দুই দশকেরও বেশি সময় পর আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান বাতিল করেছে লেবানন। মঙ্গলবার দেশটির পার্লামেন্টে এ-সংক্রান্ত একটি আইন পাস হয়েছে। নতুন আইনে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
সংবাদমাধ্যম আরব নিউজ এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
এর মাধ্যমে ২০০৪ সাল থেকে কার্যত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না করার যে নীতি চলে আসছিল, তা এবার আইনি স্বীকৃতি পেল। দেশটির বিচারমন্ত্রী আদেল নাসার এই সিদ্ধান্তকে ঐতিহাসিক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেন, এই পদক্ষেপ লেবাননকে এমন একটি রাষ্ট্রে পরিণত করেছে, যেখানে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হবে। তবে মৃত্যুদণ্ড বাতিলের অর্থ অপরাধীদের প্রতি শিথিল হওয়া নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নাসার বলেন, মৃত্যুদণ্ড বাতিলের ফলে গুরুতর অপরাধের শাস্তি দুর্বল হচ্ছে না। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত্যুদণ্ড বিলোপের ক্ষেত্রে লেবানন একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে।
লেবাননে সর্বশেষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল ২০০৪ সালে। লেবানিজ অ্যাসোসিয়েশন ফর সিভিল রাইটসের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশটির কারাগারে ৮৪ জন বন্দি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অবস্থায় রয়েছেন।
বিচারমন্ত্রী জানান, মৃত্যুদণ্ড বাতিলের ফলে বিদেশ থেকে আসামি প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রেও সুবিধা হবে। এতদিন কিছু দেশ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আশঙ্কায় লেবাননের কাছে সন্দেহভাজনদের প্রত্যর্পণ করতে অস্বীকৃতি জানাত। নতুন আইন কার্যকর হলে সেই যুক্তি আর দেখাতে পারবে না তারা।
পার্লামেন্ট সদস্য আবদুর রহমান আল-বিজরির প্রস্তাবিত আইনের খসড়ায় সংশোধনী এনে মঙ্গলবার সেটি অনুমোদন করা হয়। নতুন আইনে যেসব অপরাধে আগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতো, সেসব ক্ষেত্রে কঠোর ধরনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হবে।
আইন কার্যকর হওয়ার আগে সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে যেসব মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, সেগুলোও শ্রমসহ যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রূপান্তর করা হবে।
ভোটাভুটিতে হিজবুল্লাহর এমপিরা বিরত থাকলেও পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য বিলটির পক্ষে ভোট দেন।
পার্লামেন্টের মানবাধিকার কমিটির চেয়ারম্যান মিশেল মুসা এই সিদ্ধান্তকে লেবাননের আইনব্যবস্থার উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে ‘বড় অর্জন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ২০০৪ সাল থেকেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর বন্ধ থাকলেও এবার লেবানন আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত্যুদণ্ড বিলোপকারী দেশগুলোর তালিকায় যুক্ত হলো।
জুলাইয়ে পার্লামেন্টের তিনটি কমিটি খসড়া আইনটি অনুমোদন করেছিল। এর ফলে মঙ্গলবারের চূড়ান্ত ভোটের পথ তৈরি হয়।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের লেবানন গবেষক রামজি কাইস বলেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না হলেও গত দুই দশক ধরে এটি দেশটির আইনে বহাল ছিল। এবার আইন থেকে পুরোপুরি মৃত্যুদণ্ড বাদ দেওয়ার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের সেই অবস্থার অবসান হলো।
তিনি বলেন, গত দুই দশকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর অনানুষ্ঠানিক স্থগিতাদেশ থাকলেও এই ‘নিষ্ঠুর প্রথা’ থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে লেবাননের আইনে থাকা সব মৃত্যুদণ্ডের বিধান বাতিল করা প্রয়োজন ছিল।
২০২০ সাল থেকে লেবানন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এমন একটি প্রস্তাবের পক্ষেও ভোট দিয়ে আসছে, যেখানে দেশগুলোকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর স্থগিতাদেশ আরোপ এবং পরবর্তী সময়ে মৃত্যুদণ্ড বিলোপের আহ্বান জানানো হয়েছে।
নতুন আইনের মাধ্যমে দেশটির দণ্ডবিধির ৩৭ নম্বর ধারা সংশোধন করা হবে এবং ৪৩ নম্বর ধারা বাতিল হবে। পাশাপাশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি সংক্রান্ত ফৌজদারি কার্যবিধির ৪২০ থেকে ৪২৪ নম্বর ধারাও বাতিল করা হবে।
লেবাননে ১৯৪৩ সালে দণ্ডবিধি প্রণয়নের সময় থেকেই মৃত্যুদণ্ডের বিধান ছিল। ওই আইনে আগের ফরাসি আইনব্যবস্থার বড় ধরনের প্রভাব ছিল। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সালের গৃহযুদ্ধের পর মৃত্যুদণ্ডের প্রয়োগ আরও কঠোর হয়।
১৯৯৪ সালের একটি আইনে হত্যার মামলায় বিচারকদের প্রশমনমূলক পরিস্থিতি বিবেচনার সুযোগ সীমিত করা হয়েছিল। ফলে নির্দিষ্ট কিছু অপরাধে পরিস্থিতি বিবেচনা না করেই মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিধান তৈরি হয়। পরে ২০০১ সালের আইনে ওই বিধান বাতিল করে আগের দণ্ডবিধির ধারা পুনর্বহাল করা হলেও মৃত্যুদণ্ড পুরোপুরি বিলোপ করা হয়নি।
গত তিন দশকে লেবাননে মৃত্যুদণ্ড নিয়ে একাধিকবার বিতর্ক হয়েছে। ২০০০ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সালিম আল-হোস হত্যা ও ধর্ষণের দায়ে দণ্ডিত এক লেবানিজ ও এক সিরীয় নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অনুমোদন দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।
ওই সময় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এমিল লাহুদ এবং উপপ্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মিশেল মুর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আদেশে স্বাক্ষর করেছিলেন। পরে বিষয়টি সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেয়। সালিম আল-হোস তখন নীতিগতভাবে মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করে বলেছিলেন, জীবন যিনি দিয়েছেন, তা ফিরিয়ে নেওয়ার অধিকারও তাঁরই।
মঙ্গলবারের পার্লামেন্ট ভোটের মধ্য দিয়ে লেবাননে মৃত্যুদণ্ডের অধ্যায়ের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি হলো। ২০০৪ সাল থেকে চলা ২২ বছরের কার্যত স্থগিতাবস্থা এবার দেশটির আইনে পূর্ণাঙ্গ বিলোপে রূপ নিল।


