ট্রাম্পের বিজয় তোরণ নির্মাণে স্থগিতাদেশ মার্কিন আদালতের

ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিকল্পিত বিশাল বিজয় তোরণ নির্মাণে সাময়িক স্থগিতাদেশ দিয়েছে দেশটির একটি ফেডারেল আদালত।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) জাতীয় রাজধানী পরিকল্পনা কমিশনের (এনসিপিসি) অনুমোদনের পরদিনই এ নির্দেশ দেন আদালত। ফলে তোরণটির নির্মাণকাজ শুরুর আগে আরও ১৪ দিন অপেক্ষা করতে হবে।
মার্কিন জেলা আদালতের বিচারক তানিয়া চুটকান এ আদেশ দেন। ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছিল, চলতি সপ্তাহেই নির্মাণকাজ শুরু হতে পারে।
সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
এর আগে বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) এনসিপিসির বৈঠকে ৮-৪ ভোটে ২৫০ ফুট (প্রায় ৭২ মিটার) উচ্চতার তোরণ নির্মাণের পরিকল্পনা অনুমোদিত হয়। কমিশনের ট্রাম্প-মনোনীত সদস্যরা এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস ও সামরিক বাহিনীর সাবেক সদস্যদের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা জানানোর স্মারক হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে বিরোধীদের আশঙ্কা, এটি আর্লিংটন জাতীয় সমাধিক্ষেত্রের দৃশ্য আড়াল করবে। সেখানে সমাহিত রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের হাজারো সেনা ও সামরিক সদস্য।
প্যারিসের বিখ্যাত আর্ক দ্য ত্রিয়ম্ফের নামের আদলে প্রস্তাবিত স্থাপনাটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘আর্ক দ্য ট্রাম্প’। যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী স্মরণে রাজধানীকে নিজের পছন্দের আদলে সাজানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এ তোরণ নির্মাণ করতে চান ট্রাম্প।
প্রায় নয় ঘণ্টা ধরে জনসাধারণের মতামত শোনার পর বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সন্ধ্যায় নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়। এ সিদ্ধান্তের প্রশংসা করে হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র বিবৃতিতে বলেন, ওয়াশিংটন ডিসিতে একটি বিজয় তোরণ নির্মাণের বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঐতিহাসিক পরিকল্পনা পূর্ণাঙ্গভাবে অনুমোদন করায় জাতীয় রাজধানী পরিকল্পনা কমিশনকে ধন্যবাদ জানায় হোয়াইট হাউস।
তবে নির্মাণকাজ কবে শুরু হতে পারে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। প্রকল্পটি বন্ধের দাবিতে একাধিক মামলা হয়েছে। নির্মাণকাজ সাময়িকভাবে বন্ধের আদালতের আদেশের সমালোচনা করে হোয়াইট হাউস একে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জেলা আদালতের হস্তক্ষেপ’ বলে অভিহিত করেছে। মুখপাত্র বলেন, আইনি প্রক্রিয়া শেষে প্রশাসন পুরোপুরি বিজয়ী হবে বলে তারা আশাবাদী এবং এই চমৎকার তোরণ নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।

চলতি বছরের শুরুতে প্রকাশিত নকশায় তোরণের চূড়ায় সোনালি রঙের ডানাযুক্ত ‘লেডি লিবার্টি’ মূর্তি এবং দুই পাশে দুটি সোনালি ঈগলের ভাস্কর্য দেখানো হয়েছে। স্থাপনাটির দুই পাশে সোনালি অক্ষরে লেখা থাকবে ‘ঈশ্বরের অধীনে এক জাতি’ এবং ‘সবার জন্য স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার’।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হোয়াইট হাউসের শেয়ার করা একটি ওয়েবসাইটে তোরণের ভিডিওচিত্রও প্রকাশ করা হয়। সেখানে স্থাপনাটির এক পাশে ‘আমেরিকার স্বর্ণযুগ’ লেখা দেখা যায়। ওয়েবসাইটে এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘দ্য মিলিটারি ট্রায়াম্ফাল আর্ক’।
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, তোরণটি সামরিক সরঞ্জাম সংরক্ষণের স্থাপনা হিসেবেও ব্যবহার করা যাবে। সেখানে স্নাইপার ও ড্রোন মোতায়েনের ব্যবস্থাও থাকবে। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প আগে লিখেছিলেন, বিশ্বের ৫৯টি বড় শহর ও রাজধানীর মধ্যে ওয়াশিংটনই একমাত্র, যেখানে কোনো বিজয় তোরণ নেই। তবে কোন ৫৯টি শহরের কথা তিনি বলেছেন, তা উল্লেখ করেননি।
এনসিপিসির চেয়ারম্যান ও ট্রাম্পের মনোনীত সদস্য মার্ক পাওলেটা বলেন, জাতীয় পরিচয়ের অংশ হিসেবে বড় স্মৃতিস্তম্ভের মাধ্যমে দেশের পরিচয় তুলে ধরার গুরুত্ব প্রেসিডেন্ট বোঝেন। তাঁর মতে, কলাম্বিয়া দ্বীপে স্মারক স্থাপনা নির্মাণের শতবর্ষী পরিকল্পনারই অংশ এ তোরণ। এর মাধ্যমে দেশ, সামরিক বাহিনীর সদস্য এবং আর্লিংটন জাতীয় সমাধিক্ষেত্রের প্রতি সম্মান জানানো হবে।
তবে প্রকল্পটির বিরোধিতা করছেন সাবেক সেনাসদস্যসহ বিভিন্ন মহলের মানুষ। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীতে ২৯ বছর কাজ করা এবং কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করা অ্যান রাইট বলেন, নির্মাণকাজ বন্ধে তাঁরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন। প্রয়োজনে বুলডোজারের সামনে দাঁড়াবেন এবং হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী সাবেক সেনাসদস্যদেরও সঙ্গে নেবেন।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর প্রসঙ্গ টেনে রাইট বলেন, ট্রাম্পের যুদ্ধনীতি ও ব্যক্তিগত অহংকারের রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করেছেন ভোটাররা।

ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় দায়িত্ব পালন করা সাবেক বিমানবাহিনীর সদস্য জন পোমেরয়ও তোরণ নির্মাণের বিরোধিতা করেছেন। তাঁর মতে, এটি আর্লিংটন সমাধিক্ষেত্রে যাওয়ার গাম্ভীর্য নষ্ট করবে। তোরণে সামরিক সরঞ্জাম রাখার পরিকল্পনাকে তিনি ‘হাস্যকর’ ও ‘অপরিপক্ব ধারণা’ বলে উল্লেখ করেন। এতে সন্ত্রাসী হামলার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে বলে তাঁর আশঙ্কা।
ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য জ্যারেড হাফম্যানের মতে, তোরণটি আর্লিংটন সমাধিক্ষেত্রের পাশাপাশি লিংকন মেমোরিয়াল দৃশ্যমান হতে বাধাগ্রস্ত করবে। তার ভাষায়, এ স্থাপনা এমন একটি দৃশ্যের ঐক্য ও আত্মত্যাগের বার্তাকে খণ্ডিত করবে, যা মার্কিন জনগণের সম্মিলিত পরিচয় তুলে ধরে। বরং সম্রাট ও রাজাদের নিজেদের স্মরণে নির্মিত বিশাল তোরণের মতোই এটি ট্রাম্পের ব্যক্তিগত স্মারকে পরিণত হবে।
প্রকল্পটির বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোতে পরিবেশ, যানজট ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়েছে। তোরণ নির্মাণে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন কি না, তা নিয়েও মতবিরোধ রয়েছে।
এদিকে ওয়াশিংটনে আরও কয়েকটি নির্মাণ ও সংস্কার পরিকল্পনা নিয়ে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছেন ট্রাম্প। এর মধ্যে হোয়াইট হাউসে প্রায় ৪০ কোটি ডলার ব্যয়ে বলরুম নির্মাণ এবং ১০৬ বছরের পুরোনো একটি গলফ কোর্স সংস্কারের পরিকল্পনাও রয়েছে। গলফ কোর্সটিকে ট্রাম্প ‘ট্র্যাশ আইল্যান্ড’ নামে অভিহিত করেছেন। এসব প্রকল্প নিয়েও আদালতে মামলা চলছে।






