যুদ্ধবন্দি ইস্যুতে ইউক্রেন থেকে রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করছে দক্ষিণ কোরিয়া

ছবি: সংগৃহীত
যুদ্ধবন্দি দুই উত্তর কোরীয় সেনাকে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে হস্তান্তরের তথ্য প্রকাশকে কেন্দ্র করে ইউক্রেনের সঙ্গে কূটনৈতিক বিরোধের জেরে দেশটি থেকে রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির ওই তথ্য প্রকাশের পর দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
গত বৃহস্পতিবার দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত জানায়। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে অমীমাংসিত বিষয়গুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আশা প্রকাশ করে সিউল।
মঙ্গলবার ১৩ অক্টোবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সৌদি গেজেটের তথ্য সূত্রে, গত মাসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া বক্তব্যে জেলেনস্কি জানান, রাশিয়ার পক্ষে ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নেওয়া দুই বন্দি উত্তর কোরীয় সেনাকে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে হস্তান্তর করেছে তার সরকার। ওই দুই সেনা এর আগে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, তারা দক্ষিণ কোরিয়ায় যেতে চান।
দক্ষিণ কোরিয়ার দাবি, সেনা হস্তান্তরের বিষয়টি গোপন রাখার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা হয়েছিল। কিন্তু জেলেনস্কি বিষয়টি প্রকাশ করে সেই সমঝোতা ভঙ্গ করেছেন। তবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের দপ্তর বলছে, এ বিষয়ে কোনো গোপনীয়তা রক্ষার চুক্তি ছিল না।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং একে ‘অত্যন্ত হতাশাজনক’ বলে মন্তব্য করেন। জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল বলেও উল্লেখ করেন তিনি। ইউক্রেন ক্ষমা না চাইলে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছিলেন লি।
এদিকে, দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী চো হিউন জানিয়েছেন, ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছ থেকে তিনি ক্ষমা চাওয়ার বার্তা পেয়েছেন। তবে তা সিউলের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। এর আগে গত সেপ্টেম্বরে দক্ষিণ কোরিয়ার উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী পার্ক ইউন-জু এ ঘটনায় ইউক্রেনের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি ভিয়েশকিনের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানান।
বৃহস্পতিবার ইউক্রেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হিওরহি তিখি বলেন, আবেগের চেয়ে কূটনীতিকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। দক্ষিণ কোরিয়া রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিলেও গঠনমূলক সংলাপ পুনরায় শুরু করতে ইউক্রেন প্রস্তুত রয়েছে বলে জানান তিনি।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের দপ্তরের দাবি, দুই উত্তর কোরীয় সেনার পরিবারের সুরক্ষার স্বার্থে হস্তান্তরের বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছিল। এ ছাড়া ইউক্রেনও বিষয়টি গোপন রাখতে চেয়েছিল। কারণ, সেনাদের হস্তান্তরের তথ্য প্রকাশ পেলে ইউক্রেনের যুদ্ধবন্দিদের সঙ্গে বিনিময়ের সুযোগ হাতছাড়া করার অভিযোগ উঠতে পারত।
তবে জেলেনস্কির দপ্তর জানিয়েছিল, দক্ষিণ কোরিয়াকে সেনা দুজনের কথা তার জাতিসংঘের ভাষণে উল্লেখ করার বিষয়টি জানানো হয়েছিল। কিন্তু তাদের হস্তান্তরের তথ্য প্রকাশ করা হবে, তা জানানো হয়নি বলে দাবি করে সিউল।
এ ঘটনায় দক্ষিণ কোরিয়ার অভ্যন্তরেও সমালোচনার মুখে পড়েছেন প্রেসিডেন্ট লি। দেশটির বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, উত্তর কোরিয়াকে সন্তুষ্ট রাখতে তিনি হস্তান্তরের তথ্য গোপন করতে চেয়েছেন। তবে তার দপ্তর বলেছে, জাতীয় নিরাপত্তা ও সংশ্লিষ্ট সেনাদের পরিবারের সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়েছিল।
রাশিয়া ২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে কিয়েভের প্রতি সহানুভূতিশীল অবস্থান নিয়ে আসছে সিউল। তবে সক্রিয় যুদ্ধে জড়িত কোনো দেশকে প্রাণঘাতী অস্ত্র না দেওয়ার দীর্ঘদিনের নীতি থেকে সরে আসেনি দক্ষিণ কোরিয়া।
২০২৪ সালে রাশিয়ার পক্ষে যুদ্ধে উত্তর কোরীয় সেনা মোতায়েনের পর ইউক্রেন দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরবরাহের চাপ বাড়ায়। রাশিয়ার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো রক্ষায় এসব অস্ত্র প্রয়োজন বলে জানায় কিয়েভ।
চলতি বছরের জুলাইয়ে ইউক্রেনের জন্য ১০ কোটি ডলারের সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করে দক্ষিণ কোরিয়া। দেশটির প্রেসিডেন্টের দপ্তর জানায়, আগের সহায়তার পরিধি বাড়িয়ে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আগে ইউক্রেনকে হেলমেট, ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী ও চিকিৎসা সরঞ্জামের মতো প্রাণঘাতী নয়, এমন উপকরণ দেওয়া হয়েছিল।
অন্যদিকে, দক্ষিণ কোরিয়া ইউক্রেনকে অস্ত্র সরবরাহ করলে পাল্টা ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানায়নি মস্কো।






