বিনোদন

২৩১ বছর আগে সংবাদপত্রে বাংলা নাটকের প্রথম বিজ্ঞাপন, নেপথ্যে এক রুশ শিল্পীর স্বপ্ন

বক্স ও পিটের আসনের টিকিটের দাম ছিল আট সিক্কা টাকা এবং গ্যালারির টিকিট চার সিক্কা টাকা

২৩১ বছর আগে সংবাদপত্রে বাংলা নাটকের প্রথম বিজ্ঞাপন, নেপথ্যে এক রুশ শিল্পীর স্বপ্ন

আজ থেকে ২৩১ বছর আগে, ১৭৯৫ সালের ৫ নভেম্বর। কলকাতা থেকে প্রকাশিত ইংরেজি সংবাদপত্র ক্যালকাটা গেজেট-এর পাতায় ছাপা হলো বাংলা নাট্যাভিনয়ের প্রথম বিজ্ঞাপন হিসেবে পরিচিত এক ঐতিহাসিক ঘোষণা। বিজ্ঞাপনটি ছিল ‘বেঙ্গলী থিয়েটার’-এ একটি নাটক মঞ্চস্থ করার আয়োজন নিয়ে। এর উদ্যোক্তা ছিলেন এক রুশ সংগীতজ্ঞ, গেরাসিম স্তেপানোভিচ লেবেদেফ।

সেদিন হয়তো কেউ ভাবেননি, সংবাদপত্রের পাতায় প্রকাশিত একটি নাটকের বিজ্ঞাপন বাংলা রঙ্গমঞ্চের ইতিহাসে এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিজ্ঞাপন প্রকাশের মাত্র ২২ দিন পর, ২৭ নভেম্বর কলকাতার ডোমতলায় মঞ্চস্থ হয় বাংলা ভাষায় অনূদিত নাটক ‘কাল্পনিক সংবদল’।

আধুনিক ইউরোপীয় মঞ্চরীতিতে বাংলা নাট্যাভিনয়ের সূচনাপর্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে স্বীকৃত সেই অভিনয়।

বাংলা নাটকের নেপথ্যে এক রুশ সংগীতজ্ঞ

বাংলা নাট্যচর্চার ইতিহাসে লেবেদেফ এক ব্যতিক্রমী চরিত্র। জন্মসূত্রে রুশ হলেও ভারতীয় ভাষা, সংগীত ও সংস্কৃতির প্রতি ছিল তার গভীর আগ্রহ।

সংগীতশিল্পী হিসেবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়ানোর পর ১৭৮৫ সালে তিনি ভারতে আসেন। প্রথমে মাদ্রাজে অবস্থান করেন। পরে ১৭৮৭ সালে চলে আসেন কলকাতায়। এখানে সংগীতচর্চার পাশাপাশি ভারতীয় ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার আগ্রহ তৈরি হয় তার।

১৭৯১ সালের দিকে গোলকনাথ দাস নামে এক বাঙালি শিক্ষকের সঙ্গে পরিচয় হয় লেবেদেফের। তার কাছেই বাংলা, হিন্দি ও সংস্কৃত শেখেন। গোলকনাথের সহযোগিতায় ইংরেজি নাটক বাংলায় অনুবাদের উদ্যোগ নেন তিনি।

সেই সময় কলকাতায় ইউরোপীয়দের জন্য নাট্যশালা থাকলেও বাংলা ভাষায় আধুনিক মঞ্চনাটক পরিবেশনের সুযোগ ছিল না বললেই চলে। লেবেদেফ এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে চাইলেন।

ডোমতলায় গড়ে উঠল ‘বেঙ্গলী থিয়েটার’

লেবেদেফ কলকাতার ডোমতলা এলাকায়, বর্তমান এজরা স্ট্রিটে, প্রতিষ্ঠা করেন ‘বেঙ্গলী থিয়েটার’। বাংলা নাটকের জন্য আধুনিক মঞ্চ, অভিনেতা-অভিনেত্রী এবং সংগীতের সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ নাট্যপ্রযোজনা তৈরির উদ্যোগ নেন তিনি।

তার এই কাজে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী ছিলেন গোলকনাথ দাস। স্থানীয় অভিনেতা-অভিনেত্রী সংগ্রহ এবং তাদের নাট্যাভিনয়ে প্রস্তুত করার কাজে গোলকনাথের ভূমিকা ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

লেবেদেফ ইংরেজ নাট্যকার রিচার্ড পল জড্রেলের দ্য ডিসগাইজ নাটকটি বাংলায় রূপান্তর করেন। বাংলা নাম দেওয়া হয় ‘কাল্পনিক সংবদল’।

নাটকটি মঞ্চস্থ করার প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পর প্রয়োজন ছিল দর্শকদের কাছে খবর পৌঁছে দেওয়ার। আর সেই প্রয়োজন থেকেই সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন প্রকাশের উদ্যোগ।

৫ নভেম্বরের সেই ঐতিহাসিক বিজ্ঞাপন

১৭৯৫ সালের ৫ নভেম্বর ক্যালকাটা গেজেট-এ প্রকাশিত হয় বেঙ্গলী থিয়েটারের নাট্যাভিনয়ের বিজ্ঞাপন।

বাংলা নাটকের ইতিহাস নিয়ে গবেষণায় এই বিজ্ঞাপনের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কারণ এতে শুধু একটি নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার ঘোষণা ছিল না; বাংলা ভাষায় অভিনয়, স্থানীয় শিল্পীদের অংশগ্রহণ এবং ভারতীয় সংগীতের ব্যবহারের কথাও তুলে ধরা হয়েছিল।

বিজ্ঞাপনের বিবরণ থেকে জানা যায়, নাট্যশালাটি সাজানো হয়েছিল বাঙালি রীতি অনুসারে। অভিনয়ে অংশ নেওয়ার কথা ছিল নারী ও পুরুষ উভয়ের। নাটকের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল কণ্ঠসংগীত, যন্ত্রসংগীত ও ভারতীয় সুরের ব্যবহার।

সেই সময়ের জনপ্রিয় কবি ভারতচন্দ্র রায়ের রচনাও সংগীতের অংশ হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল। ভারতীয় সারেঙ্গীর পাশাপাশি ইউরোপীয় সংগীতের উপাদানও রাখা হয়েছিল নাটকে।

অর্থাৎ লেবেদেফের উদ্যোগ কেবল ইংরেজি নাটক বাংলায় অনুবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ইউরোপীয় মঞ্চরীতির সঙ্গে স্থানীয় ভাষা, শিল্পী ও সংগীতকে মিলিয়ে নতুন ধরনের নাট্য পরিবেশনা তৈরি করতে চেয়েছিলেন।

২৭ নভেম্বর বাংলা নাটকের ঐতিহাসিক মঞ্চায়ন

বিজ্ঞাপন প্রকাশের ২২ দিন পর, ২৭ নভেম্বর ১৭৯৫ সালে মঞ্চস্থ হয় ‘কাল্পনিক সংবদল’।

নাটকটির অভিনয় শুরু হয়েছিল রাত আটটায়। সমসাময়িক বিজ্ঞাপনের তথ্য অনুযায়ী, বক্স ও পিটের আসনের টিকিটের দাম ছিল আট সিক্কা টাকা এবং গ্যালারির টিকিট চার সিক্কা টাকা।

আঠারো শতকের শেষভাগের কলকাতায় এই মূল্য সাধারণ মানুষের জন্য যথেষ্ট বেশি ছিল। ফলে নাটকটি বাংলা ভাষায় অভিনীত হলেও এর দর্শক মূলত সচ্ছল ও ইউরোপীয় সমাজের সদস্যদের মধ্যেই সীমিত ছিল।

তবু এই অভিনয়ের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ছিল অন্য জায়গায়। কলকাতার মঞ্চে বাংলা ভাষায় সংলাপ বলেছিলেন স্থানীয় অভিনেতা ও অভিনেত্রীরা। নাট্যাভিনয়ে ভারতীয় ও ইউরোপীয় শিল্পরীতির সমন্বয় ঘটেছিল।

এই উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলা নাটক আধুনিক মঞ্চব্যবস্থায় প্রবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা পায়।

সাফল্যের পরও টেকেনি নাট্যশালা

প্রথম অভিনয়ের সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে লেবেদেফ পরবর্তী প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। ১৭৯৬ সালের মার্চে আবার নাটক মঞ্চস্থ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

কিন্তু বেঙ্গলী থিয়েটারের যাত্রা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। নাট্যশালায় অগ্নিকাণ্ড, আর্থিক সংকট এবং নানা প্রতিকূলতার কারণে তাঁর উদ্যোগ থেমে যায়।

লেবেদেফ পরে ভারত ছেড়ে ইউরোপে ফিরে যান। ১৮০১ সালে লন্ডনে প্রকাশ করেন ভারতীয় ভাষা নিয়ে তার গবেষণাগ্রন্থ এ গ্রামার অব দ্য পিওর অ্যান্ড মিক্সড ইস্ট ইন্ডিয়ান ডায়ালেক্টস।

১৮১৭ সালে তার মৃত্যু হয়। তবে কলকাতায় তাঁর স্বল্পস্থায়ী নাট্যপ্রয়াস বাংলা রঙ্গমঞ্চের ইতিহাসে স্থায়ী জায়গা করে নেয়।

বাংলা নাটকের ইতিহাসে বিজ্ঞাপন

বাংলা ভাষায় নাট্যচর্চার ঐতিহ্য লেবেদেফের আগে থেকেই ছিল। বাংলার যাত্রা, পালাগান, কীর্তন ও লোকনাট্যের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। তাই ১৭৯৫ সালের ঘটনাকে বাংলা নাট্যকলার একেবারে জন্মমুহূর্ত বলা যথাযথ নয়।

তবে আধুনিক প্রেক্ষাগৃহে ইউরোপীয় মঞ্চরীতি অনুসরণ করে বাংলা ভাষায় নাটক অভিনয়ের ক্ষেত্রে লেবেদেফের উদ্যোগ ছিল অগ্রণী।

আর ৫ নভেম্বরের বিজ্ঞাপনটি ছিল সেই উদ্যোগের একটি লিখিত ঐতিহাসিক দলিল।

এটি দেখিয়ে দেয়, বাংলা নাটক তখন কেবল ব্যক্তিগত উদ্যোগ বা সাংস্কৃতিক পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; সংবাদপত্রের মাধ্যমে দর্শক আহ্বান, টিকিট বিক্রি এবং প্রকাশ্য মঞ্চায়নের পরিকল্পনাও শুরু হয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে কলকাতায় শৌখিন নাট্যশালা, জমিদারবাড়ির রঙ্গমঞ্চ এবং উনিশ শতকের পেশাদার থিয়েটারের বিকাশ ঘটে। ১৮৭২ সালে কলকাতায় ন্যাশনাল থিয়েটার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলা নাটক আরও বিস্তৃত দর্শকসমাজের কাছে পৌঁছানোর নতুন সুযোগ পায়।

অন্যদিকে পূর্ববাংলা, বিশেষ করে ঢাকাতেও উনিশ শতকে নাট্যচর্চার বিকাশ ঘটে। এভাবেই বাংলা রঙ্গমঞ্চ ক্রমে দুই বাংলার সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে ওঠে।

একটি বিজ্ঞাপন, দীর্ঘ এক সাংস্কৃতিক যাত্রা

আজ বাংলা নাটক মঞ্চ, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র এবং ডিজিটাল মাধ্যমের বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে পড়েছে। নাট্যচর্চার ধরন বদলেছে, বদলেছে দর্শক ও প্রচারের মাধ্যমও।

কিন্তু ২৩১ বছর আগের সেই বিজ্ঞাপন মনে করিয়ে দেয় এক ভিন্ন সময়ের কথা—যখন বাংলা ভাষায় আধুনিক মঞ্চনাটক আয়োজনই ছিল এক সাহসী সাংস্কৃতিক পরীক্ষা।

এক রুশ শিল্পীর উদ্যোগ, এক বাঙালি শিক্ষকের সহযোগিতা এবং স্থানীয় শিল্পীদের অংশগ্রহণে যে প্রয়াস শুরু হয়েছিল, তার প্রচারের সাক্ষী হয়ে আছে ১৭৯৫ সালের ৫ নভেম্বরের ক্যালকাটা গেজেট।

বাংলা নাটকের ইতিহাসে তাই দিনটি শুধু একটি বিজ্ঞাপন প্রকাশের স্মৃতি নয়; আধুনিক বাংলা রঙ্গমঞ্চের সূচনাপর্বের এক মূল্যবান দলিল।

বিষয়:থিয়েটার নাট্যশালা বাংলা নাটক বিজ্ঞাপন মঞ্চ

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…