বৈশাখ বাঙালি জীবনে সবচেয়ে বড় সার্বজনীন উৎসব। সেই ছোটবেলায় দেখেছি বৈশাখে নতুন জামাকাপড় পরতে। দোকানে দোকানে মিষ্টিমুখ করানো। নতুন বছরে হালখাতা খোলা। পুরনো দেনা-পাওনা মিটিয়ে নতুন হিসাব খোলা। নতুন খাতা দিয়ে শুরু হয় নতুন বছরের যাত্রা। বৈশাখের তাৎপর্য অনেক গভীরভাবে মিশে আছে আমাদের জাতীয় জীবনে। বৈশাখ মানে শুধু একটা মাসই নয়, শুধু একটা ঋতুচক্রই নয়- বৈশাখ মানে নববর্ষ নয়। বৈশাখ হচ্ছে আমাদের সামাজিক জীবনের একটি মেরূকরণ। এই বৈশাখে কর আদায় করা হয়।
এই বৈশাখে দোকানের পুরনো হিসাবের পরিসমাপ্তি ঘটে। ছোটবেলায় দেখতাম বৈশাখে ভুভুজেলা। নানারকম ঘুড়ি। বেলুন। মাটির তৈরি বিভিন্ন রকমের তৈজসপত্র। কাগজের তৈরি খেলনা। মাটির পুতুল। বাঘ, হরিণ সহ নানারকম প্রাণী তৈরি করা হতো। খেলনার পাশাপাশি অনেক প্রয়োজনীয় জিনিসও মেলায় পাওয়া যেতো। দা, বঁটি, বেলুন, কুলা, চালনি সহ নানারকম জিনিস। মেলায় বাবার হাত ধরে হাঁটতাম আর অনেক কৌতূহল নিয়ে এসব জিনিস দেখতাম। এখনো মেলা হয় কিন্তু কেন যেন সেই প্রাণ খুঁজে পাই না। হয়তো বড় হয়েছি বলে। ছোটরা হয়তো প্রাণ খুঁজে পায়। বৈশাখের অদ্ভুত রকমের খাবার তৈরি হতো। আমানি নামে একটি খাবার তৈরি হতো। রাতে ভাতে পানি দিয়ে রাখা হতো সেই ভাত সকালে পিয়াজ, মরিচ, আলু ভর্তা, ডাল ভর্তা, শুঁটকি দিয়ে খেতে হতো।
অন্যরকম স্বাদ ছিল সেই খাবারের। আমার অবশ্য এইসব খাবারের প্রতি আকর্ষণ ছিল না কিন্তু আমার বন্ধু-বান্ধবরা খুব পছন্দ করতো এই খাবার। এখনো সেই অনুষঙ্গের ব্যত্যয় ঘটেনি। বৈশাখ আরও নতুন উদ্যমে আমাদের মাঝে এসে ধরা দেয়। বৈশাখের আবির্ভাব হয়েছিল কীভাবে! প্রাবন্ধিক শামসুজ্জামান খানের গবেষণা থেকে জানা যায়-আকবরের মহা শাসনামলে পুরো ভারতবর্ষের কর বা ট্যাক্স আদায় করা হতো চৈত্র মাসের শেষ দিনে।
নতুনভাবে জীবন শুরু হতো বৈশাখের প্রথম দিন থেকে। সেই ধারা এখনো চলছে। গ্রামে এখনো এইসব হিসাব বা হালখাতা হিসেবে চৈত্র মাসের শেষ দিনকে বেছে নেয়া হয়। নতুন বছরে নতুন হিসাব খোলা হয়। পুরনো হিসাব শেষ করে নতুন হিসাব খুলে আবার নতুন করে শুরু করেন। একসময় রাজতন্ত্রের মাধ্যমে কর আদায় হতে থাকে। বৈশাখ শুধু আনন্দ বিনোদনই নয় কর আদায়ের মাস হিসেবেও পরিচিত হতে থাকে। বৈশাখ মানেই তো নতুন দিনের আবাহন। নগর সংস্কৃতিতে বৈশাখ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। টেলিভিশন অন করলে দেখা যাবে সারাক্ষণ বৈশাখ নিয়ে মাতোয়ারা। অনেক নতুন নতুন অনুষ্ঠান, নাটক তৈরি হয় বৈশাখকে ঘিরে। চলচ্চিত্রও তৈরি হয় এই বৈশাখকে অনুষঙ্গ করে।
আমাদের যান্ত্রিক জীবনে এক টুকরো বাতাস এই বৈশাখ। ঈদ বা পুজো যেমন ধর্মীয় উৎসব বৈশাখ তেমনটি নয়। বৈশাখ হচ্ছে আপামর বাঙালির প্রাণের সংস্কৃতির উৎসব। এখানে কে কোন ধর্মের এটা বিবেচ্য নয়- বৈশাখে সব ধর্মের লোক এক হয়ে যায়। কোনো ভেদাভেদ থাকে না। প্রতিবার বৈশাখ এলে আমরা আনন্দিত হই।
চ্যানেল আই এবং সুরের ধারা মিলে রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার নেতৃত্বে আয়োজন করি হাজার কণ্ঠে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের। সে এক বিশাল মহাযজ্ঞ। গত ১৪ বছর ধরে চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এটা আয়োজিত হয়ে আসছে। আমার ধারণা এরকম টুকরো টুকরো অনুষ্ঠান এই নগর সংস্কৃতিতে ছড়িয়ে পড়বে। এখনো হচ্ছে তবে একসময় বৈশাখ আরও ব্যাপক আকার ধারণ করবে। এখন ধানমণ্ডির রবীন্দ্র সরোবর কিংবা রমনার বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠান, ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠীর অনুষ্ঠানসহ অনেক অনুষ্ঠান হচ্ছে। সামনে আরও ব্যাপক আকারে এসব অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সারা দেশে বৈশাখকে বরণ করা হবে নতুন উদ্যমে নতুনভাবে। বৈশাখ আরও দীর্ঘজীবী হোক। বৈশাখকে আমরা ভালোবাসবো।








