‘যত গর্জে তত বর্ষে না’র একটা ভালো উদাহরণ হতে পারেন নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সম্ভবত তিনি তাই হচ্ছেন এবং এই হওয়াটা তার নিজের জন্য যেমন কল্যাণকর, তেমনি পৃথিবীবাসির জন্যও। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন ক্যাম্পেইনে তিনি যে ভাষায়, যে ভঙ্গিতে কথা বলেছেন, সাধারণ মানুষের মনে ইসলাম ও অভিবাসীদের সম্পর্কে যে ভয় ধরিয়ে দিয়ে শ্বোতাঙ্গদের গরিষ্ঠ ভোট পেয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হয়েছেন সেটি অনেকের কাছেই বিস্ময়ের। কারণ তার ওই কথাবার্তা শুনে অনেক জাঁদরেল লোকও ট্রাম্পকে উর্বর মস্তিষ্কের এবং উগ্র জাতীয়াবাদী বলে ভর্ৎসনা করেছেন।
কিন্তু দেখা গেলো, ধনসিম্পত্তি, রেসলিং আর বিশ্ব সুন্দরীর দুনিয়ায় আলোচিত/সমালোচিত/বিতর্কিত একজন লোক রাজনীতিবিদ হিসেবে যার ওই অর্থে কোনো অভিজ্ঞতা নেই তিনি এমন প্রার্থীকে হারিয়ে দিলেন, যার রয়েছে দীর্ঘদিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ফার্স্টলেডি হিসেবে বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা।
যুক্তরাষ্ট্রে একজন ঝানু রাজনীতিবিদ হিসেবে যার খ্যাতি বিদিত সেই হিলারি ক্লিনটনকেই হারিয়ে এখন সত্যি সত্যিই বিশ্বমোড়লদের অভিভাবক ডোনাল্ড ট্রাম্প। নির্বাচনি ক্যাম্পেইনে তিনি মুসলমান ও অভিবাসীদের নিয়ে যেরকম বিষোদ্গার করেছিলেন, মেক্সিকো সীমান্তে মেক্সিকোর পয়সায় দেয়াল তোলার যে হুমকি দিয়েছিলেন তাতে করে একটা ভীতিকর এবং শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছিলো অনেকেরই মনে। 
অভিবাসী আর মুসলিমদের অনেকের মনেই এই শঙ্কা জেগেছিল যে, ট্রাম্প নির্বাচিত হলে বোধ হয় তাদের আর যুক্তরাষ্ট্রে থাকা হবে না। শুধু মুসলমানরাই নন, অনেক অমুসলিম যারা ট্রাম্পকে পছন্দ করেন না, এমন অনেক তারকাও যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে যাওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু নির্বাচিত হবার পর দেখা গেলো ট্রাম্পের সুরে নাটকীয় পরিবর্তন এসেছে। ফলে মনে হচ্ছে, শেষমেষ তিনি আসলে ওসবের কিছু্ই করবেন না। বরং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গুজরাট ট্রাজিডির জন্য যাকে দায়ী করা হয়, এরকম একজন সাম্প্রদায়িক লোক ভারতের প্রধানমন্ত্রী হবার পর তার চেহারায় আমূল পরিবর্তন আসে।
গুজরাটে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার এই খলনায়কের আমলেই দেখা যাচ্ছে, গরু জবাই ইস্যুতে মুসলমানদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে। সেরকম নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের গর্জন আলটিমেটলি বর্ষণে পরিণত হবার সম্ভাবনাও কমে আসছে।
এরইমধ্যে এর কিছু্ আলামতও দেখা যাচ্ছে। যেমন তার প্রশাসনের জন্য প্রথমবারের মতো দুই নারীকে বেছে নিয়েছেন ট্রাম্প। সাউথ ক্যাটরোলাইনার গভর্নর নিকি হেইলিকে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন রাষ্ট্রদূতের ভূমিকায় দেখা যাবে।
আর বিলিয়নেয়ার রিপাবলিকান বেটসি ডেভোস পাচ্ছেন ট্রাম্প সরকারের শিক্ষামন্ত্রীর পদ। অথচ ভোটের প্রচারের সময় এই দুই নারী ট্রাম্পের সমালোচনা করেছেন। তার মানে ট্রাম্প এখন তার সমালোচক আর বিরোধীদের নিজের দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করছেন। আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে এটি একটি ভালো কৌশলও বটে।
নির্বাচনের আগে, বিশেষ করে শেষ মুহূর্তে ট্রাম্পের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিলারি ক্লিনটনের জন্য সবচেয়ে বড় অস্বস্তি ডেকে আনে তার কিছু ইমেইল ফাঁস। বিরোধীদের জব্দ করার জন্য ট্রাম্পের এটিও একটি ট্রাম্পকার্ড হতে পারত। কিন্তু দেখা যাচ্ছে এখানেও কৌশলী এবং সহনশীল ট্রাম্প। জানিয়ে দিয়েছেন,হিলারির ইমেইল কেলেঙ্কারির তদন্ত জারি রাখবে না তার প্রশাসন। যদিও নির্বাচনি প্রচারে তিনি বলেছিলেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে হিলারিকে জেলে পাঠাবেন তিনি। কিন্তু ট্রাম্প এখন বলছেন, তিনি সবার প্রেসিডেন্ট। এমনকি হিলারির দলেরও।
মুসলমানদের নিয়েও নির্বাচনী প্রচারে যেরকম কড়া এবং আপত্তিকর ভাষায় কথা বলেন ট্রাম্প, সেই সুরও নরম হয়েছে। ফক্স নিউজ রেডিওকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে মুসলিমদের ওপর যে নিষেধাজ্ঞার কথা বলেছিলেন, সেটি একটি সুপারিশ মাত্র এবং তা সাময়িক সময়ের জন্য। বলেন, সন্ত্রাসবাদবিরোধী লড়াইয়ের জন্য সামরিক বাহিনীকে তিনি আন্তর্জাতিক আইন লংঘনের নির্দেশ দেবেন না।
ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো নারী গর্ভপাত ঘটালে তাকে শাস্তির মুখোমুখি করার কথা বললেও সেই অবস্থান থেকেও সরে এসেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, গর্ভপাত করা নারীকে নয়, বরং যিনি গর্ভপাত ঘটানোর কাজটি করবেন, তার শাস্তি হওয়া উচিত।
প্রসঙ্গত, জর্জ ডব্লিউ বুশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর (২০০১ সালের ২০ জানুয়ারি) অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, বুশের কর্মকাণ্ডের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বহির্বিশ্বের সম্পর্কের মারাত্মক অবনতি হবে। কারণ তিনিও তার নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্পের মতো উগ্র জাতীয়াতাবাদ ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। ক্লিনটনের নমনীয় পররাষ্ট্রনীতির বদলে যুক্তরাষ্ট্র একটি আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতি চালু করবেন। 
বিশেষজ্ঞদের সেই আশঙ্কা সত্যি হয় ওই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর নাইন ইলেভেন হামলার পর। একে অজুহাত করে যুক্তরাষ্ট্র ‘ওয়ার অন টেরর’ নামে তথাকথিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। নাইন-ইলেভেনের পর যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ ও অভিবাসন নীতিতেও বড় পরিবর্তন আসে। বিশেষ করে এর শিকার হয় মুসলমানরা। এ কারণে বিশ্বজুড়ে মার্কিনবিরোধী মনোভাবও দানা বেঁধে ওঠে।
এসব কারণে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে অনেকেই বুশের ছায়া দেখছেন। এর যথেষ্ট যৌক্তিকতাও আছে নিশ্চয়ই। কিন্তু আসলেই কি ট্রাম্প তার পূর্বসূরি বুশ হবেন নাকি তার সমসাময়িক মোদি হবেন সেটি দেখার জন্য ট্রাম্পের ক্ষমতা গ্রহণের পর অন্তত একশো দিনের কর্মকাণ্ডে বিশ্ববাসীর নজর থাকবে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







