হাসপাতালের গন্ধ, রাষ্ট্রের বিবেক: দারিদ্র্য, চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্যের অদৃশ্য মহামারী

ছবি: সংগৃহীত
সরকারি হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ডে যদি একটি করে গন্ধ আলাদা করে পাওয়া যেত, তবে সেই গন্ধের নাম হয়তো হতো—দারিদ্র্য।
এ গন্ধ কোনো সুগন্ধির বোতলে ভরা যায় না। এটি পুঁজের গন্ধ, ঘামের গন্ধ, রক্তের গন্ধ, ওষুধের গন্ধ, জীবাণুনাশকের গন্ধ, দীর্ঘদিন না-ধোয়া বিছানার গন্ধ; তার চেয়েও বেশি—এটি অভাবের গন্ধ। কোথাও ওষুধ নেই, কোথাও পরীক্ষা করানোর টাকা নেই, কোথাও রক্ত নেই, কোথাও আইসিও নেই, কোথাও শয্যা নেই; কোথাও শয্যা আছে, কিন্তু রোগীর জন্য জায়গা নেই। মানুষের শরীর তখন হাসপাতালের মেঝেতে পড়ে থাকে, আর রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থা তার পাশ দিয়ে হেঁটে যায়।
সাম্প্রতিক সরকারি তথ্যের দিকে তাকালে বোঝা যায়, ছবিটা কোনো কবির কল্পনা নয়। ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী দেশের ৫৯টি জেলা হাসপাতালে গড় বেড-অকুপেন্সি রেট ছিল ১৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ একশ শয্যার হাসপাতালে গড়ে ১৭৮ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে এই হার ১৬৪ শতাংশ এবং ৪৩২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১১১ শতাংশ। কোনো কোনো হাসপাতালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ—কয়েকটি জেলা ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বেড-অকুপেন্সি ৩০০ শতাংশেরও বেশি।
একটি শয্যার ওপর তিনজন মানুষ চিকিৎসা নিলে সেটাকে কি হাসপাতাল বলা যায়? নাকি সেটাকে বলা উচিত রাষ্ট্রের অসহায়ত্বের প্রদর্শনী?
অবশ্য আমাদের রাষ্ট্রীয় ভাষায় এসবের জন্য বেশ সুন্দর সুন্দর শব্দ আছে—‘সেবা’, ‘উন্নয়ন’, ‘অগ্রগতি’, ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা’। কিন্তু হাসপাতালের মেঝেতে শুয়ে থাকা মানুষটি এসব শব্দের অর্থ জানে না। সে শুধু জানে, তার মাথার নিচে বালিশ নেই। তার হাতে ওষুধের তালিকা আছে, কিন্তু ওষুধ নেই। তার স্বজনের হাতে প্রেসক্রিপশন আছে, কিন্তু প্রেসক্রিপশন কিনে খাওয়ানোর সামর্থ্য নেই।
এই জায়গাটিই সবচেয়ে নির্মম। কারণ বাংলাদেশে অসুস্থ হওয়া শুধু শারীরিক বিপর্যয় নয়; এটি ক্রমশ একটি অর্থনৈতিক বিপর্যয়েও পরিণত হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশের মোট বর্তমান স্বাস্থ্যব্যয়ের প্রায় ৭৯.৩১ শতাংশ মানুষের নিজ পকেট থেকে এসেছে। ২০২২ সালে এ হার ছিল ৭৮.২৫ শতাংশ। অর্থাৎ চিকিৎসা পাওয়ার অধিকারটি কাগজে যতটা সামাজিক, বাস্তবে তার বড় অংশই ব্যক্তিগত ক্রয়ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল।
এখানে একটি অদ্ভুত রাষ্ট্রীয় দর্শন কাজ করছে। মানুষকে বলা হচ্ছে—তুমি সুস্থ থাকবে, কিন্তু সুস্থ থাকার খরচের বড় অংশ তোমাকেই বহন করতে হবে। তুমি দরিদ্র হলে আরও বেশি কষ্ট পাবে, কারণ দরিদ্র মানুষের জন্য অসুখ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; অসুখ তার সংসারের চাল, সন্তানের পড়াশোনা, জমির দলিল, স্ত্রীর গয়না—সবকিছুর ওপর একসঙ্গে আঘাত করে।
বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টসের হিসাবে ২০২১ সালে মানুষের নিজ পকেটের ব্যয় ছিল মোট স্বাস্থ্যব্যয়ের ৭৩ শতাংশ। সেই ব্যয়ের বড় অংশ গেছে ওষুধ ও রোগ নির্ণয়ের পেছনে।
আমরা সাধারণত হাসপাতালকে চিকিৎসার জায়গা মনে করি। কিন্তু দরিদ্র মানুষের কাছে হাসপাতাল অনেক সময় চিকিৎসার শেষ আশ্রয়। সে আগে স্থানীয় ওষুধের দোকানে যায়, তারপর পল্লিচিকিৎসকের কাছে যায়, তারপর ধার করে, তারপর আত্মীয়ের কাছে হাত পাতে, তারপর কোনো একদিন হাসপাতালে এসে হাজির হয়। রোগ তখন আর শুধু রোগ থাকে না; তার সঙ্গে যোগ হয় ঋণ, অনিশ্চয়তা এবং ভয়।
এ কারণেই স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা আসলে দারিদ্র্য পুনরুৎপাদনের একটি যন্ত্র। সরকারি হাসপাতালগুলোতে জনবল সংকটও কম নয়। ২০২৬ সালের জুনে জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় অনুমোদিত ৪১,৮০৬টি চিকিৎসক পদের মধ্যে ৯,৪০৭টি পদ শূন্য। নার্সদের ৪৯,৫০১টি পদের মধ্যে ৫,০৩২টি এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের ২৬,৫৪৪টি পদের মধ্যে ৮,৭৮৪টি পদও শূন্য ছিল।
তাহলে প্রশ্ন হলো, রোগী যদি বেশি হয়, শয্যা যদি কম হয়, চিকিৎসক যদি কম হয়, নার্স যদি কম হয়, ওষুধ যদি অনিয়মিত হয়—তবে হাসপাতালের দেয়ালে যতই ‘মানবিক স্বাস্থ্যসেবা’ লেখা থাকুক, সেই মানবিকতার বাস্তব অর্থ কোথায়?
তবে এখানেই রাষ্ট্রকে একেবারে অস্বীকার করাও সত্যের প্রতি সুবিচার হবে না। ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে ৬৯,৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে, যা সংশোধিত আগের বছরের ৩৫,৪৭৭ কোটি টাকার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ এবং জিডিপির প্রায় ১.০১ শতাংশ। সরকার একই সঙ্গে চিকিৎসক ও বিপুলসংখ্যক স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে।
কিন্তু এখানেই আসল প্রশ্নটি শুরু হয়, শেষ নয়। টাকা বাড়লেই কি স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভালো হয়?
স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংকট কেবল অর্থের সংকট নয়। এটি ব্যবস্থাপনার সংকট, জনবল বণ্টনের সংকট, জবাবদিহির সংকট, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সংকট, শুদ্ধাচারের সংকট এবং সবচেয়ে বড় কথা—স্বাস্থ্যকে নাগরিক অধিকার হিসেবে দেখার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কৃতির সংকট।
একজন মানুষ যখন সামান্য জ্বর নিয়ে হাসপাতালে যায় এবং শেষ পর্যন্ত একগাদা পরীক্ষা-নিরীক্ষার তালিকা হাতে নিয়ে বের হয়, তখন শুধু চিকিৎসককে দায়ী করলে সমস্যার মীমাংসা হয় না। একইভাবে সরকারি হাসপাতালে ওষুধ নেই বলে শুধু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে গালাগাল করেও লাভ নেই। আমাদের দেখতে হবে—ক্রয়ব্যবস্থা কোথায় আটকে আছে, সরবরাহব্যবস্থা কোথায় ভেঙেছে, বাজেট কোথায় খরচ হচ্ছে, কোথায় পড়ে থাকছে, এবং রোগীর কাছে পৌঁছানোর আগেই কতটা সম্পদ অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য খাতের আরেকটি মৌলিক সমস্যা হলো আমরা চিকিৎসাকে হাসপাতালনির্ভর করে ফেলেছি। মানুষ অসুস্থ হওয়ার পর তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার চেয়ে মানুষ যাতে অসুস্থই কম হয়, সেই ব্যবস্থা তৈরি করা অনেক বেশি বুদ্ধিমানের কাজ। অথচ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দুর্বল হলে জেলা হাসপাতাল ভরে যায়, জেলা হাসপাতাল ভরে গেলে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ভরে যায়, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ভরে গেলে রোগী মেঝেতে যায়।
তারপর আমরা মেঝেতে শুয়ে থাকা মানুষটির ছবি দেখে বিস্মিত হই।
এই বিস্ময়টিই আসলে আমাদের সামাজিক ভণ্ডামির প্রমাণ।
কারণ হাসপাতালের মেঝেতে যে মানুষটি শুয়ে আছে, সে আমাদেরই মানুষ। সে কৃষক হতে পারে, রিকশাচালক হতে পারে, পোশাকশ্রমিক হতে পারে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হতে পারে, নিম্নবিত্ত কোনো পরিবারের বাবা হতে পারে। তার শরীরের ভেতরের রোগটি হয়তো আলাদা, কিন্তু তার অসহায়ত্বের চরিত্র একই। তার কাছে রাষ্ট্রের সবচেয়ে দৃশ্যমান রূপটি কোনো মন্ত্রণালয় নয়; একটি হাসপাতালের বিছানা।
সেখানে একটি বিছানা পাওয়া মানে রাষ্ট্রকে পাওয়া। একটি বিনা মূল্যের ওষুধ পাওয়া মানে রাষ্ট্রকে পাওয়া। সময়মতো একজন নার্স পাওয়া মানে রাষ্ট্রকে পাওয়া। রক্ত পাওয়া মানে রাষ্ট্রকে পাওয়া। রোগীর সঙ্গে মানবিক আচরণ করা মানে রাষ্ট্রকে পাওয়া। রাষ্ট্রের মহত্ত্ব বড় বড় ভবনে নয়; অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সামর্থ্যে।
তাই সরকারি হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ডকে আমাদের আয়না হিসেবে দেখা উচিত। সেখানে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক বৈষম্যও দেখা যায়। একটি শয্যায় যখন তিনজন রোগী জায়গা খোঁজে, তখন শুধু হাসপাতালের জায়গা কম পড়ে না—রাষ্ট্রের সামাজিক ন্যায়বিচারের জায়গাটিও সংকুচিত হয়ে আসে।
আর যে দেশে চিকিৎসার ব্যয় মানুষের পকেট থেকে প্রায় চার-পঞ্চমাংশ পর্যন্ত আসে, সেখানে দরিদ্র মানুষের অসুখকে নিছক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সমস্যা বলে ভাবা এক ধরনের নিষ্ঠুরতা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার মূল্যায়নে শুধু মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছে কি না তা দেখে না; দেখে চিকিৎসার খরচ মানুষকে আর্থিক সংকটে ঠেলে দিচ্ছে কি না।
আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সবচেয়ে বড় রোগটি সম্ভবত হাসপাতালের কোনো রোগীর শরীরে নেই। রোগটি আছে ব্যবস্থার শরীরে।
তার লক্ষণ অনেক: অতিরিক্ত ভিড়, শয্যার অভাব, জনবল সংকট, ওষুধের ঘাটতি, ব্যয়বহুল পরীক্ষা, দালালনির্ভরতা, দুর্বল প্রাথমিক চিকিৎসা, দীর্ঘ অপেক্ষা এবং অসহায় মানুষের অসহায়ত্বকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া।
এই রোগের চিকিৎসা শুধু আরও হাসপাতাল বানিয়ে হবে না। দরকার শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রয়োজন অনুযায়ী জনবল বণ্টন, নিরবচ্ছিন্ন ওষুধ সরবরাহ, স্বচ্ছ ক্রয়ব্যবস্থা, কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি এবং মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমানোর বাস্তব ব্যবস্থা। সবচেয়ে বেশি দরকার একটি মানসিক পরিবর্তন।
আমাদের বুঝতে হবে—গরিব মানুষকে বিনা মূল্যে চিকিৎসা দেওয়া দয়া নয়। এটি তার নাগরিক অধিকার।
হাসপাতালের ওয়ার্ডে যে গন্ধ পাওয়া যায়, তার মধ্যে শুধু রোগের গন্ধ নেই। সেখানে আছে রাষ্ট্রের অর্থনীতি, সমাজের বৈষম্য, প্রশাসনের ব্যর্থতা এবং মানুষের বেঁচে থাকার আকুতি।
দারিদ্র্যের গন্ধ আলাদা করে পাওয়া যায় না;
যখন দারিদ্র্য, রোগ, ওষুধ, রক্ত, ঘাম, কান্না আর অসহায়ত্ব একই ঘরে জমে—তখন সেই ঘরের নাম হয় সরকারি হাসপাতাল।
আর সেই গন্ধ থেকে আমরা যতই নাক সরিয়ে রাখি,
রাষ্ট্রের বিবেক কিন্তু তার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না।






