হুমায়ুন আজাদ: অন্ধকার যুগের প্রগতির প্রদীপ

বিংশ শতাব্দীর শেষভাগের বাংলা সাহিত্যে যে কজন মনীষী তাদের মেধা, মনন, দ্রোহ ও প্রখর যুক্তিবাদী চিন্তার দ্বারা সমাজ ও সাহিত্যকে আলোড়িত করেছেন, ড. হুমায়ুন আজাদ তাদের মধ্যে প্রধানতম। তিনি একাধারে ছিলেন প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, কবি, ভাষাবিজ্ঞানী ও নির্ভীক সমালোচক। প্রথাগত সমাজ ও রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে তার অবস্থান বাংলা সাহিত্যকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এই প্রবন্ধে বাংলা কবিতায় রোমান্টিকতার বিকল্প অন্বেষণ, উপন্যাসে সমাজবাস্তবতা ও আধুনিক মানস, এবং মননশীল প্রবন্ধে তার মুক্তবুদ্ধির চর্চা ও ভাষা-সচেতনতা নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হয়েছে।
হুমায়ুন আজাদ (১৯৪৭-২০০৪) ছিলেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম উজ্জ্বল ও প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। তিনি এমন এক সময়ে সাহিত্যচর্চা শুরু করেছিলেন যখন সমাজ ও রাষ্ট্রে পরিবর্তনের হাওয়া বইছে, কিন্তু মধ্যবিত্তের ভণ্ডামি এবং রক্ষণশীলতা সমাজকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছিল। হুমায়ুন আজাদ তার লেখনীর মাধ্যমে এই রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে সরাসরি আঘাত হেনেছেন। তার রচনায় পাওয়া যায় বিজ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত এক আধুনিক মনন, যা সংস্কারমুক্ত সমাজ এবং স্বাধীন মুক্ত পক্ষে দৃঢ়ভাবে অবস্থান করে।
স্বাধীন বাংলাদেশের সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসে ড. হুমায়ুন আজাদ এক অপ্রতিরোধ্য ও অগ্নিঝরা নাম। তিনি কেবল একজন প্রাবন্ধিক, কবি বা ঔপন্যাসিক ছিলেন না; তিনি ছিলেন এমন এক মুক্তবুদ্ধির আলোকবর্তিকা, যিনি স্বাধীন দেশের মধ্যবিত্তের ভণ্ডামি, রাজনৈতিক হীনতা, মৌলবাদ এবং কূপমণ্ডূকতার বিরুদ্ধে জীবনের শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়াই করে গেছেন। নিজের লেখার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, প্রকৃত লেখকের কাজ শুধু প্রশংসা কুড়ানো নয়, বরং সমাজের অসঙ্গতিগুলোকে নগ্ন করে সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করানো। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বুদ্ধিবৃত্তিক সাহসের অনন্য প্রতীক হিসেবে হুমায়ুন আজাদ তাই অবিসংবাদিতভাবে সর্বকালের সবচেয়ে সাহসী লেখক।
একটি স্বাধীন দেশের অভ্যুদয় ঘটে একটি জাতির মুক্তির স্বপ্ন এবং মুক্তচিন্তার আকুতি নিয়ে। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে যখন সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতা, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন এবং ধর্মীয় মৌলবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করে, তখন তার বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ গড়ার কাজটি সহজ ছিল না। এই কঠিন কাজটি যিনি আজীবন একাই কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন, তিনি ড. হুমায়ুন আজাদ। তিনি বিশ্বাস করতেন, লেখক মাত্রই বিদ্রোহী; লেখকের কাজ প্রচলিত মিথ্যেগুলোকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া। তার এই আপসহীন মনোভাব তাকে স্বাধীন বাংলাদেশের সবচেয়ে সাহসী কলমযোদ্ধায় পরিণত করেছিল।
হুমায়ুন আজাদ ছিলেন একনিষ্ঠ বিজ্ঞানমনস্ক ও যুক্তিবাদী মানুষ। তিনি মনে করতেন, কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস একটি জাতিকে পঙ্গু করে দেয়। তার প্রবন্ধগুলো পড়লে স্পষ্ট বোঝা যায়, তিনি সমাজের প্রচলিত সব ধরনের গোঁড়ামি এবং অন্ধ আনুগত্যের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছিলেন। তৎকালীন সমাজে যখন ধর্ম এবং সংস্কৃতির নামে কূপমণ্ডূকতা জেঁকে বসছিল, তখন হুমায়ুন আজাদ অত্যন্ত শাণিত যুক্তিতে সেগুলোর অসারতা প্রমাণ করেছেন। সমাজ ও রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা ভণ্ডামিকে তিনি তার প্রাবন্ধিক সত্তা দিয়ে আক্রমণ করেছিলেন, যার জন্য তাকে চড়া মূল্যও দিতে হয়েছে।
হুমায়ূন আজাদ এর ‘নারী’ কোনো গতানুগতিক আবেগপ্রবণ নারীবাদী রচনা নয়; এটি ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান ও মনস্তত্ত্বের আলোকে রচিত এক বৈজ্ঞানিক ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। হুমায়ুন আজাদ এই গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, নারী কোনো জন্মগত বা জৈবিক কারণে পুরুষের পরাধীন নয়; বরং পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র কৃত্রিমভাবে নারীকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করেছে। তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক অনুশাসনের মুখোমুখি হয়েছেন, যেগুলোর মাধ্যমে যুগ যুগ ধরে নারীকে পর্দার আড়ালে বা গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন যে, নারীর মুক্তি কেবল আইনি অধিকারে নয়, বরং নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, মানসিক মুক্তি এবং পিতৃতান্ত্রিক ধ্যানধারণার সম্পূর্ণ বিনাশের ওপর নির্ভরশীল। ১৯৯২ সালে বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর সমাজে এবং সাহিত্যের অঙ্গনে এক তীব্র ভূকম্পন সৃষ্টি হয়েছিল। রক্ষণশীল সমাজ ও মৌলবাদী গোষ্ঠী বইটির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানালেও, মুক্তমনা লেখক, গবেষক এবং নতুন প্রজন্মের নারীদের মধ্যে এটি এক বিশাল বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ তৈরি করে। ‘নারী’ প্রকাশের পূর্বে বাংলা নারীবাদী লেখায় কিছুটা রাখঢাক বা নমনীয় ভাব লক্ষ করা যেত। কিন্তু হুমায়ুন আজাদ নারীবাদকে এমন এক ইস্পাতকঠিন ভাষা ও যুক্তি দিয়েছেন, যা পরবর্তীতে অনেক নারী লেখককে প্রচলিত অন্যায়ের বিরুদ্ধে সরাসরি কলম ধরতে উদ্বুদ্ধ করেছে। বাংলা নারীবাদী সাহিত্যকে কেবল আবেগের কান্নাকাটি বা অধিকারের সাধারণ দাবির স্তর থেকে বের করে এনে বিশ্বমানের নারীবাদী দর্শনের (যেমন সিমোন দ্য বোভোয়ারের ‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’-এর আদলে) সাথে যুক্ত করার ক্ষেত্রে এই গ্রন্থটি সেতু হিসেবে কাজ করেছে। এই বইটি পড়ার পর বাঙালি নারীসমাজ তাদের আত্মপরিচয় ও অধিকার নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করে। পারিবারিক ও সামাজিক ভণ্ডামির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার ভাষা খুঁজে পায় নবীন প্রজন্ম। হুমায়ুন আজাদের এই গ্রন্থ প্রকাশের পর তাকে তীব্র সামাজিক ও রাজনৈতিক সঙ্কটের মুখে পড়তে হয়। বইটি নিষিদ্ধ করার দাবি ওঠে এবং তাকে মৌলবাদী গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে নানা ধরনের হুমকি দেওয়া হয়। ২০০৪ সালে তার ওপর যে নৃশংস হামলা হয়, তার অন্যতম প্রধান মনস্তাত্ত্বিক কারণ ছিল এই ‘নারী’ গ্রন্থটির মধ্য দিয়ে সমাজব্যবস্থার ভিত্তিমূলে তার করা তীব্র আঘাত। কিন্তু সমস্ত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বইটি বাংলাভাষী পাঠকের বুদ্ধিবৃত্তিক মননকে চিরতরে বদলে দেয়।
বাংলাদেশে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের চর্চাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে হুমায়ুন আজাদের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপনাকালে তিনি ভাষাবিজ্ঞানকে কেবল মুখস্থবিদ্যার বিষয় না রেখে বিশ্বমানের আধুনিক বিজ্ঞান হিসেবে শিক্ষার্থীদের সামনে হাজির করেন। তাঁর পূর্বে বাংলা ভাষাবিজ্ঞান চর্চায় কিছুটা সনাতন ধারা বজায় থাকলেও, তিনি আধুনিক ভাষাতাত্ত্বিক তত্ত্ব, বিশেষ করে চমস্কি’র রূপান্তরকমূলক সৃষ্টিশীল ব্যাকরণ-এর আলোয়ে বাংলা ভাষাকে বিশ্লেষণ করার পথপ্রদর্শক ছিলেন।
হুমায়ুন আজাদের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষাতাত্ত্বিক কীর্তি হলো তার পিএইচডি অভিসন্দর্ভ (বাংলা ভাষায় সর্বনামীকরণ)। তিনি স্কটল্যান্ডের এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৬ সালে এই অভিসন্দর্ভের জন্য পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। এই গবেষণায় তিনি বাংলা ভাষার সর্বনাম পদের গঠন, রূপান্তর এবং এর বাকতাত্ত্বিক ব্যবহার অত্যন্ত নিখুঁত ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করেছেন। এটি আন্তর্জাতিক ভাষাবিজ্ঞানের মানদণ্ডে বাংলা ভাষার ওপর প্রথম সারির শক্তিশালী মৌলিক গবেষণা হিসেবে স্বীকৃত।
হুমায়ুন আজাদের একক সম্পাদনায় এবং মৌলিক লেখনীতে প্রকাশিত ‘বাংলা ভাষা’ (দুই খণ্ড) গ্রন্থটি বাংলা ভাষা গবেষণার ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক সংযোজন। এই গ্রন্থে বাংলা ভাষার ধ্বনিতত্ত্ব, রূপতত্ত্ব, বাক্যতত্ত্ব, এবং ভাষার ঐতিহাসিক বিবর্তনকে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বাংলা ভাষার গঠনপ্রকৃতি বুঝতে গবেষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য এই গ্রন্থটি আজীবন একটি অবশ্যপাঠ্য নির্দেশিকা।
প্রথাগত বাংলা ব্যাকরণ ছিল মূলত সংস্কৃত ব্যাকরণের অন্ধ অনুকরণ। সংস্কৃতের নিয়মে বাংলা ভাষা ও ব্যাকরণকে ব্যাখ্যা করার ফলে বাংলা ভাষার নিজস্ব স্বভাব ও সৌন্দর্য অনেক সময় ঢাকা পড়ে যেত। হুমায়ুন আজাদ এই ঔপনিবেশিক ও সনাতন ব্যাকরণ কাঠামোর বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নেন। তিনি জোর দিয়ে বলতেন যে, বাংলা একটি স্বতন্ত্র ভাষা এবং এর নিজস্ব ব্যাকরণিক নিয়ম রয়েছে। সংস্কৃতের মাপকাঠিতে বাংলাকে পরিমাপ করা ভুল। তিনি ব্যাকরণকে জটিল ও মুখস্থনির্ভর বিষয় থেকে বের করে এনে বোধগম্য ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর পক্ষে কলম ধরেছিলেন। ব্যাকরণ বইয়ে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে বাংলা শব্দের রূপান্তর এবং বাক্যের গঠনপ্রক্রিয়া সংস্কৃত থেকে আলাদা এবং নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে ভাস্বর।
হুমায়ুন আজাদ কেবল গবেষণাগারেই ভাষাবিজ্ঞান সীমাবদ্ধ রাখেননি, তিনি তার প্রাবন্ধিক ও সৃজনশীল রচনায় বাংলা ভাষার সঠিক ব্যবহার ও প্রমিত রূপ নিয়ে সচেতনতা তৈরি করেছেন। তিনি ভাষা বিকৃতির তীব্র প্রতিবাদ করতেন এবং ভাষার শুদ্ধতা রক্ষায় আপসহীন ছিলেন। বাংলা ভাষার শক্তি, এর নিজস্ব ধ্বনিভাণ্ডার এবং শব্দগঠনের ক্ষমতাকে তিনি তার লেখনিতে বারবার সার্থকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। বাংলা ভাষার জন্ম, গঠন, বিকাশ এবং এর অন্তর্দৃষ্টি উদঘাটনে ড. হুমায়ুন আজাদ যে অবিনশ্বর অবদান রেখে গেছেন, তা বাংলা ভাষাবিজ্ঞানকে বিশ্বমঞ্চে মর্যাদাপূর্ণ স্থানে অধিষ্ঠিত করেছে। প্রথাগত ব্যাকরণের জীর্ণ প্রাচীর ভেঙে তিনি বাংলাকে উপহার দিয়েছেন আধুনিক বিজ্ঞানের আলোয় গড়া এক নতুন ব্যাকরণিক দিগন্ত।
হুমায়ুন আজাদ শুধু সমাজ বা ধর্মীয় গোঁড়ামির সমালোচক ছিলেন না; তিনি রাষ্ট্রক্ষমতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ভণ্ডামির বিরুদ্ধেও ছিলেন সমানভাবে সোচ্চার। তার ‘রাজনীতিবিদগণ’ কিংবা অন্যান্য রাজনৈতিক নিবন্ধগুলোতে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, দুর্নীতি এবং সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণার চিত্র নির্মম সত্যতায় উন্মোচিত হয়েছে। তিনি ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে যাওয়া বুদ্ধিজীবী ও চাটুকারদের তীব্র ভাষায় ধিক্কার জানিয়েছেন। তার এই নির্ভীক সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি তাকে ক্ষমতাধরদের চোখের কাঁটায় পরিণত করেছিল। যার ফলোশ্রুতিতে তাকে প্রাপ্য সম্মান ও মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে রাষ্ট্রীয় মদদে।
ষাটের দশকের শেষভাগ ও সত্তরের দশকে যখন বাংলা কবিতায় প্রেম, প্রকৃতি ও বিষাদের গতানুগতিক রোমান্টিক ধারা বেশ প্রভাবশালী ছিল, হুমায়ুন আজাদ সেখান থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে আসেন। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অলৌকিক ইস্টিমার’ (১৯৭৩) প্রকাশের মাধ্যমেই তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে তার কবিতা প্রথাগত প্রেমের ফুলঝুরি নয়, বরং বাস্তবতার কঠিন এক ক্যানভাস। তিনি প্রেমকে মায়াবী বা অলৌকিক কোনো বিষয় হিসেবে না দেখে একে দেখেছেন বাস্তবতার আলোকে, যেখানে সংশয়, অতৃপ্তি এবং আধুনিক মানুষের বিচ্ছিন্নতাবোধ প্রবলভাবে উপস্থিত।
আধুনিক কবিতার অন্যতম প্রধান লক্ষণ হলো নগরজীবনের যান্ত্রিকতা ও মানুষের নিঃসঙ্গতা ফুটিয়ে তোলা। হুমায়ুন আজাদের কবিতায় ঢাকা শহরের রিকশার ঘণ্টা, কোলাহল, পিচঢালা পথ, কংক্রিটের দেয়াল এবং নাগরিক জীবনের ক্লান্তি গভীরভাবে জায়গা করে নিয়েছে। মানুষ কীভাবে আধুনিক সভ্যতার চাপে একাকী ও যন্ত্রে পরিণত হচ্ছে, তার কবিতায় তার এক নির্মম ও শৈল্পিক রূপায়ণ দেখা যায়। নাগরিক জীবনের এই বন্দিদশা তার কাব্যে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক রূপ লাভ করেছে। হুমায়ুন আজাদের কবিমানসের একটি অন্যতম চালিকাশক্তি ছিল গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক দ্রোহ। রাষ্ট্রযন্ত্রের অন্যায়, বৈষম্য, মৌলবাদ এবং মধ্যবিত্তের ভণ্ডামির বিরুদ্ধে তাঁর কলম ছিল অত্যন্ত শাণিত।
হুমায়ুন আজাদের কাব্যভাষায় কোনো অতিরিক্ত অলংকার বা কৃত্রিম আলংকারিক পদের আধিক্য নেই। তার ভাষা অত্যন্ত নির্মেদ, পরিমিত ও তীক্ষ্ণ। তিনি ভাষার ভেতর দিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক আঘাত হানতে ভালোবাসতেন। তার কবিতায় প্রায়ই শ্লেষ বা ব্যঙ্গ ব্যবহৃত হয়েছে, যা সমাজের অসঙ্গতিগুলোকে নগ্ন করে তোলে। শব্দচয়নের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সচেতন; অপ্রয়োজনীয় শব্দ বাদ দিয়ে তিনি কবিতাকে করে তুলেছেন ইস্পাতকঠিন ও ধারালো। একজন ভাষাবিজ্ঞানী ও মুক্তবুদ্ধির প্রবক্তা হিসেবে হুমায়ুন আজাদের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি তার কবিতায় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। অন্ধ বিশ্বাস, কূপমণ্ডূকতা এবং অবৈজ্ঞানিক সংস্কৃতির প্রতি তার কবিতায় ছিল তীব্র বিদ্রূপ। তার কবিতায় সহজ অন্ধ আনুগত্যের বদলে রয়েছে সংশয়বাদ যা একজন আধুনিক মানুষের মননের মূল ভিত্তি। মহাবিশ্বের অপার রহস্য এবং মানুষের নশ্বরতার দ্বন্দ্ব তার অনেক কবিতাতেই সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।
সাহসী লেখার পরিণতি যে কতটা নির্মম হতে পারে, তার সবচেয়ে ট্র্যাজিক উদাহরণ ড. হুমায়ুন আজাদ। ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি একুশে গ্রন্থমেলা থেকে বের হওয়ার পথে মৌলবাদী শক্তির নৃশংস হামলার শিকার হন তিনি। এই আক্রমণ তার জীবন কেড়ে নেওয়ার কাছাকাছি চলে গিয়েছিল এবং পরবর্তীতে জার্মানিতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার অকাল প্রয়াণ ঘটে। কিন্তু মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তার কণ্ঠকে রোধ করা যায়নি। তার রক্তে ভেজা কলম আজ কোটি মুক্তমনা মানুষের প্রেরণার উৎস। ড. হুমায়ুন আজাদ ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের বিবেকের প্রতীক। ভয়ভীতি, লোভ বা অন্ধ আনুগত্য তাকে কখনো সত্যের পথ থেকে সরাতে পারেনি। তিনি একা লড়ে গেছেন একটি অন্ধকারগ্রস্ত সমাজের বিরুদ্ধে। বাংলা সাহিত্য ও মুক্তচিন্তার ইতিহাসে হুমায়ুন আজাদ চিরকাল বেঁচে থাকবেন সেই নির্ভীক ও সাহসী মানুষ হিসেবে, যিনি অন্ধকার যুগে বুক চিতিয়ে জ্বালিয়েছিলেন প্রগতির প্রদীপ।
ড. হুমায়ুন আজাদ কেবল একজন লেখক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি প্রথার প্রতিষ্ঠানের মতো, যিনি আজীবন লড়ে গেছেন অন্ধবিশ্বাস, মৌলবাদ এবং কূপমণ্ডূকতার বিরুদ্ধে। তার ভাষা ছিল শাণিত, যুক্তি ছিল অকাট্য এবং সাহিত্য ছিল মানুষের মুক্তি ও প্রগতির পক্ষে নিবেদিত। বাংলা ভাষার জন্ম, গঠন, বিকাশ এবং এর অন্তর্দৃষ্টি উদঘাটনে ড. হুমায়ুন আজাদ যে অবিনশ্বর অবদান রেখে গেছেন, তা বাংলা ভাষাবিজ্ঞানকে বিশ্বমঞ্চে মর্যাদাপূর্ণ স্থানে অধিষ্ঠিত করেছে। প্রথাগত ব্যাকরণের জীর্ণ প্রাচীর ভেঙে তিনি বাংলাকে উপহার দিয়েছেন আধুনিক বিজ্ঞানের আলোয় গড়া এক নতুন ব্যাকরণিক দিগন্ত। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে হুমায়ুন আজাদ এমন এক চিরকালীন প্রদীপের নাম, যা আমাদের মুক্তচিন্তার পথে চালিত করতে যুগ যুগ ধরে প্রেরণা জোগাবে।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)





