঁজা হয়, পুরোনো সাক্ষাৎকার বিশ্লেষণ করা হয়, এমনকি কে কাকে আনফলো করেছেন, সেটিও হয়ে ওঠে আলোচনার বিষয়।
কিন্তু যাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে এত আগ্রহ, তাদের অনেককেই আমরা ব্যক্তিগতভাবে চিনি না। তাহলে তারকাদের সম্পর্ক ভাঙার খবর আমাদের এতটা টানে কেন?
মনোবিজ্ঞানের গবেষণা বলছে, এর পেছনে শুধু গসিপের আগ্রহ নয়, বরং মানুষের সঙ্গে তারকাদের তৈরি হওয়া এক ধরনের মানসিক সংযোগও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পর্দার মানুষ কেন এত আপন মনে হয়?
মনোবিজ্ঞানে ‘প্যারাসোশ্যাল রিলেশনশিপ’ নামে একটি ধারণা আছে। এটি এমন একতরফা মানসিক সম্পর্ক, যেখানে দর্শক কোনো তারকা বা গণমাধ্যমের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে পরিচিতি বা ঘনিষ্ঠতার অনুভূতি তৈরি করেন, যদিও সেই সম্পর্ক বাস্তবে পারস্পরিক নয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই অনুভূতিকে আরও শক্তিশালী করেছে। তারকারা সেখানে নিজেদের ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার, আনন্দ-বেদনা কিংবা দৈনন্দিন মুহূর্তের ছবি ও ভিডিও শেয়ার করেন। ২০১৬ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, তারকার ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের তথ্য প্রকাশ এবং ভক্তদের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগের অনুভূতি তাদের অনুসারীদের মধ্যে এমন এক ধরনের সামাজিক উপস্থিতি তৈরি করতে পারে, যা প্যারাসোশ্যাল যোগাযোগের অনুভূতিকে বাড়ায়।
ফলে কোনো তারকার বিয়ে বা বিচ্ছেদের খবর আমাদের কাছে কখনো কখনো দূরের কোনো মানুষের খবরের মতো মনে হয় না।
‘সবকিছু তো ঠিকই মনে হচ্ছিল!’
তারকার সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার খবর আমাদের অবাক করার আরেকটি কারণ হলো আমরা তাদের জীবনের সম্পূর্ণ চিত্র দেখি না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণত আনন্দের মুহূর্ত, সুন্দর ছবি, ভ্রমণ, জন্মদিনের শুভেচ্ছা কিংবা ভালোবাসার প্রকাশই বেশি চোখে পড়ে। ফলে বাইরে থেকে একটি সম্পর্ককে যতটা সুখী ও নিখুঁত মনে হয়, বাস্তবে সেটি ততটা নাও হতে পারে। তাই হঠাৎ বিচ্ছেদের খবর এলে মনে প্রশ্ন জাগে, ‘এত ভালো সম্পর্কও ভেঙে গেল কেন?’ এই প্রশ্ন থেকেই শুরু হয় আরও জানার চেষ্টা।
অসম্পূর্ণ তথ্য কৌতূহল বাড়ায়
মানুষ যখন কোনো ঘটনার একটি অংশ জানে, কিন্তু পুরো ঘটনা জানে না, তখন স্বাভাবিকভাবেই বাকি তথ্য জানার আগ্রহ তৈরি হতে পারে। তারকার বিচ্ছেদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি দেখা যায়।
‘বিচ্ছেদ হয়েছে’ এই তথ্য জানা গেল, কিন্তু কারণ জানা গেল না। তখন পুরোনো সাক্ষাৎকার, ছবি, মন্তব্য কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের মধ্যে মানুষ সম্ভাব্য উত্তর খুঁজতে থাকে।
ফলে একটি খবর শুধু খবর হিসেবে থাকে না সেটি হয়ে ওঠে একটি ‘গল্প’, যার শেষটা জানার আগ্রহ তৈরি হয়।
অন্যের সম্পর্কের মধ্যে নিজের গল্প
তারকাদের সম্পর্কের খবর আমাদের নিজের জীবন নিয়েও ভাবাতে পারে। মানুষ স্বাভাবিকভাবেই নিজের জীবন ও সম্পর্ককে অন্যদের সঙ্গে তুলনা করে। তারকার জীবনে অর্থ, জনপ্রিয়তা, সৌন্দর্য ও সফলতা থাকার পরও যদি সম্পর্ক ভেঙে যায়, তখন কারও মনে প্রশ্ন আসতে পারে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য আসলে কী প্রয়োজন?
এখানে তারকার গল্পটি আর শুধু তারকার থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে ভালোবাসা, বিশ্বাস, প্রত্যাশা ও সম্পর্কের স্থায়িত্ব নিয়ে আমাদের নিজেদের ভাবনার অংশ।
২০২২ সালের একটি গবেষণা পর্যালোচনাতেও দেখা যায়, তারকা বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে এমন একতরফা মানসিক সম্পর্ক মানুষের কল্যাণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, আবার কিছু ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাবও তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ বিষয়টি একেবারে সাদা-কালো নয়।
তবে কৌতূহলেরও সীমা আছে
তারকার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আগ্রহ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই আগ্রহ যেন ব্যক্তিগত কষ্টকে বিনোদনে পরিণত না করে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ ক্যামেরার সামনে থাকা মানুষটি তারকা হলেও ব্যক্তিগত জীবনে তিনি একজন মানুষ। বিচ্ছেদ তার জন্যও হতে পারে গভীর মানসিক চাপ, কষ্ট কিংবা অনিশ্চয়তার অভিজ্ঞতা।
শেষ পর্যন্ত তাই তারকাদের ডিভোর্সের খবরে আমাদের এত আগ্রহের পেছনে শুধু গসিপ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানসিক পরিচিতি, কৌতূহল, সামাজিক তুলনা এবং সম্পর্ক নিয়ে নিজের ধারণা।
তাদের জীবন আমাদের থেকে অনেক আলাদা হতে পারে। কিন্তু ভালোবাসা, অভিমান, বিচ্ছেদ কিংবা হারানোর কষ্টের জায়গায় তারকারাও আমাদের মতোই মানুষ।
হয়তো এ কারণেই অন্যের সম্পর্ক ভাঙার গল্প দেখতে গিয়ে কখনো কখনো আমরা আসলে নিজের সম্পর্কের গল্পটাই নতুন করে দেখতে শুরু করি।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)






