গত বছরের সেপ্টেম্বরে জি-২০ সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আমন্ত্রণ জানায় ভারত। বিষয়টিকে দুই দেশের মধ্যকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের অংশ হিসেবেই দেখা হয়েছিল। ঠিক এক বছর পর শেখ হাসিনার সেই সান্নিধ্য ভারতের মাথাব্যথায় পরিণত হয়েছে। এই মাসের শুরুর দিকে গণআন্দোলনের জেরে ১৫ বছর পর ক্ষমতাচ্যুত হন শেখ হাসিনা। আশ্রয় নেন ভারতে।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার উৎখাতের কয়েক সপ্তাহ পরে বাংলাদেশে ভারত বিরোধী মনোভাব ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। নয়াদিল্লির কাছে শেখ হাসিনাকে হস্তান্তর করার জন্য ক্রমবর্ধমান আহ্বান থেকে শুরু করে ভারত তার প্রতিবেশীকে আক্রমণ করতে ভিসা এবং পানি (বন্যা) ব্যবহার করছে এমন অভিযোগ পর্যন্ত সবকিছুই দৃশ্যমান।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবি বিরোধীদের
শেখ হাসিনা গত ৫ আগস্ট সামরিক হেলিকপ্টারে দেশত্যাগ করেন এবং নয়াদিল্লির কাছাকাছি একটি সামরিক ঘাঁটিতে অবতরণ করেন, যেখানে তাকে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল অভ্যর্থনা জানান। তখন থেকে তিনি ভারতের রাজধানী এবং এর আশেপাশে বসবাস করছেন বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে ক্রমাগত দাবি আসছে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভারতীয় গণমাধ্যমকে বলেছেন, শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশেই হস্তান্তর ও বিচার করতে হবে। ভারতের উচিত বাংলাদেশকে তার কাছ থেকে জবাবদিহিতা নিতে সাহায্য করা কারণ সে স্পষ্টতই বাংলাদেশের অনেক ক্ষতি করেছে। একই দিনে এ দাবি করেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরও।
গত সপ্তাহে নোবেল বিজয়ী মোহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার শেখ হাসিনার কূটনৈতিক ভিসা বাতিল করে। তা ছাড়া শেখ হাসিনা কতদিন বৈধভাবে ভারতে থাকতে পারবেন তা স্পষ্ট নয়। ভারত সরকার এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলী রিয়াজ বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষ শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশে সংঘটিত বলপূর্বক গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের জন্য তাকে জবাবদিহি করতে তার প্রত্যর্পণ চাইছিল।
বাংলাদেশে বন্যার কি জন্য ভারত দায়ী?
বাংলাদেশ, ত্রিপুরা, আসাম এবং মেঘালয়সহ উত্তর-পূর্ব ভারতের কিছু অংশের আগস্ট মাসে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্মুখীন হয়েছে।
বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় ২৩ আগস্ট জানিয়েছে, প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার মানুষকে জরুরি ত্রাণ আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ১১টি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যায় দেশের বাকি অংশ থেকে ১০ লাখের বেশি মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
এসময় সোশ্যাল মিডিয়ায় খবর ছড়ানো শুরু হয় যে, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের গোমতী নদীর উজানে অবস্থিত ডুম্বুর বাঁধ ভারতের ইচ্ছাকৃতভাবে খোলার কারণে বন্যা হয়েছে। গোমতী নদী ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবাহিত হয়েছে। এই দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত কোন প্রমাণ নেই।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২২ আগস্ট একটি বিবৃতি প্রকাশ করে বলেছে, বন্যাটি অত্যধিক বৃষ্টি এবং বাঁধের ভাটিতে থাকা ক্যাচমেন্টের পানির ফলে হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আমরা দ্বিপাক্ষিক পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত আলোচনার মাধ্যমে পানি সম্পদ এবং নদীর পানি ব্যবস্থাপনার সমস্যা ও পারস্পরিক উদ্বেগ সমাধানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৫৪ টি আন্তঃসীমান্ত নদী রয়েছে।
এই সপ্তাহের শুরুতে, বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা ড. ইউনূসকে বলেছিলেন, উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় বাঁধ থেকে পানি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের কর্মকর্তারা বলেছেন, অতীতের মতো ভারত তার প্রতিবেশীকে পানি ছাড়ার বিষয়ে কোনো সতর্কতা জারি করেনি। এই সতর্কতা মৃত্যু এবং ধ্বংস প্রতিরোধে সাহায্য করতে পারে।
বাংলাদেশে ভারতীয় ভিসা কেন্দ্রগুলোতে কী হচ্ছে?
মঙ্গলবার (২৭ আগস্ট) দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাদেশের ঢাকা ও সাতক্ষীরার ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্র (আইভিএসিএস) বন্ধ ছিল। কয়েকশ মানুষ তাদের ভিসা প্রক্রিয়াকরণে বিলম্বের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার একদিন পর এই ঘটনা ঘটে। বিক্ষোভে লোকেরা তাদের পাসপোর্ট ফেরত দেওয়ার দাবি জানায়। শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যে ভারত ঢাকায় তার কূটনৈতিক উপস্থিতি কমিয়েছে।
বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক কেন অস্থির?
নয়াদিল্লি ও ঢাকা দীর্ঘদিন ধরে শক্তিশালী কূটনৈতিক ও বাণিজ্য সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে বিষয়টি ক্রমবর্ধমানভাবে শেখ হাসিনা এবং তার দল আওয়ামী লীগকে ভারতের স্বার্থের সাথে কাজ করা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
এদিকে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দেশটির বৃহত্তম সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর বাংলাদেশি হিন্দুদের ওপর হামলার ঘটনাগুলো ভারতে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। দেশের জনসংখ্যার ৮ শতাংশ হিন্দুদের লক্ষ্য করে সহিংসতার বিরুদ্ধে ৯ আগস্ট ঢাকায় শত শত বিক্ষোভকারী সমাবেশ করেছিল। এর ফলে ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশের ওপর ক্ষোভ দেখা দেয়।
এই বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে আন্তর্জাতিকভাবে নরেন্দ্র মোদি সতর্কতাও জারি করেছেন।







