অভিনয়ে আত্মার নিমগ্নতা: নানা পাটেকর- এক বহুমাত্রিক শিল্পীর প্রস্থান

মাত্র ৩৫ টাকার সংগ্রামী জীবনে পথে নেমেছিলেন তিন। তখন তাঁর বয়স ছিল ১৩ বছর। সেখান থেকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের বিশাল ইন্ড্রাস্টিতে অভিনয়ের মহিরুহ। তিনি আর কেউ নন নানা পাটেকর। তিনি একজনই!
৮ অক্টোবর ২০২৬ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৭৫ বছর বয়সে চলে গেলেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের খ্যাতিমান শৈল্পিক অভিনয় শিল্পী।
যিনি অভিনয়ের তিনটি শাখার শ্রেষ্ঠ অভিনয় শিল্পী, পার্শ্ব অভিনেতা ও খল চরিত্রের সবটাতেই অনবদ্য তিনি। একাধারে তিনি চলচ্চিত্র নির্মাতাও নানা পাটেকর। তাঁর মতো বোধ জাগানিয়া গুণিজনেরা একে একে গুটিয়ে নিচ্ছেন জীবন। নিভছে জগতের সফল জীবনবোধের কতক ব্যাপক খ্যাতিমান মুখ। নানা পাটেকর আপনার শূন্যতা অপূরণীয়।
অপার শ্রদ্ধা। ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রখ্যাত অভিনেতা ও চলচ্চিত্র নির্মাতা নানা পাটেকর। মাত্র ১৩ বছর বয়সে যিনি জীবন যুদ্ধের ময়দানে নেমে বিচিত্র কর্ম আর সাফল্যের চূড়ায় দেখেছিলেন জীবনের অনিন্দ এক রুপ। এর জন্য অবশ্য তাঁকে পাড়ি দিতে হয়েছে বিভিন্ন ধাপ। যেখানে মুম্বাই শহরের রাস্তায় রাস্তায় জ্রেবা ক্রসিংয়ে রং করা থেকে শুরু করে সিনেমার পোস্টার আঁকার কাজ করেছেন তিনি। বিনিময়ে একবেলা খাবার আর দিন মজুরি হিসেবে ৩৫ টাকা আয় ছিল তার। এই আয় তাঁকে জীবনে বাঁচার অবলম্বনের রদস জুগিয়ে তিলতিলে করে নানা চলচ্চিত্রে মহীরুহ হয়ে পাটেকর নামে গড়ে দিয়েছে তাঁকে।
সেই শৈশব থেকে জীবন যুদ্ধের নানান অলিগতিতে ঘুরে ফিরে তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছেন নিজেকে। কালের পরিক্রমায় তাঁর পিতৃপ্রদত্ত বিশ্বনাম পাটেকর নামটির আড়ালে নানা পাটেকর হয়ে প্রস্ফুটিত হন। এর আগে অবশ্য তিনি মুম্বাইয়ে স্যার জে জে ইন্সটিটিউট অব অ্যাপ্লাইড আর্ট থেকে পড়াশোনা সম্পন্ন করেন। হয়ে উঠেন বিশ্বের সবচেয়ে বড় সিনেমা বাজার ও বৈচিত্র্যময় ফিল্ম জগতের মহিরুহ—শেষ্ঠ অভিনেতা, পার্শ্ব চরিত্র ও খল তিন শাখাতেই মাতিয়ে গেছেন। দেখিয়ে দিয়েছেন তাঁর অভিনয় গুণের মুন্সিআনা।
১৯৫১ সালের ১লা জানুয়ারি মহারাষ্ট্রের রায়গড় জেলার মুরুদ-জঞ্জিরায় জন্মগ্রহণকারী বিশ্বনাথ পাটেকর_কালের খেয়ালে চলচ্চিত্র অভিনেতা, নির্মাতা নানা পাটেকর হয়ে দীর্ঘ কয়েক দশক দাপিয়ে বেড়িয়েছেন__ ভারতীয় চলচ্চিত্রের বাজার। খ্যাতির শীর্ষে তাঁকে পরিচিতি দেয় তাঁর নিবিগ নিমগ্ন অভিনয় শৈল্যি।

১৯৭৮ সালে “গমন” চলচ্চিত্রে পাশ্বর্চরিত্রে অভিনয় দিয়ে তাঁর বর্ণাঢ্য অভিনয়শিল্পী জীবনের শুরু হয়। এর পর একের পর এক সফল চলচ্চিত্র তাঁকে নতুন জীবনে পূণরাত্থান ঘটায়৷ ইতোমধ্যে দর্শককূল চিনে নেয় একজন দক্ষ জীবনমৃখী, অসাধারণ বাস্তবিক অভিনয় বোদ্ধা নানা পাটেকরকে।
১৯৮৯ সালে “পারেন্দি” চলচ্চিত্রের খল চরিত্র “আন্না” নামে তাঁর বিপুল সাফল্য তাঁকে শুধুই সামনেই টেনেছে। সামনে শুধু সামনে— আরো সামনো। “ক্রান্তিবীর” “অঙ্গার, “অপসারণ, “অগ্নিসাক্ষী, “নটসম্রাট, “ওয়েলকাম” নামের একটাকে ছাড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব জনপ্রিয়তা পায়। স্বভাবতই তাঁর ঝুলিতে জমা হয়েছে শ্রেষ্ঠ অভিনেতা, শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা এবং খল—অভিনয়ের তিন শাখাতেই তিনি ফিল্মফেয়ার পদক৷ ২০১৩ সালে তিনি ভারতের সেরা অভিনয় শিল্পী হিসেবে বেসামরিক চতুর্থ শীর্ষস্থানীয় পদক “পদ্মশ্রী পুরস্কারে” ভূষিত হন।
সফল ও জীবনের সফর অভিনয় শিল্পী সত্তা ছাপিয়ে তিনি ছিলেন জনদরদি। বিপন্ন অসহায় মানুষের প্রতি সমানুভূতি ও সহানুভূতি প্রবণ ছিলেন তিনি। ২০১৫ সালে তিনি বিপন্ন আত্মঘাটি কৃষক ও তাদের অসহায় পরিবারের জন্য গড়ে তোলেন নাম ফাউন্ডেশন —Namm Foundation. নিজ জেলা মহারাষ্ট্রের খরা পীড়িত কৃষকদের জন্য সহায়তা হাত বাড়িয়ে ছিলেন তিনি। নিজের সখের গাড়ী কেনার দেড় কোটি টাকার ছোট্ট পুঁজিতে তিনি হাজারো কৃষকের পাশে কাঁধ দিয়ে খানিক সহায়তার সাহস হয়ে উঠেন সেই হন। স্যালুট নানা পাটেকর।
একসময় সহ অভিনেত্রীর অভিযোগেে ভিক্তিতে তাঁর সাফল্যের পালকে খানিক কাঁদাও লেগেছে বটে। তথাপি একজন ব্যক্তি মানুষ কেউ শতভাগ পুত পবিত্র নন! নারীর প্রতি যৌন নির্যাতন প্রতিরোধের বিশ্বময় আলোড়িত “মি_টু হ্যাশটাগের সেই সোচ্চার সময়ে তিনি হয়ত “চুন খেয়ে খানিক মুখ পোড়ানোর স্বাদ পেয়েছিলেন।”

তথাপিও জীবন বহতায় ভুল, ঠিক, সত্য অধর্সত্যের বা খেয়ালে_খাম খেয়ালের জীবন তাঁকে দুহাত ভরেই দিয়েছেন। কখনো সেই হাত ফুলেল হয়েছে কখনো কাঁটার আঁচড়ে দাগ ফেলেছে।
তথাপিও সত্য এই যে, ভারতীয় উপমহাদেশে এক মুম্বাই কিংবা বোম্বে দক্ষিণের ফিল্মের বহুমাত্রিক অভিনয় শৈল্পিক জগত নানা পাটেকর একজনই।
গুরু, আপনি চলে গেলেন বটে। তবে আত্মার সাথে অভিনয় শৈল্যির যে যোগসূত্রতা গড়ে গেছেন আপনি তা এক অনবদ্য শৈল্পিক সৃষ্টির ফল্গুধারা। সেই ধারায় নানা পাটেকর আপনি একজনই বোদ্ধা গুণি শিল্পী যাঁর বোধের গভীরে জাগরণ তোলে জীবনবোধ। তারই মত এদেশেন বহু গুণিজনেরা একে একে গুটিয়ে নিচ্ছেন। নিভে যাচ্ছে তাদের জীবন প্রদীপ।
জাগতিক এই খেলা ঘরে আজ সবই অন্তঃসার শূন্য মানবের নামে দানবের দখলে যাওয়ার তোড়জোড়ে।
গুণিজন “নানা পাটেকরের” আত্মা পরম শান্তিতে থাকুক। তাঁর কর্মের গুণে তিনি স্মরণীয় বরণীয় হয়ে থাকবেন নশ্বর এই জগৎ সংসারে।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)





