বাংলাদেশ

জুলাই স্মারক-২: ক্ষমতার ঠিকানায় এখন মানুষের ইতিহাস

জুলাই স্মারক-২: ক্ষমতার ঠিকানায় এখন মানুষের ইতিহাস

একসময় এখানে প্রবেশাধিকার ছিল সীমিত। রাষ্ট্রক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক বৈঠক এবং সরকারি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল ভবনটির পরিচয়। সেই গণভবনই এখন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান।

ইতিহাসের এই পরিবর্তন শুধু একটি ভবনের ব্যবহার বদলে যাওয়ার ঘটনা নয়। এটি রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও জনগণের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগও তৈরি করেছে।

ঢাকার শেরেবাংলা নগরের গণভবন দীর্ঘদিন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন হিসেবে পরিচিত ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভবনটি নতুন এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের অংশ হয়ে ওঠে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে উদ্যোগ নেওয়া হয় সাবেক গণভবনকে জাদুঘরে রূপান্তরের। যে ভবনের পরিচয় ছিল রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে, সেখানে এখন সংরক্ষিত হয়েছে আন্দোলনের দলিল, আলোকচিত্র, স্মৃতিচিহ্ন এবং সেই সময়ের নানা নিদর্শন। 

একসময় যে গণভবন ছিল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন, সেই ভবন ও তার ১৭ একর প্রাঙ্গণ এখন জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর। এখানে শুধু ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের ইতিহাসই তুলে ধরা হয়নি; প্রদর্শিত হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের গুম, নির্যাতন, রাজনৈতিক দমন-পীড়নের নমুনা, গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র, আন্দোলনে নিহত ব্যক্তিদের স্মৃতিচিহ্ন এবং ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের নানা দৃশ্য।

২০২৬ সালের ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাদুঘরটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। পরদিন থেকে এটি সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।

মূল ফটক থেকে জাদুঘর প্রাঙ্গণ

গণভবনের মূল ফটক পেরিয়ে প্রবেশ করলেই শুরু হয় ইতিহাসভিত্তিক প্রদর্শনী। লাল ইটের পথ, সবুজ মাঠ, স্মারক ভাস্কর্য, প্রতীকী সমাধি এবং রাজনৈতিক ইতিহাসের ধারাবাহিক উপস্থাপনা দিয়ে সাজানো হয়েছে বাইরের অংশ।

‘গণতন্ত্রের পথে দীর্ঘ যাত্রা’ (Long Walk to Democracy) নামের প্রদর্শনীতে স্বাধীনতার পর থেকে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায় তুলে ধরা হয়েছে।

মাঠে রয়েছে জুলাইয়ের নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে প্রতীকী কবর ও স্মৃতিস্তম্ভ। আরও রয়েছে পিলখানা হত্যাকাণ্ড, ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনা, গুমের শিকার ব্যক্তি, নারী আন্দোলনকারী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে নির্মিত স্মারক ভাস্কর্য।

এখানে কয়েকটি বিশেষভাবে পরিচিত দৃশ্যও ভাস্কর্যের মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়েছে। আছে আবু সাঈদের প্রতিবাদ, মীর মুগ্ধের স্মৃতি এবং গোলাম নাফিজের ঘটনাসহ জুলাই আন্দোলনের আলোচিত মুহূর্তগুলো।

প্রতীকী আয়নাঘর ও গুমের ইতিহাস

জাদুঘরের দক্ষিণ দিকে রয়েছে আলোচিত ‘আয়নাঘর’-এর আদলে নির্মিত প্রতীকী বন্দিশালা। এতে ২২টি সেল তৈরি করা হয়েছে।

এই প্রদর্শনীর উদ্দেশ্য হলো গুমের অভিযোগে আলোচিত গোপন বন্দিশালাগুলোর পরিবেশ সম্পর্কে দর্শনার্থীদের ধারণা দেওয়া। এটি মূল বন্দিশালা নয়; তার আদলে নির্মিত একটি প্রদর্শনী।

জাদুঘরে গুমের শিকার ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও আলোকচিত্রের পাশাপাশি ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (ভিআর) প্রযুক্তিতে বন্দিশালার পরিবেশ দেখার ব্যবস্থাও রয়েছে।

মূল ভবনের নিচতলা: রাজনৈতিক ইতিহাস, নথিপত্র ও ক্ষমতার কেন্দ্র

গণভবনের মূল দোতলা ভবনের নিচতলায় সাজানো হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামল এবং সেই সময়ের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে বিভিন্ন প্রদর্শনী।

এখানে রয়েছে:

– গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও রাজনৈতিক নির্যাতনের অভিযোগসংক্রান্ত আলোকচিত্র এবং নথি।

– পিলখানা হত্যাকাণ্ড ও শাপলা চত্বরের ঘটনাসংক্রান্ত প্রদর্শনী।

– গণভবন থেকে উদ্ধার করা গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র, যার মধ্যে জমি বরাদ্দ, আর্থিক অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগসংক্রান্ত দলিল রয়েছে।

– সংবাদপত্রের কাটিং, সরকারি নথি, ভিডিওচিত্র ও ঐতিহাসিক আলোকচিত্র।

– সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যবহৃত লাল টেলিফোন, টেবিল ও চেয়ার।

– শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্যের মুখাবয়বের অংশবিশেষ নিয়ে নির্মিত ভাস্কর্য।

বিশেষভাবে সংরক্ষিত ‘কল রুম’

গণভবনের যে বৈঠককক্ষে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা, কূটনীতিক ও সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করতেন, সেটি ‘কল রুম’ নামে পরিচিত।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণভবনে জনতার প্রবেশের পর কক্ষটিতে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল, তার চিহ্ন সংরক্ষণ করা হয়েছে। মেঝের ওপর বিশেষ পুরু কাচ বসানো হয়েছে, যাতে দর্শনার্থীরা নিচে থাকা সেই চিহ্ন দেখতে পারেন। ভবনের দেয়াল ও অন্য কক্ষেও সেদিনের কিছু চিহ্ন রেখে দেওয়া হয়েছে।

দ্বিতীয় তলা: জুলাইয়ের ৩৬ দিনের ইতিহাস

মূল ভবনের দ্বিতীয় তলাটি সবচেয়ে সরাসরিভাবে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানকে ধারণ করে।

এখানে ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ৩৬ দিনের আন্দোলন দিনভিত্তিক উপস্থাপন করা হয়েছে। আন্দোলনের শুরু, শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ, দেশজুড়ে বিক্ষোভ, সংঘাত, হতাহতের ঘটনা এবং শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা তুলে ধরা হয়েছে ছবি, লেখা, ভিডিও, ডিজিটাল প্রদর্শনী ও শিল্পকর্মে।

এই তলায় অন্তত ৫০০ নিহত ব্যক্তির ব্যবহৃত সামগ্রীসহ নানা নিদর্শন রয়েছে। আরও অনেক নিদর্শন সংগ্রহে থাকলেও স্থানস্বল্পতার কারণে সব একসঙ্গে প্রদর্শিত হচ্ছে না।

ব্যক্তিগত স্মৃতিচিহ্ন

দর্শনার্থীরা এখানে দেখতে পারেন নিহত ব্যক্তিদের পোশাক, বই, খাতা, ক্রীড়াসামগ্রী, চিঠিপত্র ও অন্যান্য ব্যক্তিগত ব্যবহার্য বস্তু। প্রতিটি ব্যক্তিগত বস্তু একজন মানুষের পরিচয়, দৈনন্দিন জীবন এবং তার পরিবারের স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত।

৩৬০ ডিগ্রি ডিজিটাল প্রদর্শনী

এখানে ১০টি প্রজেক্টরের সাহায্যে চারপাশে ৩৬০ ডিগ্রি পরিসরে জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন দৃশ্য দেখানো হয়। দর্শনার্থীদের বসার ব্যবস্থাও রয়েছে। উদ্দেশ্য হলো স্থির ছবি বা সাধারণ ভিডিওর বাইরে গিয়ে আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহকে একটি সমন্বিত দৃশ্য-শব্দের অভিজ্ঞতায় তুলে ধরা।

জাদুঘরের অন্যান্য অংশেও রয়েছে ডিজিটাল ডিসপ্লে, অডিও-ভিডিও উপস্থাপনা ও তথ্যচিত্র প্রদর্শনের ব্যবস্থা।

নির্যাতন ও গুমবিষয়ক আলাদা প্রদর্শনী

নিচতলায় দুটি উল্লেখযোগ্য অংশের নাম ‘টর্চার রুম’ ও ‘গুম’।

প্রথম অংশে নির্যাতনের অভিযোগসংক্রান্ত উদ্ধার করা আলামত এবং বন্দিশালার পরিবেশ তুলে ধরা হয়েছে। দ্বিতীয় অংশে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পোশাক, জুতা, মোবাইল ফোন, চিঠি, বন্দিদশায় লেখা বার্তার প্রতিলিপি ও আলোকচিত্র প্রদর্শিত হচ্ছে।

এ ছাড়া বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ, ছাত্রলীগের সহিংসতার অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক ঘটনাগুলো নিয়ে আলাদা প্রদর্শনী রয়েছে।

লাল টেলিফোনে কথোপকথনের অডিও

জাদুঘরের একটি ব্যতিক্রমী প্রদর্শনী হলো শেখ হাসিনার সাবেক অফিসকক্ষে রাখা ছয়টি লাল টেলিফোন।

তিনটি টেবিলে রাখা এই টেলিফোনগুলোর পাশে বিভিন্ন ব্যক্তির নাম ও নম্বরের তালিকা রয়েছে। প্রদর্শনীর নির্দিষ্ট নম্বর ব্যবহার করলে দর্শনার্থীরা রেকর্ড করা কথোপকথন শুনতে পারেন।

জুলাইয়ের নারী আন্দোলনকারীদের ভূমিকা

দ্বিতীয় তলার কয়েকটি কক্ষে নারী শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে অংশগ্রহণ, মিছিল, প্রতিবাদ ও সংগঠিত প্রতিরোধের দৃশ্য তুলে ধরা হয়েছে।

এখানে রয়েছে আলোকচিত্র, চিত্রকর্ম, ডিজিটাল পোস্টার এবং সূচিকর্মের মাধ্যমে তৈরি শিল্পকর্ম। বাইরের মাঠেও নারী আন্দোলনকারীদের স্মরণে ভাস্কর্য রয়েছে।

চিঠি, পোস্টার, গ্রাফিতি ও সংবাদপত্র

জাদুঘরে সংরক্ষিত সংগ্রহের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো আন্দোলনের সময়কার লিখিত ও দৃশ্যমান দলিল।

এতে রয়েছে হাতে লেখা চিঠি, আন্দোলনের পোস্টার, ব্যানার, প্ল্যাকার্ড, দেয়াললেখা, গ্রাফিতি, সংবাদপত্রের কাটিং, আলোকচিত্র ও ডিজিটাল নথি।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য একটি নিদর্শন হলো ৫ আগস্ট নিহত অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী শাহরিয়ার খান আনাসের মায়ের উদ্দেশে লেখা শেষ চিঠি। ১ নভেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত একটি সরেজমিন প্রতিবেদনে চিঠিটির প্রদর্শনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

৫ আগস্টের গণভবন ও সংরক্ষিত ধ্বংসাবশেষ

জাদুঘরের কিছু অংশে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণভবনে প্রবেশ করা জনতার ঘটনার পরের অবস্থা সংরক্ষণ করা হয়েছে।

বিশেষ করে ভাঙা স্থাপনার অংশ, ক্ষতিগ্রস্ত কক্ষ, দেয়ালের চিহ্ন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ত্যাগের ঘটনাসংক্রান্ত ছবি ও ভিডিও দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরা হয়।

এসব প্রদর্শনীতে নতুনভাবে সবকিছু সাজিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে ঐতিহাসিক ঘটনার পর ভবনের কিছু অংশ যে অবস্থায় ছিল, তার চিহ্ন ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

অন্যান্য স্থাপনা

মূল প্রদর্শনীর বাইরে পুরো কমপ্লেক্সে আরও রয়েছে:

– জুলাই মঞ্চ: সাবেক হেলিপ্যাড এলাকায় সাংস্কৃতিক ও স্মরণমূলক আয়োজনের স্থান।

– মনসুন থিয়েটার: দৃশ্যভিত্তিক উপস্থাপনার অংশ।

– হিলিং রুম: স্মরণ ও অনুভূতিনির্ভর প্রদর্শনীর একটি অংশ।

– রোড টু ফিউচার: ভবিষ্যৎমুখী ভাবনা নিয়ে পরিকল্পিত অংশ।

– পাঁচটি নতুন হাঁটার পথ ও সম্প্রসারিত লেক।

– অডিটোরিয়াম: জুলাই আন্দোলনসংক্রান্ত তথ্যচিত্র প্রদর্শনের ব্যবস্থা।

– ফুডকোর্ট, প্রার্থনাকক্ষ, টিকিট কাউন্টার ও স্যুভেনির শপ।

যারা আর ফিরে আসবেন না

জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহে যারা নিহত হয়েছেন, তাদের পরিবারের কাছে ইতিহাসের অর্থ ভিন্ন।

কারও কাছে জুলাই মানে সন্তানের অনুপস্থিতি। কারও কাছে ভাইয়ের স্মৃতি। কারও কাছে পরিবারের এমন একজন সদস্যের কথা, যার অভাব প্রতিদিন অনুভূত হয়।

জাদুঘরে তাদের জীবনের নিদর্শন ও গল্প যথাযথভাবে সংরক্ষিত হলে দর্শনার্থীরা শুধু আন্দোলনের ঘটনাই নয়, তার মানবিক মূল্যও উপলব্ধি করতে পারবেন।

ইতিহাস সংরক্ষণের চ্যালেঞ্জ

জুলাইয়ের ইতিহাসকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করতে হলে প্রয়োজন তথ্যের যথার্থতা, দলিলের সত্যতা এবং বিভিন্ন অভিজ্ঞতার দায়িত্বশীল উপস্থাপন।

কারণ একটি জাদুঘরের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে তার সংরক্ষিত তথ্য ও উপস্থাপনার ওপর।

গণভবনের নতুন পরিচয় আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রাখে: ক্ষমতার ইতিহাস আমরা কতটা মনে রাখি, আর সেই ইতিহাস বদলে দেওয়া সাধারণ মানুষের জীবনকে কতটা জায়গা দিই?

বিষয়:জাদুঘর জুলাই জাদুঘর জুলাই স্মারক মূল ফটক

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…