ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও ইউক্রেনের ছয় জ্বালানি স্থাপনায় রাশিয়ার হামলা

ছবি: সংগৃহীত
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জ্বালানি খাতে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইউক্রেনের ছয়টি জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। এসব হামলায় ৩৩ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তার অভিযোগ, রাশিয়া যুদ্ধবিরতি মেনে চলতে রাজি নয়।
সোমবার ১২ অক্টোবর ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোববার ট্রাম্প দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি খাতে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। তিনি জানান, তাৎক্ষণিকভাবে এ যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে। তবে জেলেনস্কির দাবি, এরপরও ইউক্রেনের গ্যাস স্থাপনা, জ্বালানি অবকাঠামো ও অন্যান্য স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে রাশিয়া।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে জেলেনস্কি বলেন, আমরা হামলা চালাইনি। অথচ রাশিয়া আমাদের গ্যাস স্থাপনা, জ্বালানি অবকাঠামো ও অন্যান্য স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমার মনে হয়, এটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতি পুতিনের জবাব।
ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা উক্রিনফর্ম জানিয়েছে, রাশিয়ার হামলায় বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ইজিউম শহরে বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পশ্চিম ইউক্রেনেও রাতভর জ্বালানি ও রেল অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।
সোমবার ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থার উক্রেনেরগো জানিয়েছে, রুশ হামলায় জ্বালানি সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় খারকিভ, দোনেৎস্ক ও জাপোরিঝঝিয়ায় নতুন করে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে। ক্ষতিগ্রস্ত সরঞ্জামের ওপর অতিরিক্ত চাপ এড়াতে দেশের কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ ব্যবহারে রেশনিংও চালু করা হয়েছে।
সোমবার সন্ধ্যায় কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিৎসকো টেলিগ্রামে জানান, শহরের দারনিতস্কি এলাকায় ২৫ তলা একটি আবাসিক ভবনে ড্রোন আঘাত হেনেছে। ভবনের আঙিনায় কয়েকটি গাড়িতেও আগুন ধরে যায়। তবে এ ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এর আগে উত্তর-পূর্ব ইউক্রেনের খারকিভে একটি আবাসিক ভবনে রুশ ড্রোন হামলার পর উদ্ধারকর্মীদের কাজ করতে দেখা যায়।
যুদ্ধবিরতির বিষয়ে জেলেনস্কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, এসব হামলা প্রমাণ করে রাশিয়া জ্বালানি খাতে যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে প্রস্তুত নয়।
ট্রাম্পের ঘোষণার পর জেলেনস্কি প্রথমে বলেছিলেন, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার খবর তাঁর কাছে নতুন। তবে তিনি প্রস্তাবটিকে যুদ্ধ শেষ করার পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানান। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে বলেন, যেন রাশিয়া যুদ্ধবিরতি মেনে চলে।
এদিকে সোমবার রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ বলেন, যুদ্ধবিরতির ফলে যে সাময়িক স্বস্তি আসতে পারে, ইউক্রেন তার যোগ্য নয়।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েক মাস ধরে ইউক্রেন ও রাশিয়া একে অপরের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। এতে দুই দেশেই জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। মস্কোর দাবি, ইউক্রেনের সামরিক অভিযানকে সহায়তা করে এমন স্থাপনাগুলো বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু। অন্যদিকে, রাশিয়ার ভূখণ্ডের গভীরে ইউক্রেনের হামলাকে যুদ্ধের অর্থায়ন কমানোর প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছেন জেলেনস্কি।
বিবিসি ভেরিফাইয়ের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এ পর্যন্ত রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন তেল ও গ্যাস স্থাপনায় ২৭৩টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ১২৪। অর্থাৎ হামলার সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। অন্যদিকে, সশস্ত্র সংঘাতের তথ্য সংগ্রহকারী সংস্থা অ্যাকলেডের উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি বছরে ইউক্রেনের জ্বালানি নেটওয়ার্কে প্রভাব ফেলা রুশ হামলার সংখ্যা আগের তুলনায় ২ দশমিক ৪ গুণ।
ট্রাম্প ইউক্রেনকে রাশিয়ার তেল অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে আসছেন। এর মধ্যে রাশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেল সরবরাহের একটি চুক্তির সুযোগ তৈরির বিষয়টিও রয়েছে। এ চুক্তির অংশ হিসেবে জ্বালানি আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করা হয়েছে। জেলেনস্কি এ সিদ্ধান্তকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য ‘উপহার’ বলে মন্তব্য করেছেন।
ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির আহ্বানকে সমর্থন জানিয়েছে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। তবে ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের প্রতিক্রিয়ায় ভিন্নতা রয়েছে। সোমবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাস বলেন, যুদ্ধবিরতি কার্যকরভাবে মানা হলে জোট তা স্বাগত জানাবে। তবে তিনি বলেন, রাশিয়া যে যুদ্ধবিরতি মেনে চলবে, তার কোনো প্রমাণ এখনো দেখা যায়নি।






