প্রায় এক মাসের বেশি দেশে চলছে হামের সংক্রমণ। আক্রান্ত শিশুদের কষ্ট, রোগ যন্ত্রণায় ভুক্তভোগী হাজারো শিশুর পরিবার। ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে সারাদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে প্রায় বারো হাজার শিশু ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী হামের উপসর্গ নিয়ে প্রায় ১৬৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। চলতি মাসের ৫ এপ্রিল প্রথম পর্যায়ে এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ১২ এপ্রিল ঢাকা বরিশাল মায়মনসিংহসহ চারটি সিটি কপোরশেনে শুরু হয়েছে শিশুদের ‘হামের জরুরি টিকাদান’ কাজ। তবে হামের সংক্রমণে আক্রান্ত ও মৃত্যু থেমে নেই।
এ বাস্তবতায় হামের চিকিৎসকরা কী বলছেন? দেশব্যাপী সংক্রমণ কমতে কতদিন লাগবে ? সর্বপরি দু:খজনক হলেও সত্য যে হামজনিত উপসর্গ নিয়ে শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে সেই মৃত্যু কমবে বা থামবে কখন? হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর রাশ কমাতে সরকারের উদ্যোগে চলমান ‘হামের জরুরি টিকাদান’ শিশুদের হামের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা বা সুরক্ষা বলয় কিভাবে তৈরি হয়। সর্বপরি হামের জরুরি টিকার সুফল হিসেবে শিশুদের হামের সংক্রমণ কমে মৃত্যু কিভাবে কমাবে? উল্লেখিত জনস্বাস্থ্য বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামতের আলোকেই আজকের এক্সপ্লেনার| আসুন শুরু করি।

আমরা জানি, হাম মূলত ‘মিজেলস’ নামের এক অতি সংক্রামক ভাইরাস দিয়ে সংক্রমিত একটি রোগ। যা শিশুদের আক্রান্ত করে। মিজেলস ভাইরাসটি শ্বাসনালী দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা সাময়িকভাবে নষ্ট করে দেয়। এর ফলে হামে আক্রান্ত হলে শিশু এর বাইরেও নানা রকম ব্যাকটেরিয়া এবং অন্যান্য জীবাণু দ্বারা সহজে সংক্রমিত হয়। অতি সংক্রমণ প্রবণ ও শতভাগ ছোঁয়াছে এই রোগ ‘হাম’ কিভাবে শিশুদের জন্য প্রাণঘাতি হয়ে উঠে? এই প্রসঙ্গে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান সাবেক অধ্যাপক ডা. অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা বলেছেন, প্রথমত: হাম হলে প্রথম ৪ দিন: জর, নাক দিয়ে পানি পড়া, কাশি, লাল চোখ থাকবে। ৪র্থ দিন: মুখে লাল লাল র্যাশ চলে আসে। তারপর সেগুলো সামনের দুদিনের মধ্যে র্যাশগুলো ধীরে ধীরে কানের পিছনে, ঘাড়ে, গলায়, বুকে, পিঠে এবং সিরিয়ালি উরু, পায় চলে আসে। একটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে যে র্যাশ আসার সাথে সাথে জ্বরের মাত্রা অনেক বেড়ে যায়, এটাই হামের লক্ষনীয় উপসর্গ।
দ্বিতীয়ত: শরীরে আসা র্যাশগুলো জ্বর কমে যাবার সাথে চলে যায় না। বরং কয়েকদিন কাল, কাল দাগ হিসেবে থেকে যায়। কোন জটিলতা না হোলে, শিশুরা ধীরে ধীরে সুস্থতার দিকে ফিরে যায়। কিন্তু হাম আক্রান্ত সব শিশুই সুস্থ না হয়ে আরো অসুস্থতার দিকেও যেতে পারে। সময়মত চিকিৎসা না নিলে শিশুর অবস্থা জটিল থেকে জটিলতার দিকে যায়। এক্ষেত্রে এই শিশু বিশেষজ্ঞ হামের জটিলতায় কয়েকটি বিপদচিহ্ন সম্পর্কে অভিভাবকদের সতর্ক করেছেন যেমন: শিশুর শ্বাসকষ্ট, বারবার বমি। শিশুরা খিঁচুনি বা নিস্তেজ হয়ে পড়তে পারে। এসময় চোখের মণি ঘোলা হয়ে আসা বা মুখের ভেতর গভীর ঘা হতে পারে। এসব লক্ষণ দেখলে দেরি না করে হাসপাতালে নিতে পরামর্শ দিয়েছেন। এছাড়াও দীর্ঘ মেয়াদে পরবর্তীতেও শিশুরা নানান সমস্যায় ভুগতে পারে বলছেন তিনি|
শিশুদের হাম পরবর্তী কি কি জটিলতা হতে পারে?:
হামের জটিলতা হিসেবে পরবর্তী সময়ে প্রায়ই নিউমোনিয়া, মারাত্মক ডায়রিয়া হতে পারে। এ ছাড়া আক্রান্ত শিশুর শরীরে ভিটামিন এ-এর মজুত মারাত্মকভাবে কমে যায়। এর ফলে শিশুর চোখের পানি কমে যায় বা চোখ শুষ্ক হয়ে যায়। এ থেকে রাতকানা থেকে শুরু করে অন্ধত্ব পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে। এক্ষেত্রে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা বলছেন, যদি হামে আক্রান্ত কোনো শিশুর দৃষ্টিজনিত সমস্যা বা দেখতে অসুবিধা হয় কিংবা চোখের মণি ঘোলা লাগে, তাহলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী শিশুদের ভিটামিন ‘এ ক্যাপসুল’ দিতে পারেন প্রয়োজন বুঝে। এর বাইরে হামে আক্রান্ত অনেক শিশুর কানপাকা, মুখে ঘা, মারাত্মক অপুষ্টি, মস্তিষ্কের প্রদাহসহ আরও অনেক রকম জটিলতা দেখা দিতে পারে বলছেন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা।
অভিভাবকের করণীয়: এই প্রসেঙ্গে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা বলেছেন, কোনো শিশুর জ্বর এবং শরীরে র্যাশ দেখা দিলে তা হাম হোক বা না হোক, চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। শিশুর শরীরে র্যাশ দেখা দেওয়ার দিন থেকে অন্তত পাঁচ দিন অন্যদের কাছ থেকে আলাদা রাখতে হবে।
এ সময় আক্রান্ত শিশুর খাবার, পানীয় ও অন্যান্য স্বাভাবিক পরিচর্যা অব্যাহত রাখতে হবে। পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিকসহ তাকে পরপর দুই দিন দুটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ভিটামিন এ ক্যাপসুল বয়স অনুযায়ী সঠিক ডোজে খাওয়াতে হবে। কোনো শিশুর জ্বর এবং শরীরে র্যাশ দেখা দিলে তা হাম হোক বা না হোক, চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
টিকা নেওয়ার পরও হাম হচ্ছে কেন?
দুই ডোজ টিকা পাওয়ার পরও কেন আবার হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে? এর কারণ: গত দুই বছর মাঠ পর্যায়ে হামের টিকার সংকট ছিল। ফলে শিশুর নয় মাস বয়সে হামের প্রথম ডোজ এবং দ্বিতীয় ডোজ শিশুর ১৫ মাস বয়সে তা অনেক জায়গায় অনেক শিশুই এই ‘এমআর’ টিকা পায়নি। টিকা দেওয়ার জন্য তাকে টিকাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়াও হয়নি। কেউ কেউ মাত্র একটা টিকা নিয়েছে। শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান সাবেক অধ্যাপক ডা. অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা বলেছেন, টিকাবঞ্চিত শিশুর হামে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি যেমন বেশি। আর আক্রান্ত শিশুর অন্যদের সংক্রমিত করে। এভাবে শিশুদের মধ্যে হাম ছড়ানোর আশঙ্কা অনেক বেশি। আবার অনেক সময় টিকা পাওয়ার পর শিশুর শরীরে আশানুরূপ হাম প্রতিরোধক অ্যান্টিবডি তৈরি না হলেও সে পুনরায় ‘হামে’ আক্রান্ত হতে পারে। টিকা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জেলা পর্যায় পর্যন্ত ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়স পর্যন্ত ৯৫ ভাগ উদ্দিষ্ট শিশুকে হামের টিকা দেওয়া গেলে হামের বিরুদ্ধে হার্ড ইমিউনিটি দেখা দেবে। তখনই হামের সংক্রমণ কমবে। কমে আসবে হামের জটিলতা জনিত মৃত্যুও।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন গত ১২ এপ্রিল ঢাকায় টিকাদান কাজ উদ্বোধন করে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছিলেন, ইতোমধ্যে সংক্রমণ প্রবণ ৩০ উপজেলায় ‘হামের জরুরি টিকাদান’ চলছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে দেশের জনবহুল দুই সিটি কপোরশেন ঢাকার দুই সিটিসহ বরিশাল ও ময়মনসিংহ সিটি কপোরশেন অঞ্চলে ‘জরুরি হামের টিকা প্রদান শুরু হলো। ফলে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু কমাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন।
এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।







