যুক্তরাজ্যের জাতীয় পর্যায়ে অনূর্ধ্ব-১৭ বিভাগে কোরিয়ান মার্শাল আর্ট (তায়কোয়ান্দো) প্রতিযোগিতায় দ্বৈতে স্বর্ণ ও এককে রুপার পদক জিতেছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সম্প্রীতি। রোববার নটিংহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত ডেভিড রস স্পোর্টস ভিলেজে আয়োজিত হয় প্রতিযোগিতাটি।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সম্প্রীতির বাবা সাঈদ মনসুর উদ্দিন লিখেছেন মেয়ের সাফল্যের গল্প। ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের কন্যা সম্প্রীতি কোরিয়ান মার্শাল আর্ট (তায়কোয়ান্দো) প্রতিযোগিতায় যুক্তরাজ্যের জাতীয় পর্যায়ে দ্বৈতে স্বর্ণ এবং এককে রুপা অর্জন করেছে।’
‘ঘটনাটা কীভাবে ঘটল- তা এখনো আমি আর আমার স্ত্রী পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারছি না। সবকিছুর শুরু আমাদের প্রতিবেশী ব্যারিস্টার সৈকত ভাইয়ের আগ্রহে। তার মেয়ে অনন্যার সঙ্গে সম্প্রীতি যোগ দিয়েছিল একটি চাইনিজ কারাতে ক্লাবে। কিছুদিন অনুশীলনের পর ভালো না লাগায় ক্লাসে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। পরবর্তীতে নিজেই ইন্টারনেট ঘেঁটে আমাদের বাড়ি থেকে বেশ দূরে লাউটনে অবস্থিত ‘লাউটন তায়কোয়ান্দো’ ক্লাবে কোরিয়ান মার্শাল আর্ট শেখার ইচ্ছার কথা জানায়। জানাল এটাই নাকি এখন যুক্তরাজ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় মার্শাল আর্ট।’
‘প্রথমত আমি কিংবা আমার স্ত্রী কোরিয়ান মার্শাল আর্ট সম্পর্কে কিছুই জানি না। এছাড়া সামনে জিসিএসই পরীক্ষা, সন্ধ্যায় আনা নেয়ার ঝামেলা, ব্যয়বহুল ক্লাস ফি- সবমিলিয়ে আমরা অনাগ্রহ প্রকাশ করি। নাছোড়বান্দা সম্প্রীতি এবার তার ভাইয়ের শরণাপন্ন হয়। সাদাফকে বুঝিয়ে মাসিক ক্লাস ফি আদায় করে।’
এটা ছিল আমাদেরকে ব্ল্যাকমেইলের প্রথম পদক্ষেপ। তারপর শুনাতে থাকল অলিম্পিকে কোরিয়ান মার্শাল আর্টে গ্রেট বৃটেনের গোল্ড মেডেল প্রাপ্তির গল্প। আর ক্লাবটি যিনি পরিচালনা করেন তিনি যুক্তরাজ্যের হয়ে তিনবার কমনওয়েলথ গেমসে গোল্ড মেডেল পেয়েছেন এবং বর্তমানে জাতীয় দলের কোচ। গল্পের পাশাপাশি আমাদের দুজনের কানের কাছে চলতে থাকে টানা ঘ্যানর ঘ্যানর।’
‘একপর্যায়ে ভাইকে নিয়োগ করা হয় লবিস্ট হিসাবে। সাথে ব্ল্যাকমেইলের চূড়ান্ত হিসাবে আমাদের দুজনের দিকে ছুঁড়া হয় ভয়ংকর এক মারণাস্ত্র- আমরা নাকি তার ভাইয়াকে বেশি আদর করি, ইত্যাদি ইত্যাদি। বিশেষ করে আমার প্রতি এই অভিযোগটা ছিল তীব্র। একমাত্র কন্যা বলে কথা। অবশেষে শুরু হয় ক্লাব। ক্লাবে যাওয়ার পাশাপাশি অনুশীলন গ্রাউন্ড হিসাবে বেছে নেয়া হয় আমার শরীরকে। সুযোগ পেলেই কখনো ঘাড়ে, কখনো পিঠে, কখনো তল পেটে হাইয়া… বলে ঝাঁপিয়ে পড়তে থাকে! আহত হবার ভান করলে আবারও হাইয়া…!’
‘বীভৎস, উদ্ভট সেই সব দৃশ্য। হাইয়া থেকে বাদ যায়নি নিরীহ ঘরের দরজা, গাড়ির দরজা, গার্ডনের গেইট ইত্যাদি। তায়কোয়ান্দো বা কোরিয়ান মার্শাল আর্ট যে যুক্তরাজ্যে এত জনপ্রিয়, প্রতিযেগিতার দিন মহা আয়োজন না দেখলে বিশ্বাসই করতাম না। ডেভিড রস স্পোর্টস ভিলেজে সেদিন শিশু-কিশোর, অভিভাবক, বিচারক, অফিসিয়াল, ফটোগ্রাফার, দর্শক সব মিলিয়ে এক উৎসবের আমেজ। সারা দেশ থেকে সবাই এসেছেন।’
‘আমরা আগেরদিন বিকালেই হোটেল রুম বুকিং দিয়ে চলে গেছিলাম নটিংহ্যামে। স্পোর্টস ভিলেজের পাশেই ছিল হোটেলটি। সকাল ৮টায় রেজিস্ট্রেশন। ভোর ৫টার সময় দেখি সম্প্রীতি ঘড়ি দেখছে। বুঝলাম টেনশনে ঘুম আসছে না। দিনব্যাপী বিভিন্ন স্টেজ পার হয়ে অবশেষে বিকাল ৫টায় আসে বিজয়ে হাসি। দ্বৈতে গোল্ড, এককে সিলভার।’
‘এককে গোল্ড না পাওয়ার একটু আফসোস ছিল অবশ্য। শুধু বলল, বাবা, I was so nervous! You know my legs were shaking- that’s why I didn’t get gold! ক্লান্তি জাপটে ধরেছে। এবার বাড়ি ফেরার পালা। বাইরে সন্ধ্যা। স্বচ্ছ আকাশ। নটিংহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অপূর্ব ক্যাম্পাসজুড়ে গোধূলির সোনালি আলো। সেই আলো এসে পড়েছে সারি সারি গাছের হলুদ পাতায়। বাতাসের চঞ্চল্যে কানের দুলের মতো পাতাগুলো কাঁপছে, দুলছে। সব পেছনে ফেলে একসময় গাড়ি উঠল মোটরওয়েতে। মাঝপথে পেছন ফিরে দেখি স্ত্রী-কন্যা গভীর ঘুমে- সম্ভবত ক্লান্তিতে অবসন্ন।’
‘সম্প্রীতি শুধু একবার চোখ মেলে বলল, Baba, can I buy McDonald’s at the service centre? বললাম, তোমার আম্মু আর আমি ভীষণ ক্লান্ত। সার্ভিসে উঠব না। সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল I won the Gold Medal! I am the National champion. I deserve a treat! আমি হেসে ফেললাম।’
‘আমাকে খুশি করার জন্য আরো বলল, বাবা দেখ দেখ মুন। ডানে মাথা ঘুরিয়ে দেখি এম১ এর আকাশজুড়ে রূপালী চাঁদ। সঙ্গী হয়েছে আমাদের। ক্ষুদ্র জীবনের ক্ষুদ্র প্রত্যাশা, কিছু অপ্রত্যাশিত ঘটনা, এসবইত জীবন।’







