নদী উপত্যকার ১ হাজার ফুট উপরে রহস্যময় ‘সুমেলা মঠ’, জেনে নিন তার ইতিহাস

পূর্ব তুরস্কের একটি নদী উপত্যকার ১,০০০ ফুট উপরে খাড়া পাহাড়ের গায়ে ‘সুমেলা মঠ’
প্রাচীন দেয়ালগুলো কথা বলতে পারলে তুরস্কের পূর্বাঞ্চলের সুমেলা মঠের ইতিহাসে উঠে আসত নানা বিস্ময়কর ঘটনা। প্রায় ১ হাজার ৬০০ বছরের পুরোনো এই ধর্মীয় স্থাপনাটি রোমান সাম্রাজ্যের পতন ও বাইজেন্টাইন যুগের বিকাশ, অটোমান সাম্রাজ্যের উত্থান, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তুরস্কের স্বাধীনতাসংগ্রাম এবং দীর্ঘদিনের অবহেলা ও ধ্বংসযজ্ঞের সাক্ষী।
খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতকে কৃষ্ণসাগর উপকূলে আসা প্রাথমিক খ্রিষ্টানদের হাত ধরে মঠটির যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে নানা রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এটি টিকে থেকেছে। একপর্যায়ে পরিত্যক্ত হয়ে পড়লেও আধুনিক সময়ে ব্যাপক সংস্কারের মাধ্যমে নতুন জীবন ফিরে পেয়েছে স্থাপনাটি।
সুমেলা মঠের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক এর অবস্থান। তুরস্কের পন্টিক আল্পস পর্বতমালার একটি খাড়া পাথুরে পাহাড়ের গায়ে নির্মিত এই মঠটি আশপাশের বনভূমি ও নদী উপত্যকা থেকে প্রায় ৩০০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, এটি যেন বাস্তব কোনো স্থাপনা নয়, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা কম্পিউটার গ্রাফিক্সের সাহায্যে তৈরি কোনো দৃশ্য।
মঠটির বিস্তৃত চত্বরে রয়েছে প্রার্থনাকক্ষ, উঠান, গ্রন্থাগার, আবাসিক কক্ষ, ঘণ্টাঘর, পানির নালা এবং পাথর দিয়ে ঘেরা একটি পবিত্র ঝর্ণা। পাহাড়ের খাড়া ঢালে এমন জটিল স্থাপত্য নির্মাণের কৌশল আজও দর্শনার্থীদের বিস্মিত করে।
প্রতিদিন হাজারো পর্যটক ও ধর্মীয় তীর্থযাত্রী পাথর বিছানো পথ ধরে মঠটি দেখতে আসেন। প্রাচীন খ্রিষ্টীয় দেয়ালচিত্র ও স্থাপত্যের পাশাপাশি ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের সম্ভাব্য তালিকায় থাকা মঠটি পর্যটকদের কাছে বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করেছে।

বর্তমানে এটি কোনো সক্রিয় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নয়, বরং রাষ্ট্রীয় জাদুঘর হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অগ্নিকাণ্ড, গুপ্তধন অনুসন্ধানকারী, ভাঙচুর ও দর্শনার্থীদের অসতর্ক আচরণে সৃষ্ট ক্ষতি মোকাবিলায় কয়েক বছর ধরে এখানে সংস্কারকাজ চলছে।
ট্রাবজোন প্রদেশের জাদুঘর ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর ব্যবস্থাপক লেভেন্ট আলনিয়াক বলেন, মঠটির জন্য বড় সমস্যা ছিল পাহাড় থেকে পাথর খসে পড়া। স্থাপনার ক্ষতি ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিল্প পর্যায়ের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পর্বতারোহীদের দিয়ে পাহাড়ের খাড়া অংশে বিশেষ সুরক্ষাব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে। তারা ঝুলন্ত অবস্থায় স্টিলের তার ও বড় ধাতব খুঁটির সাহায্যে পাহাড়ের গায়ে জাল ও প্রতিবন্ধক স্থাপন করেছেন।
সংস্কারকাজের সময় অপ্রত্যাশিত কিছু আবিষ্কারও হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে একটি গোপন সুড়ঙ্গ, যা আগে অজানা একটি প্রার্থনাকক্ষে গিয়ে পৌঁছেছে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা, মঠের প্রতিরক্ষায় পর্যবেক্ষণকেন্দ্র হিসেবে কক্ষটি ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে। সেখানে স্বর্গ-নরক এবং জীবন-মৃত্যুর দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা আকর্ষণীয় দেয়ালচিত্র পাওয়া গেছে।
দেয়ালচিত্র ফিরে পাচ্ছে পুরোনো রূপ
মঠের দেয়ালচিত্র পুনরুদ্ধারে কয়েক বছর ধরে সূক্ষ্ম ও শ্রমসাধ্য কাজ করছেন শিল্পকর্ম সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞরা। শুষ্ক মৌসুমে গ্রীষ্মকালে এই কাজ করা হয়। এ সময় দর্শনার্থীরা কাছ থেকে দেখতে পারেন, কীভাবে বিশেষজ্ঞরা দেয়ালে লেখা নাম, আঁকিবুঁকি ও অন্যান্য ক্ষতচিহ্ন সরিয়ে নিচ্ছেন।
১৯২০ থেকে ১৯৬০-এর দশক পর্যন্ত মঠটি জনমানবহীন ও অরক্ষিত থাকায় ব্যাপক ভাঙচুরের শিকার হয়।

সংরক্ষণকর্মী সেনোল আকতাশ জানান, দীর্ঘদিন যথাযথ তদারকি না থাকায় দেয়ালচিত্রের ওপর বিভিন্ন লেখা ও আঁকিবুঁকি করা হয়েছিল। মূল শিল্পীদের ব্যবহৃত রং ও আঁকার ধরন অনুসরণ করে সেগুলো ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা করছেন তাঁরা।
মঠের বাইরের দেয়ালচিত্রের চেয়েও ভেতরের চিত্রকর্মগুলো বেশি আকর্ষণীয়। বিশাল একটি গুহার ভেতরে অবস্থিত গির্জাটির দেয়াল ও ছাদজুড়ে রয়েছে ত্রয়োদশ শতকের রঙিন চিত্রকর্ম। ছাদে যিশু খ্রিষ্ট ও ভার্জিন মেরির বড় প্রতিকৃতি এবং দেয়ালে দেবদূত, প্রেরিত ও বিভিন্ন সাধুর ছবি আঁকা রয়েছে। এর মধ্যে রোমান অঙ্গনে সিংহের আক্রমণে সাধু ইগনেশিয়াসের মৃত্যুর দৃশ্যও রয়েছে।
তবে মানুষের হাতের নাগালে থাকা নিচের দিকের অনেক দেয়ালচিত্রের চোখ খুঁড়ে নষ্ট করা হয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, মুসলিমরা ইচ্ছাকৃতভাবে এসব চিত্র বিকৃত করেছিলেন।
১৯৮০-এর দশক থেকে সুমেলা মঠে পর্যটকদের পথনির্দেশনা দিয়ে আসা ওজনুর দক্সোজের মতে, এর পেছনে অন্য একটি কারণও থাকতে পারে। তার ভাষ্য, স্থানীয় মুসলমানদের কাছেও ভার্জিন মেরি পবিত্র ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত। এ কারণে আশপাশের কিছু মানুষ তার ছবির মুখ ও বিশেষ করে চোখের অংশ থেকে রঙের টুকরা সংগ্রহ করতেন। সেগুলো পানিতে ফুটিয়ে সেই পানি পান করলে আশীর্বাদ পাওয়া যাবে, এমন বিশ্বাস তাদের ছিল।
তবে এই কাহিনির সত্যতা নিশ্চিত নয় বলে জানান তিনি। স্থানীয়দের মুখে প্রচলিত একটি গল্প হিসেবেই এটি এখনো পরিচিত।


