বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন হলো। আজ মঙ্গলবার ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। (ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্নাইলাইহি রাজিউন)।
মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশে ‘বেগম জিয়া’ অধ্যায়ের অবসান ঘটল, যিনি দীর্ঘ চার দশক ধরে দেশের রাজনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ছিলেন।
দিনাজপুরের পুতুল থেকে ফার্স্ট লেডি
১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন বেগম খালেদা জিয়া। তার পৈতৃক বাড়ি ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলায়। বাবা ইস্কান্দার মজুমদার এবং মা তৈয়বা মজুমদারের তৃতীয় সন্তান ছিলেন তিনি। ছোটবেলায় তাকে আদর করে ডাকা হতো ‘পুতুল’। দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং সুরেন্দ্রনাথ কলেজে তার শিক্ষাজীবন কাটে।
১৯৬০ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তরুণ ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। বিয়ের পর স্বামীর কর্মস্থল পশ্চিম পাকিস্তানে ছিলেন ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি দুই শিশু পুত্র তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোসহ ঢাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে বন্দি জীবন কাটান। স্বাধীনতার পর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের সেনাপ্রধান ও পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি হলে তিনি ‘ফার্স্ট লেডি’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলে আসেন। কিন্তু তখনও তিনি ছিলেন রাজনীতি থেকে দূরে, এক নিভৃতচারী গৃহবধূ।
রাজনীতিতে নাটকীয় অভিষেক
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ড বিএনপির জন্য এক চরম অস্তিত্বের সংকট তৈরি করে। দলের ভাঙন রোধে এবং নেতাকর্মীদের দাবির মুখে ১৯৮২ সালে রাজনীতিতে পা রাখেন তিনি। ১৯৮৩ সালে তিনি বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। সেই থেকে আমৃত্যু তিনি এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও ‘আপসহীন’ উপাধি
রাজনীতিতে আসার পরপরই এইচ এম এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তিনি রুখে দাঁড়ান। ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৯ বছরের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তিনি ছিলেন সম্মুখভাগের যোদ্ধা। রাজপথে তার অকুতোভয় নেতৃত্ব এবং সরকারের সঙ্গে কোনো প্রকার সমঝোতা না করার কারণে জনগণ তাকে ‘আপসহীন নেত্রী’ উপাধিতে ভূষিত করে। তার নেতৃত্বে সাত দলীয় জোটের আন্দোলন ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে এরশাদ সরকারের পতন ত্বরান্বিত করে।
বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী
১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার নেতৃত্বে বিএনপি অভাবনীয় বিজয় অর্জন করে। তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তার শাসনামলে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ এবং ২০০১ থেকে ২০০৬—মোট তিন মেয়াদে তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
তার শাসনামলের উল্লেখযোগ্য সাফল্যের মধ্যে রয়েছে:
বিনামূল্যে নারী শিক্ষা ও উপবৃত্তি চালু।
সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তন।
মুক্তবাজার অর্থনীতির বিকাশ।
সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়ন।
আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) গঠন।
২০০৬ সালে ক্ষমতা ছাড়ার পর ওয়ান-ইলেভেনের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তিনি গ্রেপ্তার হন। পরবর্তীতে মুক্তি পেলেও ২০০৮ সালের নির্বাচনে তার দল পরাজিত হয়। এরপর ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন ঘিরে দেশের রাজনীতিতে যে মেরুকরণ হয়, তাতে তিনি কঠিন সময় পার করেন।
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় তাকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরে তা বাড়িয়ে ১০ বছর করা হয়। কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়লে করোনা মহামারির সময় সরকারের নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষে তাকে গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’য় থাকার অনুমতি দেওয়া হয়। কার্যত তিনি দীর্ঘ সময় গৃহবন্দি ছিলেন। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত নভেম্বরে তিনি আইনিভাবে খালাস পান, কিন্তু শারীরিক অসুস্থতা তাকে আর রাজনীতির মাঠে ফিরতে দেয়নি।
বেগম জিয়ার জীবন ছিল ব্যক্তিগত শোকে জর্জরিত। ২০১৫ সালে ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো মালয়েশিয়ায় মৃত্যুবরণ করেন। বড় ছেলে তারেক রহমান দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসনে লন্ডনে ছিলেন। মৃত্যুর মাত্র কয়েক দিন আগে, গত ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫-এ তারেক রহমান দেশে ফিরে মায়ের শয্যাপাশে দাঁড়ান। মায়ের মৃত্যুর সময় বড় ছেলে পাশে থাকলেও ছোট ছেলেকে তিনি হারিয়েছেন অনেক আগেই।
লিভার সিরোসিস, ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতায় ভুগতে থাকা এই নেত্রী গত ২৩ নভেম্বর হাসপাতালে ভর্তি হন। চিকিৎসকদের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে আজ তিনি পাড়ি জমালেন না ফেরার দেশে।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)










