পাকিস্তানের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে তোষাখানা দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে তিন বছরের কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছেন ইসলামাবাদের একটি আদালত। ইমরান খান প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন সময় ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের উপহার সামগ্রী কেনাকাটায় দুর্নীতি করেছেন বলে অভিযোগ আনা হয়েছিল।
এর আগেও এই একই মামলায় ইসলামাবাদ পুলিশ পিটিআই প্রধানকে লাহোরের জামান পার্ক এলাকায় তার বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করতে গিয়েছিল। কিন্তু ওই সময় তার বাড়ির বাইরে জড়ো হওয়া তার সমর্থকদের প্রতিরোধের মুখে পড়ে পিছু হাটে পুলিশ।
তোষাখানা কী?
১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় তোষাখানা। তোষাখানা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণাধীন একটি বিভাগ। এখানে বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্র প্রধান এবং বিদেশি বিশিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া মূল্যবান উপহার সংরক্ষণ করা হয়।
এটিতে বুলেটপ্রুফ গাড়ি, দামি পেইন্টিং থেকে শুরু করে ঘড়ি, অলঙ্কার, পাটি এবং তলোয়ারসহ নানান মূল্যবান জিনিস রয়েছে।
কী এই তোষাখানা মামলা?
তোষাখানার নিয়ম অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, আইনপ্রণেতা বা সরকারের পদস্থ কর্মকর্তারা যেসকল উপহার পাবে তা অবশ্যই এই বিভাগে জমা দিতে হবে। যারা এসব উপহার পেয়েছেন তারা অবশ্য পরে এগুলো কিনে নিতে পারবেন।
ইমরান খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পাওয়া উপহারগুলো খুবই কম মূল্যে কিনেছেন এবং লাভের জন্য তা খোলা বাজারে বিক্রি করেছেন যার মুল্য ১৪ কোটি রুপির বেশি। সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, উপহারের মধ্যে সাতটি হাত ঘড়ি, দামি একটি “মাস্টার গ্রাফ লিমিটেড সংস্করণ” ছিল যার মূল্য সাড়ে ৮ কোটি পাকিস্তানি রুপি।
২০২২ সালের ২১ অক্টোবর পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশন সাবেক প্রধানমন্ত্রী উপহার সম্পর্কে ‘মিথ্যা বিবৃতি এবং ভুল ঘোষণা’ দেওয়ায় সংবিধানের ৬৩(১)(পি) অনুচ্ছেদের অধীনে তাকে অযোগ্য ঘোষণা করেছিলেন এবং দায়রা আদালতে ইমরান খানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।
পরে ট্রায়াল কোর্ট গত ১০ মে পিটিআই চেয়ারম্যানকে অভিযুক্ত করে এবং মামলাটির গ্রহণযোগ্যতা বাতিল চেয়ে করা ইমরান খানের আবেদন খারিজ করে দেয়। ৪ জুলাই ইসলামাবাদের হাইকোর্ট, ট্রায়াল কোর্টের রায় বাতিল করতে এবং আবেদনকারীকে পুনরায় শুনানি ও সাত দিনের মধ্যে এই মামলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার নির্দেশ দেয়। ৮ জুলাই এডিএসজে হুমায়ুন দিলাওয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে তোষাখানা মামলার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। পরে ইমরান খানের আইনজীবীরা এই মামলার কার্যক্রমের বিরুদ্ধে আবারো ইসলামাবাদ হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ করেন।
বিচারের প্রক্রিয়া চলাকালীন, খানের আইনজীবীরা তার ফেসবুক পোস্টের ভিত্তিতে বিচারকের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগও এনেছিলেন এবং মামলাটি স্থানান্তর চেয়েছিলেন।
২ আগস্ট ট্রায়াল কোর্ট পিটিআই চেয়ারম্যানের দেওয়া মামলার সাক্ষীদের তালিকা প্রত্যাখ্যান করে জানায়, ইমরান খান তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যক্রমে সাক্ষীদের ‘প্রাসঙ্গিকতা’ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। পরে ইমরানের আইনজীবীরা ট্রায়াল কোর্টের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতেও চ্যালেঞ্জ করে।
গত ৪ আগস্ট হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি আমের ফারুক নির্বাচন কমিশনের অভিযোগ দাখিল করার ক্ষেত্রে এখতিয়ার ও পদ্ধতিগত কোনো ত্রুটি আছে কিনা তা পুনঃপরীক্ষা করার নির্দেশ দিয়ে বিষয়টিকে ট্রায়াল কোর্টে ফেরত পাঠান।
পরে আজ শনিবার বিচারক হুমায়ুন দিলাওয়ার যখন এই মামলার শুনানি পুনরায় শুরু করেন, তখন পিটিআই চেয়ারম্যানের কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না। এরপর আদালত একাধিকবার শুনানি মুলতবি করে এবং ইমরানের আইনজীবী দলের কেউ হাজির না হওয়ায় রায় সংরক্ষণ করেন। পরে বিচারক রায় ঘোষণা করে বলেন, পিটিআই প্রধানকে দুর্নীতির জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে এবং তাকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।








