কে এই স্টিফেন মিলার, ট্রাম্পের নতুন হোয়াইট হাউস চিফ অব স্টাফ?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী স্টিফেন মিলারকে হোয়াইট হাউসের নতুন চিফ অব স্টাফ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ২০১৬ সাল থেকে তিনি ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন। ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতির অন্যতম পরিকল্পনাকারী হিসেবেও পরিচিত তিনি।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এই তথ্য জানায়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দীর্ঘদিনের উপদেষ্টা স্টিফেন মিলারকে হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছেন।
শুক্রবার (৭ নভেম্বর) এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। চলতি সপ্তাহের শুরুতে মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বড় পরাজয়ের পর ট্রাম্পের বিতর্কিত নীতিগুলো আরও জোরালোভাবে চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে এ নিয়োগকে।
আগামী জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিতে যাচ্ছে ডেমোক্র্যাটরা। ধারণা করা হচ্ছে, হোয়াইট হাউসে স্টিফেন মিলারের ভূমিকা নিয়ে তদন্ত শুরু করতে পারে তারা।
৪১ বছর বয়সী মিলার ট্রাম্পের অন্যতম সরব সমর্থক। তার ব্যাপক অভিবাসী বহিষ্কার কর্মসূচির অন্যতম পরিকল্পনাকারী হিসেবেও পরিচিত তিনি।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প মিলারকে তার ‘সবচেয়ে বিশ্বস্ত উপদেষ্টাদের একজন’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, সোমবার থেকে সুসি ওয়াইলসের কাছ থেকে এ দায়িত্ব বুঝে নেবেন মিলার।
ট্রাম্পের রাজনীতিতে শুরু থেকেই সক্রিয়
ট্রাম্পের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার অনেক আগে থেকেই রক্ষণশীল রাজনীতিক হিসেবে পরিচিতি গড়ে তুলেছিলেন মিলার।
ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা মনিকা হাইস্কুলে পড়ার সময় স্থানীয় রেডিও অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে স্কুলের উদারপন্থী নীতির সমালোচনা করতেন তিনি।
ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ডিউক কনজারভেটিভ ইউনিয়নের নেতৃত্ব দেন মিলার। এ সময় ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন ল্যাক্রস খেলোয়াড়ের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন।
পড়াশোনা শেষে ওয়াশিংটন ডিসিতে গিয়ে রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্যদের সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরে রিপাবলিকান সিনেটর জেফ সেশন্সের সঙ্গেও কাজ করেন তিনি।
২০১৬ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্পের প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারে যোগ দেন মিলার। ট্রাম্পের বক্তব্য এবং রাজনৈতিক প্রচারের ভাষা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।
২০১৭ সালে ট্রাম্পের সাবেক উপদেষ্টা স্টিভ ব্যানন বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেছিলেন, শুরু থেকেই ট্রাম্পের সঙ্গে মিলারের ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ট্রাম্পকে নিজের রাজনৈতিক বক্তব্যের ধরন খুঁজে পেতে সহায়তা করেছিলেন মিলার।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে কী ভূমিকা ছিল মিলারের?
২০১৬ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের জয়ের পর প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা ও বক্তব্য লেখক হিসেবে দায়িত্ব পান মিলার।
অভিবাসন বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর সিদ্ধান্তগুলো তৈরিতে তার বড় ভূমিকা ছিল। এসব সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে তিনি প্রায়ই পশ্চিমা ‘সভ্যতা’ রক্ষার বিষয়টি সামনে আনতেন।
সে সময় ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা অভিযোগ করেন, মিলার শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী বক্তব্যকে উৎসাহিত করছেন।
২০১৯ সালে সাউদার্ন পোভার্টি ল সেন্টার কিছু ইমেইল প্রকাশ করে। তাদের দাবি, এসব ইমেইলে মিলারকে শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী ওয়েবসাইট ও মতাদর্শের প্রতি সমর্থন জানাতে দেখা যায়। এর পর ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা হোয়াইট হাউস থেকে তাকে সরানোর দাবি আরও জোরালো করেন।
২০২০ সালে কংগ্রেস সদস্য হোয়াকিন কাস্ত্রো এক বিবৃতিতে বলেন, পরিচিত শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী ও শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী মতাদর্শে বিশ্বাসী কাউকে ফেডারেল নীতিনির্ধারণে প্রভাব রাখার মতো পদে রাখা গ্রহণযোগ্য নয়।
২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তে বিচার বিভাগের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি তৈরিতেও মিলারের ভূমিকা ছিল। এ নীতির আওতায় বৈধ কাগজপত্র ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করা প্রায় সব প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এর ফলে অনেক পরিবারকে আলাদা করে ফেলা হয়। অপরাধীদের আটক রাখার কেন্দ্রে শিশুদের তাদের বাবা-মায়ের সঙ্গে রাখার সুযোগ ছিল না। ব্যাপক সমালোচনার মুখে পরে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে এ নীতি পরিবর্তন করেন ট্রাম্প।
ট্রাম্পের উপদেষ্টা থাকাকালে শিশু অবস্থায় কাগজপত্র ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে আসা অভিবাসীদের জন্য চালু করা ডেফার্ড অ্যাকশন ফর চাইল্ডহুড অ্যারাইভালস (ডাকা বা ডিএসিএ) কর্মসূচি বন্ধের পক্ষেও প্রচার চালান মিলার। এ কর্মসূচির মাধ্যমে এসব ব্যক্তি পড়াশোনা ও কাজের জন্য বৈধ কাগজপত্র পাওয়ার সুযোগ পেতেন। ২০২১ সালে কর্মসূচিটিতে নতুন আবেদন গ্রহণ বন্ধ হয়ে যায়।
এ ছাড়া ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের জন্য ভিসা সীমিত করার উদ্যোগেও ভূমিকা রাখেন মিলার। এর মধ্যে ২০১৭ সালে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কয়েকটি দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা ছিল। এটি ‘মুসলিম ট্রাভেল ব্যান’ নামে পরিচিতি পায়।
প্রথম আদেশে সিরিয়া, ইরান, ইরাক, লিবিয়া, সোমালিয়া, সুদান ও ইয়েমেনের নাগরিকদের ৯০ দিনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়। পরে পরিবর্তিত এ নীতির পক্ষে রায় দেন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট।
২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন চুরি করা হয়েছে বলে ট্রাম্প যে ভিত্তিহীন দাবি করেছিলেন, তারও জোরালো সমর্থক ছিলেন মিলার। ট্রাম্পকে নির্বাচনে বিজয়ী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার একটি উদ্যোগেও সমর্থন দেন তিনি।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে মিলারের ভূমিকা
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ট্রাম্প যখন আবার রাজনীতিতে সক্রিয় হন, তখনো তার পাশে ছিলেন মিলার।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় ফেরার পর নীতিবিষয়ক উপপ্রধান ও জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্ব পান তিনি।
এরপর থেকে ট্রাম্পের ব্যাপক অভিবাসী বহিষ্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন মিলার। এ কর্মসূচির আওতায় দেশজুড়ে বিভিন্ন এলাকায় অভিবাসন কর্মকর্তাদের অভিযান বেড়েছে। এসব অভিযানে কোনো অপরাধে জড়িত নন কিংবা সামান্য অপরাধের রেকর্ড রয়েছে, এমন ব্যক্তিরাও লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন।
২০২৫ সালের মে মাসে ফক্স নিউজকে মিলার বলেন, প্রতিদিন অন্তত ৩ হাজার অভিবাসীকে গ্রেপ্তারের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে প্রশাসন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রতিদিন এ সংখ্যা আরও বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাবেন।
অভিবাসন কর্মকর্তাদের ক্রমবর্ধমান কঠোর অভিযানও প্রকাশ্যে সমর্থন করেছেন তিনি। মিনিয়াপোলিসে জানুয়ারিতে রেনে গুড ও অ্যালেক্স প্রেটি হত্যার ঘটনায় প্রথমে তিনি তাদের দুজনকেই ‘সন্ত্রাসী’ বলে উল্লেখ করেন। পরে প্রেটির বিষয়ে নিজের বক্তব্য থেকে সরে আসেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের বহিষ্কার কর্মসূচির অংশ হিসেবে ফিলিস্তিনিদের অধিকার সমর্থন এবং গাজা ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করা ভিসাধারী ও স্থায়ী বাসিন্দাদেরও যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনের দাবি, এ ধরনের মতামত যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির জন্য ক্ষতিকর। এ অবস্থান তৈরিতে মিলারের ভূমিকা নিয়েও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রশ্ন উঠেছে।
জুলাই মাসে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী মাহমুদ খলিল ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করেন। তাদের মধ্যে মিলারও রয়েছেন। মামলায় অভিযোগ করা হয়, খলিল ও অন্যান্য অমার্কিন ফিলিস্তিনিকে লক্ষ্যবস্তু করতে একটি পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভে ভূমিকার কারণে এখনো ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে বহিষ্কার প্রক্রিয়ার মুখোমুখি রয়েছেন খলিল।
এর আগেও ফিলিস্তিনপন্থী ব্যক্তিদের সমালোচনা করেছেন মিলার। তাদের মধ্যে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস সদস্য রাশিদা তালাইব। তিনি কংগ্রেসে নির্বাচিত প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান নারী হিসেবে পরিচিত।
২০২৩ সালে ফক্স নিউজকে মিলার বলেন, রাশিদা তালাইবকে কংগ্রেস থেকে বহিষ্কার করা উচিত। এ সময় তিনি তালাইবসহ কয়েকজন ডেমোক্র্যাট নেতাকে ‘গভীরভাবে ইহুদিবিদ্বেষী ও যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী’ বলেও মন্তব্য করেন।
হোয়াইট হাউসে ফিরে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অধিকার বাতিলের উদ্যোগও নিয়েছিলেন মিলার। তবে সে চেষ্টা সফল হয়নি। একই সঙ্গে পশ্চিম গোলার্ধে ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে ক্রমেই সরব হয়ে ওঠেন তিনি।
ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে সমর্থন করেন মিলার। জানুয়ারিতে সিএনএনকে তিনি বলেন, সামরিক শক্তির ভিত্তিতে গ্রিনল্যান্ড দখল করার অধিকার যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন নিয়ে যত কথাই বলা হোক না কেন, বাস্তব বিশ্ব শক্তি, বলপ্রয়োগ ও ক্ষমতার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। তার ভাষায়, পৃথিবীর শুরু থেকেই এসবই বিশ্ব পরিচালনার কঠিন নিয়ম।
হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফের দায়িত্ব কী?
নতুন দায়িত্ব পাওয়ার পর ট্রাম্পের ওপর মিলারের প্রভাব কীভাবে পরিবর্তিত হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সাধারণত হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফের দায়িত্ব হলো কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজ তদারকি করা, নিয়োগের বিষয় দেখা, প্রেসিডেন্টের দৈনন্দিন কর্মসূচি পরিচালনা করা এবং নীতিনির্ধারণে তাকে পরামর্শ দেওয়া।
প্রেসিডেন্টের কাছে কোন তথ্য পৌঁছাবে, তা নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও এ পদের অধীনে থাকে। এ কারণে হোয়াইট হাউসের ভেতরে চিফ অব স্টাফকে অনেক সময় প্রেসিডেন্টের ‘দ্বাররক্ষক’ বলা হয়।





