দেশে অল্প বয়সে আকস্মিক মৃত্যুর প্রধান পাঁচ কারণ

অফিসে কাজ করতে করতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়া, রাস্তায় চলার সময় কিংবা বাসায় স্বাভাবিক অবস্থায় আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনা দেশে প্রায়ই শোনা যায়। অনেক ক্ষেত্রেই আগে থেকে বড় কোনো অসুস্থতার ইতিহাস না থাকলেও হৃদ্রোগ, স্ট্রোকসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগে তুলনামূলক কম বয়সে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে।
আজ (২৮ সেপ্টেম্বর) সোমবার প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বিবিসি বাংলা জানিয়েছে, বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবনযাত্রায় পরিবর্তন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, তামাকের ব্যবহার, বায়ুদূষণ, স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন ঝুঁকি অল্প বয়সে এসব রোগের প্রবণতা বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি রোগের লক্ষণ সম্পর্কে অসচেতনতা এবং সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় মৃত্যুঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজে কর্তব্যরত অবস্থায় স্ট্রোকে আক্রান্ত হন ৪২ বছর বয়সী মুকসেমুল হাকিম। দুপুরে শরীর খারাপ লাগলেও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখেননি তিনি। পরে রাতে বাসায় অসুস্থ বোধ করলে পরিবারের সদস্যরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। চিকিৎসকরা স্বজনদের জানান, দুপুরেই তিনি একবার স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছিলেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগের মধ্যে হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ ও ক্যান্সার অন্যতম মৃত্যুর বড় কারণ। এসব রোগকে সাধারণত বয়স্কদের সমস্যা মনে করা হলেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ ৭০ বছর বয়সের আগেই এসব রোগে মারা যান।
বাংলাদেশে অল্প বয়সে আকস্মিক বা অকাল মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত প্রধান পাঁচটি কারণ হলো,
হৃদ্রোগ ও হার্ট অ্যাটাক
হৃদ্রোগ, বিশেষ করে করোনারি আর্টারি ডিজিজ, দেশে ক্রমেই বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ ও হার্ট ফেইলিউরের প্রবণতাও বাড়ছে। হৃদ্যন্ত্রে রক্ত সরবরাহকারী রক্তনালি বন্ধ হয়ে গেলে হার্টের পেশিতে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছাতে পারে না। এ অবস্থায় হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। আগে থেকে বড় কোনো অসুস্থতা না থাকলেও একজন আপাতদৃষ্টিতে সুস্থ মানুষের হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। বুকে চাপ বা ব্যথা, বিশেষ করে বুকের মাঝখানে ব্যথা, যা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে এবং বাম হাত, ঘাড়, চোয়াল বা পিঠে ছড়িয়ে পড়তে পারে যা হার্ট অ্যাটাকের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। এর সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ঘাম, বমি বমি ভাব বা বমিও হতে পারে। এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
স্ট্রোক
অকাল মৃত্যুর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ স্ট্রোক। মস্তিষ্কের কোনো অংশে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে কিংবা মস্তিষ্কের রক্তনালি ছিঁড়ে গেলে স্ট্রোক হতে পারে। ফলে মস্তিষ্কের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাধারণত বয়স্কদের মধ্যে স্ট্রোকের ঝুঁকি বেশি হলেও বর্তমানে তরুণদের মধ্যেও এ রোগ দেখা যাচ্ছে। হঠাৎ শরীরের এক পাশ অবশ হয়ে যাওয়া, হাত ওপরে তুলতে না পারা, কথা জড়িয়ে যাওয়া বা কথা বলতে সমস্যা, মুখ বেঁকে যাওয়া, চোখে ঝাপসা দেখা, ভারসাম্য হারানো, খিঁচুনি কিংবা অস্বাভাবিক মাথাব্যথা স্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে। স্ট্রোকের ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া গেলে মস্তিষ্কের ক্ষতি ও মৃত্যুঝুঁকি কমানোর সুযোগ থাকে।

ডায়াবেটিস
দেশে কম বয়সীদের মধ্যেও ডায়াবেটিসের প্রবণতা বাড়ছে। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্ক ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা এক কোটির বেশি। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ জানেনই না যে তারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। অতিরিক্ত ওজন, স্থূলতা ও উচ্চ রক্তচাপ টাইপ-২ ডায়াবেটিসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস হৃদ্রোগ, কিডনি জটিলতা, স্ট্রোকসহ বিভিন্ন গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ২০২২ সালের এক গবেষণায় তরুণদের মধ্যেও ডায়াবেটিসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ফলে বয়স কম বলে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি নেই এমন ধারণা সঠিক নয়।
দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ
অ্যাজমা ও ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ বা সিওপিডির মতো দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগও মৃত্যুর অন্যতম কারণ। ধূমপান, বায়ুদূষণ এবং রান্নার কাজে কাঠ, গোবর বা অন্যান্য জ্বালানি ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট ধোঁয়া এসব রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের শ্বাসকষ্টকে অনেকে সাধারণ সমস্যা হিসেবে দেখেন এবং চিকিৎসা নিতে দেরি করেন। দীর্ঘস্থায়ী কাশি, শ্বাসকষ্ট, বুকে চাপ অনুভব করা এবং সামান্য পরিশ্রমেই হাঁপিয়ে ওঠার মতো লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
ক্যান্সার
বাংলাদেশে ক্যান্সারও মৃত্যুর একটি বড় কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হন এবং মারা যান। পুরুষদের মধ্যে ফুসফুস ও মুখগহ্বরের ক্যান্সার এবং নারীদের মধ্যে স্তন ও জরায়ুমুখের ক্যান্সার উল্লেখযোগ্য। এছাড়া পাকস্থলী ও কণ্ঠনালির ক্যান্সারেও অনেক মানুষ আক্রান্ত হন। তামাক ব্যবহার, অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, বায়ুদূষণসহ বিভিন্ন কারণ ক্যান্সারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। অনেক ক্ষেত্রে রোগের প্রাথমিক লক্ষণ উপেক্ষা করায় চিকিৎসা শুরু হতে দেরি হয়।

কেন বাড়ছে অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবনযাপনের ধরন পরিবর্তন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, তামাকের ব্যবহার, শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া, স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ ও বায়ুদূষণ অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, অকাল মৃত্যু কমাতে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, রোগ দ্রুত শনাক্ত করা এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। তার মতে, শৈশব থেকেই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে অভ্যস্ত করার পাশাপাশি নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন। রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা পরীক্ষা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য পরীক্ষা রোগ দ্রুত শনাক্ত করতে সহায়তা করতে পারে।
এছাড়া হৃদ্রোগ বা স্ট্রোকের মতো জরুরি অবস্থায় দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া এবং কার্যকর জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়স কম বলে হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস বা অন্যান্য অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি নেই এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া এবং ঝুঁকির বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণে রাখা অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।






