ফেলে আসা শৈশব—ফিরে আসে না!

ছবি: সংগৃহীত
শৈশবে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে না—এমন মানুষ বোধহয় খুঁজে পাওয়া কঠিন। বয়স যত বাড়ে, ততই কেন জানি ছোটবেলার দিনগুলো বেশি মনে পড়ে। যে সময়টাতে পকেটে টাকা ছিল না, ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো চিন্তা ছিল না, ছিল না সংসারের হিসাব-নিকাশ কিংবা জীবনের এতসব জটিলতা। অথচ আনন্দের কোনো কমতি ছিল না। সামান্যতেই মন ভরে যেত, ছোট্ট প্রাপ্তিতেই মনে হতো পৃথিবীর সব সুখ বুঝি হাতের মুঠোয়!
আহা, কী সুন্দর ছিল সেই দিনগুলো!
ভাদ্র-আশ্বিনের পাকা তাল, তালের পিঠা, আমন ধানের নতুন চালের পায়েস। গ্রামের কাঁচা বাড়ির মাটির দেয়ালে লেপনের গন্ধ, ঘোমটা টানা গৃহবধূর মায়াবী মুখ, উঠোনজুড়ে দুপুরের রোদ, বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে দৌড়ঝাঁপ আর সন্ধ্যা হলেই মায়ের ডাক—‘কিরে, বাড়ি ফিরবি না?’ সেই ডাকের মধ্যেও ছিল কী এক অদ্ভুত মায়া! তখন বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করত না, আর আজ বাড়ি ফেরার জন্য মনটা কেমন করে!
মনে পড়ে, সামান্য বৃষ্টিতেই কত আনন্দ! কাদামাটিতে ফুটবল খেলা, পুকুরে ঝাঁপাঝাঁপি, গাছ থেকে ফল পেড়ে খাওয়া, আর ধরা পড়লে বাড়ি ফিরে মায়ের বকুনি। তখন বকুনি খেয়ে অভিমান হতো, আজ সেই বকুনিটুকু শোনার জন্যও মন কেমন করে। জীবন বোধহয় এমনই—যখন যা কাছে থাকে, তার মূল্য বুঝি না; দূরে চলে গেলে সেটাই হয়ে ওঠে অমূল্য সম্পদ।
শৈশবের সৌন্দর্য আসলে চোখে দেখার চেয়ে হৃদয় দিয়ে অনুভব করার বিষয়। মাটির ঘ্রাণ, পাখির ডাক, বর্ষার বৃষ্টি, শীতের সকালের কুয়াশা কিংবা বিকেলের পড়ন্ত রোদ—সবকিছুর মধ্যেই ছিল এক ধরনের আনন্দ। তখন বিনোদনের জন্য হাতে মোবাইল ছিল না, ইন্টারনেট ছিল না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও ছিল না। তবুও বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, মাঠের খেলা আর পাড়ার মানুষের সঙ্গে গল্প করেই দিব্যি কেটে যেত দিন। এখন এত কিছু হাতের কাছে, অথচ কোথায় যেন সেই আনন্দটুকু হারিয়ে গেছে!
সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে বাবা-মায়ের কথা। ছোটবেলায় তাদের ভালোবাসা ছিল জীবনের সবচেয়ে স্বাভাবিক বিষয়। মা খাইয়ে দিতেন, বাবা আগলে রাখতেন। কখনো শাসন, কখনো আদর, কখনো ছোট্ট কোনো আবদার পূরণ করতে তাদের কত চেষ্টা! তখন মনে হতো, এ তো এমনিই পাওয়া যায়। বড় হতে হতে বুঝলাম, পৃথিবীতে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা বলতে যা বোঝায়, তার সবচেয়ে সুন্দর নাম বাবা-মা।
বিশেষ দিনগুলোতে তাদের আনন্দেরও ছিল আলাদা রং। নতুন জামা, ছোট্ট উপহার, মাথায় হাত রেখে দোয়া কিংবা একটু বেশি আদর—এসবের মধ্যেই ছিল কত সুখ! আজ অনেক কিছু কেনার সামর্থ্য হয়েছে, কিন্তু সেই মানুষগুলোকে কাছে বসিয়ে নিজের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ আর নেই। সময়ের কাছে মানুষ কত অসহায়!
জীবনের পথ চলতে চলতে কত মানুষ আসে, কত মানুষ হারিয়ে যায়। বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজন, শৈশবের বন্ধু—কত প্রিয় মুখ আজ স্মৃতির পাতায়। কেউ দূরে, কেউ চিরতরে হারিয়ে গেছে। অথচ চোখ বন্ধ করলেই মনে হয়, এই তো সেদিনের কথা! যেন উঠোনে সবাই বসে আছে, মা রান্নাঘরে ব্যস্ত, বাবা কোনো কাজে বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, আর আমরা ছোটখাটো বিষয় নিয়ে ঝগড়া করছি।
কী আশ্চর্য! তখন যে বাড়িটাকে খুব সাধারণ মনে হতো, আজ সেই বাড়ির প্রতিটি কোণই যেন একেকটি অমূল্য স্মৃতির ভান্ডার।
জীবন মানুষকে অনেক দূরে নিয়ে যায়। কখনো জীবিকার টানে, কখনো স্বপ্নের পেছনে ছুটতে ছুটতে দেশান্তরি হতে হয়। আমিও আজ বহু দূরে, পাহাড়ঘেরা এই প্রবাসের জীবনে। চারপাশে কত আলো, কত ব্যস্ততা, কত আয়োজন! তবুও কখনো কখনো মনটা হঠাৎ উড়ে যায় সেই চেনা উঠোনে। মনে হয়, যদি একবার ফিরে পাওয়া যেত সেই দুপুর, সেই বিকেল, সেই সন্ধ্যার ডাক!
এখন বুঝি, শৈশব আসলে শুধু একটি বয়স নয়, এটি একটি অনুভূতি। সেখানে ফিরে যাওয়ার কোনো পথ নেই, আছে শুধু স্মৃতির দরজা। সেই দরজা খুললেই কত চেনা মুখ, কত পরিচিত গন্ধ, কত হারিয়ে যাওয়া গল্প একসঙ্গে ভিড় করে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চাওয়া-পাওয়ার তালিকাও বড় হয়। অথচ সুখের সংজ্ঞাটা বোধহয় ছোটবেলাতেই সবচেয়ে সহজ ছিল। তখন একটি নতুন জামা পেলে ঈদের আনন্দ, একটু পায়েস পেলে উৎসব, আর বাবা-মায়ের পাশে বসতে পারলেই মনে হতো পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গায় আছি। এখন অনেক কিছু আছে, শুধু সেই নিশ্চিন্ত থাকার দিনগুলো নেই।
আজ আর কোনো প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব মেলাতে ইচ্ছে করে না। শুধু পেছন ফিরে দেখতে ইচ্ছে করে। মনে মনে ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে বাবা-মায়ের সেই স্নেহমাখা হাত, শৈশবের কাটানো দুরন্ত দিনগুলো, বন্ধুদের সঙ্গে নির্ভেজাল আড্ডা আর হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর মুখ।
মাঝেমধ্যে নিজেকেই প্রশ্ন করি, যাদের এত ভালোবাসি, যাদের স্মৃতি এত আপন, তাদের কি সত্যিই কখনো ছেড়ে থাকা যায়? হয়তো যায় না। মানুষ দূরে চলে যায়, সময় বদলে যায়, ঠিকানা বদলে যায়; কিন্তু মনের ভেতরে কিছু মানুষ, কিছু মুহূর্ত আর কিছু ভালোবাসা আজীবন একই জায়গায় থেকে যায়।
জানি, পেছনে ফিরে তাকানো যায়, কিন্তু ফিরে যাওয়া যায় না। বাবা-মায়ের সেই আদর, শৈশবের সেই দুরন্তপনা কিংবা হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোকে আর আগের মতো করে পাওয়া সম্ভব নয়। তবুও তারা বেঁচে থাকেন আমাদের স্মৃতিতে, আমাদের প্রতিটি নিঃশ্বাসে, আমাদের ভালোবাসায়।
জীবনের এই পর্যায়ে এসে মনে হয়, আমরা আসলে সারা জীবন ছুটে চলি সুখের সন্ধানে। অথচ জীবনের সবচেয়ে সুখের দিনগুলো কখন যে পেছনে ফেলে এসেছি, তা টেরই পাইনি।
ফিরে যেতে চাই না, শুধু মাঝেমধ্যে একটু ফিরে দেখতে চাই। সেই চেনা উঠোন, মায়ের ডাক, বাবার স্নেহমাখা মুখ, ছোটবেলার খুনসুটি আর একমুঠো নির্ভেজাল আনন্দ।
কারণ জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ঠিকানাটি হয়তো কোনো শহরে, কোনো দেশে কিংবা বিলাসবহুল বাড়িতে নয়—রয়ে গেছে সেই ফেলে আসা শৈশবের চেনা উঠোনে, যেখানে আমার শিকড়, আমার ভালোবাসা, আমার সবটুকু আবেগ।
শৈশব ফিরে আসে না, বাবা-মাও চিরকাল পাশে থাকেন না। শুধু স্মৃতিগুলো থেকে যায়। আর সেই স্মৃতির কাছেই বারবার ফিরে যায় মন।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)






