‘যা পারে এবার পুলিশ করবে, আমরা মামলা করব না’
ছেলের পর বাবাকেও হত্যা

ছবি: সংগৃহীত
খুলনার রূপসায় ছেলেকে হত্যার দেড় মাসের মাথায় বাবা হত্যার ঘটনায় ভয় আর আতঙ্কের মধ্যে সময় কাটছে একটি পরিবারের। হত্যার ঘটনায় এবার আর মামলা করতে চাচ্ছেন না স্বজনেরা। পুরো বিষয়টি তারা ছেড়ে দিচ্ছেন পুলিশের ওপর।
গতকাল সোমবার ৫ অক্টোবর সন্ধ্যা পৌনে সাতটার দিকে উপজেলার আইচগাতি ইউনিয়নের দুর্জনীমহল গ্রামে আক্তার ঢালীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। দেড় মাস আগে তার ছেলে জয় ঢালীকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। তবে এবার আর মামলা করতে চাইছেন না আক্তার ঢালীর স্বজনেরা। এমনকি বিষয়টি নিয়ে তারা কারও বিরুদ্ধে কথা বলতেও নারাজ।
আক্তার ঢালীর পাঁচজন স্বজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের ধারণা, জয় ঢালী হত্যার সঙ্গে আক্তার ঢালী হত্যার যোগসূত্র রয়েছে। তাদের দাবি, খুলনায় ‘বি কোম্পানি’ নামের পরিচিত একটি গোষ্ঠীর লোকজন আক্তার ঢালী হত্যায় জড়িত থাকতে পারেন। কিন্তু ঝামেলা এড়াতে এবার কোনো মামলা করতে চান না স্বজনেরা।
আক্তার ঢালীর ভাতিজা লিটু ঢালী বলেন, ‘আমরা এবার আর মামলা করতে চাই না। ভাইয়ের (জয় ঢালী) হত্যা মামলায় আসামি ধরা পড়ে আবার কয়েক দিনের মধ্যে জামিনে বেরিয়ে আসে। আমরা আর ঝামেলায় যেতে চাই না। যা পারে এবার পুলিশ করবে, আমরা মামলা করব না।’
এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আগের হত্যাকাণ্ডের যোগসূত্র আছে বলে আমরা মনে করছি। তবে এর সঙ্গে আরও কোনো বিষয় আছে কি–না, সেটাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিক তদন্তে বি কোম্পানির সদস্যরা জড়িত বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে পুরোপুরি নিশ্চিত হতে আরও কিছুটা সময় লাগবে।
সরকার ওমর ফারুক, পুলিশ সুপার, খুলনা
আক্তার ঢালীকে যেখানে গুলি করা হয়, সেখান থেকে প্রায় ১০০ গজের মধ্যে তার ছেলে জয় ঢালীর বাড়ি। গত ১৫ আগস্ট সন্ধ্যায় দুর্জনীমহলের শহীদের মোড়ে জয় ঢালীকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ওই ঘটনায় নিহত জয়ের মা নাসিমা বেগম বাদী হয়ে ১৩ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। মামলায় গ্রেপ্তার আসামিরা জামিনে বের হয়ে এসেছেন।
খুলনার পুলিশ সুপার (এসপি) সরকার ওমর ফারুক জানান, জয় ঢালীর হত্যা মামলার আসামি, জামিনে থাকা ব্যক্তিরা এবং জামিনের পর হুমকির বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে প্রাথমিক তদন্তে কারা এ ঘটনায় জড়িত থাকতে পারে, কতজন ছিল সে বিষয়ে ধারণা পাওয়া গেছে। ওই এলাকায় মাদক ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে চিরুনি অভিযান শুরু করা হয়েছে।
পুলিশ সুপার বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আগের হত্যাকাণ্ডের যোগসূত্র আছে বলে আমরা মনে করছি। তবে এর সঙ্গে আরও কোনো বিষয় আছে কি–না, সেটাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিক তদন্তে বি কোম্পানির সদস্যরা জড়িত বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে পুরোপুরি নিশ্চিত হতে আরও কিছুটা সময় লাগবে। এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি।

আজ মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আক্তার ঢালীর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় তার শোকার্ত স্ত্রী নাসিমা বেগম কাঁদছিলেন আর বলছিলেন, আমি কী করব, কী করার আছে আমার। আল্লাহ আমারে আর কী কী সহ্য করার জন্য রাখছে। আল্লাহ আমারে কী দৃশ্য দেখাল। (হত্যায়) কোনো সময় লাগছে না। এক-দুই মিনিটের মধ্যে সব ক্লিয়ার করে দিচ্ছে। ছেলে গেল, এবার ওর বাবা গেল…।
কিছুক্ষণ পর কয়েকজন প্রতিবেশী ও স্বজন তাঁকে ঘর থেকে উঠানে এনে একটি চেয়ারে বসান। উঠানেও তখন অনেক মানুষ। তবে সবাই নারী। সাংবাদিক পরিচয় শুনে তারা যেন হঠাৎ চুপ হয়ে গেলেন। একে অপরের কানে ফিসফিস করে কথা বলছিলেন।
কিছুক্ষণ পর নাসিমা বেগমের এক পুত্রবধূ বলেন, ‘আসলে দেখেন, আমাদের কিছু বলার নেই। কয়েক দিনের মধ্যে দুটো মার্ডার। বাচ্চারাও রাতে ভয়ে কেঁপে কেঁপে উঠছে। সবার মধ্যে আতঙ্ক। কখন কী হয়, কে জানে।
এর মধ্যে এক বয়স্ক প্রতিবেশী পুরুষ নাসিমাদের উঠানে আসেন। তিনি আক্তার ঢালী হত্যার মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে বলেন, তখন মাগরিবের নামাজ পড়ে কেউ বের হয়েছে, কেউ হয়নি। নামাজ শেষে আমি ডাক্তারের কাছে যাচ্ছিলাম। এমন সময় দেখি, চার-পাঁচটা মোটরসাইকেল, প্রতিটায় দু-তিনজন করে মানুষ। কারও হেলমেট পরা, কারও হেলমেট নেই। একটু পরেই গুলির শব্দ শুনতে পাই। এরপর চিৎকার-চেঁচামেচি। আসলে এখন যা হচ্ছে, এসব মানা যায় না।
আক্তার ঢালীর স্ত্রী নাসিমা বেগম বলেন, আমরা কিচ্ছু জানি না, কারা মেরেছে। আমি কিছু বলব না। মাসখানেক আগে ছেলেটা চলে গেল। এবার ওর বাবাও গেল। তোমরাও যারা আছ, তারা এখন কিছুতে কারও নামে কিছু বলবা না। না জানি কী বিপদ হবে।
অন্যদের সঙ্গে কথা বলার মধ্যে কিছুটা ধাতস্থ হন নাসিমা বেগম। জানান, তার স্বামী আক্তার ঢালী সকালে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন। সেনের বাজার বাসস্ট্যান্ডে কাজ করতেন তিনি। বেলা আড়াইটার দিকে বাড়িতে ফেরেন। প্রতিদিন বিকেলের মতো গতকালও বাড়ির সামনে রাস্তার পাশে রাখা কাঠের বেঞ্চে তাঁর স্বামী বসে ছিলেন। অন্য দিন তার স্বামীর সঙ্গে নিহত ছেলে জয়ের আট মাস বয়সী মেয়ে ও প্রতিবেশীরা থাকলেও গতকাল কেউ ছিল না।
নাসিমা বেগম বলেন, গতকাল বেঞ্চের জায়গাটিতে মশার উৎপাত ছিল। তাকে (নাসিমা বেগম) ডেকে সেখানে মশার কয়েল জ্বালিয়ে দিতে বলেন স্বামী আক্তার ঢালী। এ জন্য তিনি বাড়ির ভেতরে ঢুকেছিলেন। এর মধ্যেই গুলির ঘটনা ঘটে। নাসিমা বলেন, ‘তারা (দুর্বৃত্তরা) গুলি করেই চলে যায়নি, একটু সময় ছিল। এ সময় বাড়ির দিকেও গুলি ছোড়ে।
ছেলে জয় ঢালী হত্যামামলা নিয়ে আক্তার ঢালী চাপে ছিলেন বলে জানান নাসিমা বেগম। তিনি বলেন, ‘উনি (আক্তার ঢালী) মাঝে মাঝে আমাকে বলতেন, জয়ের মামলা নিয়ে এদিক-ওদিক দৌড়াদৌড়ি করছি, চাপ আসছে। কখন কী হয়, ভয়ে থাকি।” আমি বলতাম, ছেলে তো আর ফিরে আসবে না, আমরা না হয় সব বাদ দিই।
স্বজনেরা জানান, নাসিমা বেগমের প্রথম স্বামী সোবহান ঢালীকেও ৩০-৩২ বছর আগে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। এরপর সোবহান ঢালীর চাচাতো ভাই আক্তার ঢালীর সঙ্গে নাসিমার বিয়ে হয়।
কথাগুলো বলতে বলতে আবার যেন ভয় চেপে বসে নাসিমার কণ্ঠে। তিনি বলেন, আমরা কিচ্ছু জানি না, কারা মেরেছে। আমি কিছু বলব না। মাসখানেক আগে ছেলেটা চলে গেল। এবার ওর বাবাও গেল। তোমরাও যারা আছ, তারা এখন কিছুতে কারও নামে কিছু বলবা না। না জানি কী বিপদ হবে।
শ্বশুর হত্যার বিষয়ে জয়ের স্ত্রী বলেন, ‘আমরা বাড়ির ভেতরে ছিলাম। শব্দ শুনে বাইরে গিয়ে দেখি, বাবা বেঞ্চের পাশে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উপুড় হয়ে পড়ে আছেন।’
হুমকি পেয়ে জিডি করেছিলেন আক্তার ঢালী।
ছেলে হত্যার মামলা নিয়ে চাপে ছিলেন আক্তার ঢালী। মামলা তুলে নিতে বলা হয়, পান প্রাণনাশের হুমকি। এসব ঘটনার পর ২১ সেপ্টেম্বর রূপসা থানায় সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করেছিলেন আক্তার।
জিডি থেকে জানা যায়, ১৮ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক পৌনে নয়টার দিকে সেনের বাজার এলাকায় কয়েকজন আক্তার ঢালীকে ডেকে সড়কের এক পাশে নিয়ে যান। এরপর তাঁর ছেলে হত্যা মামলা তুলে নেওয়ার জন্য তাঁকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি–ধমকি দেওয়া হয়। এমনকি তাঁকে জীবননাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছিল।
জিডিতে আক্তার ঢালী অভিযোগ করেন, তাঁর ছেলে জয় ঢালী হত্যা মামলার আসামিরা হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে এলাকায় এসে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য তাকে ও তার পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন।






