অস্ট্রেলিয়ার যে কঠিন ক্যানভাসে যুগের পর যুগ টেস্ট পরাশক্তিদের অহংকার আর দাপটের আধিপত্য ছিল অটুট, সেই উত্তপ্ত ২২ গজে রচিত হল এক নতুন মহাকাব্য। টাইগারদের ব্যাটে-বলে অবিচল আত্মবিশ্বাসী দাপটে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল অজি দুর্গ। ডারউইনের গ্যালারির স্তব্ধতাকে ছাপিয়ে রূপকথা লিখল বাংলাদেশ। ক্যাঙ্গারুদের ডেরায় গিয়ে তাদের পরাস্ত করে ৯ উইকেটের ঐতিহাসিক জয় তুলেছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল।
১৫তম ওভারের দ্বিতীয় বলে বিউ ওয়েবস্টারের অফস্টাম্পের বাইরের ডেলিভারি সজোরে কাট করেন মুমিনুল হক। ডিপ ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্ট দিয়ে বল চলে যায় সীমানার বাইরে। বাঁধভাঙা উল্লাসে মাতে বাংলাদেশ। ততক্ষণে ইতিহাস রচনা করে ফেলেছে লাল-সবুজের দল। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয়, সাড়ে তিন দিনে জয়, ম্যাচজুড়ে দাপট দেখিয়েছেন হাসান মাহমুদ ও মেহেদী হাসান মিরাজরা।
হাসান মাহমুদের দাপুটে বোলিংয়ে অস্ট্রেলিয়াকে প্রথম ইনিংসে দুইশর আগে গুটিয়ে দেয়া। পর তানজিদ তামিমের সেঞ্চুরিতে চারশতাধিক রানের সংগ্রহ। ২২৮ রানের লিড নিয়ে অজিদের দ্বিতীয় ইনিংসে পাঠিয়ে তিনশোর আগেই থামানো। কেবল ৫৭ রানের লক্ষ্য দিতে পারে স্বাগতিকরা। দেড়দিন আর ৯ উইকেট হাতে রেখে জয়ের বন্দরে পৌঁছায় বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয়ের কীর্তি, সবমিলিয়ে অজিদের বিপক্ষে দ্বিতীয় জয় সাদা পোশাকে।
বৃহস্পতিবার মারারা স্টেডিয়ামে টসে জিতে আগে ব্যাটে নেমেছিল অস্ট্রেলিয়া। ৫৩ ওভারে ১৯৮ রানে প্রথম ইনিংসে থামে তারা। জবাবে প্রথম ইনিংসে ১৩৮ ওভারে ৪২৬ রান তোলে বাংলাদেশ। ২২৮ রানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করে ৯৫.১ ওভারে ২৮৪ রানে থামে অস্ট্রেলিয়া। ৫৭ রানের লক্ষ্যে নেমে ১৪.২ ওভারে চূড়ায় পৌঁছায় টিম টাইগার্স।
লক্ষ্যতাড়ায় নেমে শুরুটা ভালো হয়নি বাংলাদেশের। ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারে ৪ রানে আউট হন তানজিদ তামিম। জশ হ্যাজেলউডের বলে রানের খাতা খোলার আগে ফেরেন প্রথম ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান। মুমিনুল হক ও সাদমান ইসলামের অবিচ্ছিন্ন ৫৩ রানের জুটিতে জয় নিশ্চিত করে বাংলাদেশ।
সাদমান ৩৭ বলে ২৬ রানে এবং মুমিনুল ৪২ বলে ২৯ রানে অপরাজিত থাকেন। দ্বিতীয় ইনিংসে একমাত্র উইকেটটি নেন জশ হ্যাজেলউড।
বৃহস্পতিবার ব্যাটে নেমে হাসান মাহমুদের তোপে পড়েছিল অজিরা। প্রথমদিনে চা বিরতির পর ১৯৮ রানে গুটিয়ে যায়। সর্বোচ্চ ৭১ রান করেন স্টিভেন স্মিথ। জ্যাক ওয়েদারল্যান্ড ২৩, ট্রাভিস হেড ২২ এবং অ্যালেক্স ক্যারি ১৯ রান করেন।
১৭ ওভারে ৩ মেডেনসহ ৫৫ রানে ৬ উইকেট নেন হাসান মাহমুদ। তার ক্যারিয়ারসেরা বোলিং। ৩৯ রানে ২ উইকেট নেন ইবাদত হোসেন। ৫৫ রানে ২ উইকেট নেন তাসকিন।
জবাবে প্রথম ইনিংসে টাইগার ব্যাটারদের মধ্যে তানজিদ তামিম সেঞ্চুরি করেন, ১০১ রানের ইনিংস খেলেন। নাজমুল হোসেন শান্ত ৮৪, মেহেদী হাসান মিরাজ ৬৫, মুমিনুল হক ৪৯, মুশফিকুর রহিম ৩৬ রান করেন।
অস্ট্রেলিয়া বোলারদের মধ্যে জশ হ্যাজেলউড ৬ উইকট নেন। মিচেল স্টার্ক ২, প্যাট কামিন্স ও নাথান লায়ন নেন একটি করে উইকেট।
২২৮ রানে পিছিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে নেমে অজিদের হয়ে সেঞ্চুরি করেন ক্যামেরন গ্রিন, ১০৪ রান করেন। স্টিভেন স্মিথ ৪৪, মার্নাশ লাবুশেন ৩১ এবং অ্যালেক্স ক্যারি ৩০ রান করেন।
দ্বিতীয় ইনিংসে মেহেদী হাসান মিরাজ ৩৩.১ ওভার বল করে ৬৬ রানে ৫ উইকেট নেন। টাইগার অলরাউন্ডারের ১৫তম ফাইফার এটি। হাসান ১৯ ওভারে ৫৬ রানে ৩ উইকেট নেন। তাইজুল ও তাসকিন নেন একটি করে উইকেট।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
টস: অস্ট্রেলিয়া (ব্যাটিং)
ফলাফল: বাংলাদেশ ৯ উইকেটে জয়ী
বাংলাদেশ দ্বিতীয় ইনিংস ৫৭/১ (১৪.২)
মুমিনুল ৩০ (৩৯), সাদমান ২৫ (৪২)
হ্যাজেলউড ১/৫ (৩)
অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় ইনিংস ২৮৪/১০ (৯৫.১) (লিড ৫৬)
গ্রিন ১০৪ (২০১), স্মিথ ৪৪ (৮৮), লাবুশেন ৩১ (৫৯)
মিরাজ ৫/৬৬ (৩৩.১), হাসান ৩/৫৬ (১৯)
বাংলাদেশ প্রথম ইনিংস ৪২৬/১০ (১৩৮) (লিড ২২৮)
তানজিদ ১০১ (১৯৭), শান্ত ৮৪ (১২৬), মিরাজ ৬৫ (১৫৪), মুমিনুল ৪৯ (৯৫)
জশ হ্যাজেলউড ৬/৮৯, মিচেল স্টার্ক ২/৭৯
অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংস ১৯৮/১০ (৫৩)
স্মিথ ৭১ (১০৯)
হাসান ৬/৫৫, ইবাদত ২/৩৯, তাসকিন ২/৫৫








