স্বাস্থ্য

রক্তদানে জীবন বাঁচানো ও মরণোত্তর চক্ষুদানে দৃষ্টিশক্তি ফেরানোর আহ্বান সন্ধানীর

রক্তদানে জীবন বাঁচানো ও মরণোত্তর চক্ষুদানে দৃষ্টিশক্তি ফেরানোর আহ্বান সন্ধানীর

দেশে নিরাপদ রক্তের চাহিদা পূরণ এবং কর্নিয়াজনিত অন্ধত্ব দূরীকরণে স্বেচ্ছায় রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদান আন্দোলন আরও জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছে সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতি। এ জন্য সরকারি সহযোগিতা, কার্যকর নীতিমালা, হাসপাতালভিত্তিক সমন্বয় এবং দেশব্যাপী জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংগঠনটি।

শনিবার (৩১ অক্টোবর) ‘জাতীয় স্বেচ্ছায় রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদান দিবস-২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় এসব কথা বলেন সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতির মহাসচিব ও উদযাপন উপকমিটির সদস্যসচিব অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মনির হোসেন।

তিনি বলেন, ১৯৭৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের একদল শিক্ষার্থীর উদ্যোগে সন্ধানীর যাত্রা শুরু হয়। সে সময় রক্তের অভাবে রোগীর মৃত্যু, নিরাপদ রক্ত সংগ্রহের সীমাবদ্ধতা এবং স্বেচ্ছায় রক্তদানের বিষয়ে সামাজিক অসচেতনতা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। এসব সংকট মোকাবিলায় মানুষের মধ্যে মানবিক দায়িত্ববোধ ও স্বেচ্ছায় রক্তদানের মানসিকতা তৈরির লক্ষ্যেই সংগঠনটি কাজ শুরু করে।

১৯৭৮ সালের ২ নভেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংকে প্রথম স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি আয়োজন করে সন্ধানী। পরবর্তী সময়ে দিনটি জাতীয় স্বেচ্ছায় রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদান দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ১৯৯৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ২ নভেম্বরকে দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন।

অধ্যাপক মনির হোসেন বলেন, বর্তমানে দেশে রক্তদানের বিষয়ে সচেতনতা বাড়লেও চাহিদার তুলনায় স্বেচ্ছায় ও বিনা পারিশ্রমিকে রক্তদানের মাধ্যমে সংগৃহীত রক্তের পরিমাণ এখনো সীমিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ ইউনিট রক্তের প্রয়োজন। দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তি, অস্ত্রোপচারের রোগী, প্রসূতি মা, থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত শিশু এবং বিভিন্ন রক্তজনিত রোগে ভোগা মানুষের জন্য নিরাপদ রক্তের সরবরাহ নিশ্চিত করতে নিয়মিত রক্তদাতা তৈরি করা জরুরি।

তিনি আরও বলেন, রক্তদানের পাশাপাশি মরণোত্তর চক্ষুদানও একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক উদ্যোগ। কর্নিয়াজনিত অন্ধত্বে আক্রান্ত ব্যক্তিরা উপযুক্ত কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেতে পারেন। কিন্তু পর্যাপ্ত দাতার অভাবে অনেক মানুষ দীর্ঘদিন আলো ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।

১৯৮৪ সালের ২৫ নভেম্বর সন্ধানীর সহযোগী সংগঠন হিসেবে সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়। সংগঠনটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ অন্ধত্বের শিকার। তাঁদের মধ্যে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ কর্নিয়াজনিত অন্ধত্বে ভুগছেন। প্রতি বছর নতুন করে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ এ সমস্যায় যুক্ত হচ্ছেন।

সমিতির তথ্য বলছে, প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ৪ হাজার ২০৪টি কর্নিয়া সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ৩ হাজার ৫৪০ জন মানুষের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে অবদান রেখেছে সংগঠনটি।

অধ্যাপক মনির হোসেন বলেন, মরণোত্তর চক্ষুদান আন্দোলনের অন্যতম বাধা জনসচেতনতার অভাব, সামাজিক ভ্রান্ত ধারণা এবং পর্যাপ্ত দাতা না পাওয়া। জীবিত অবস্থায় চক্ষুদানের অঙ্গীকার করা এবং পরিবারের সদস্যদের বিষয়টি জানিয়ে রাখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শোকাহত পরিবারের প্রতি সম্মান ও সহমর্মিতা বজায় রেখে কর্নিয়া সংগ্রহের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

তিনি জানান, সন্ধানী চক্ষুব্যাংকের প্রশিক্ষিত কাউন্সেলররা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে মৃত ব্যক্তির স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করে চক্ষুদান বিষয়ে পরামর্শ দেন এবং কর্নিয়া সংগ্রহে সহযোগিতা করেন।

এ আন্দোলন এগিয়ে নিতে সরকারের কাছে চারটি প্রস্তাব তুলে ধরে সন্ধানী। এগুলো হলো, জাতীয় স্বেচ্ছায় রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদান দিবসকে ‘গ’ ক্যাটাগরি থেকে ‘খ’ ক্যাটাগরিতে উন্নীত করে রাষ্ট্রীয়ভাবে উদযাপনের ব্যবস্থা করা, বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে মরণোত্তর কর্নিয়া সংগ্রহ সহজ করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা নিশ্চিত করা, চক্ষুদানবিষয়ক তথ্য ও সহায়তার জন্য টোল-ফ্রি হটলাইন চালু করা এবং জনসচেতনতা তৈরিতে টেলিভিশনে বিনামূল্যে প্রচারের জন্য সচেতনতামূলক টেলিস্ক্রিপ্ট তৈরি করা।

সন্ধানীর মানবসেবামূলক কার্যক্রমের স্বীকৃতি হিসেবে সংগঠনটি ২০০৪ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারসহ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা অর্জন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে কমনওয়েলথ ইয়ুথ সার্ভিসেস অ্যাওয়ার্ড ১৯৯৫, ওডিএ-ইউকে অ্যাওয়ার্ড ১৯৯৫ এবং রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খান স্বর্ণপদক।

অধ্যাপক মনির হোসেন বলেন, রক্তের অভাবে কোনো প্রাণ ঝরে পড়বে না এবং কর্নিয়াজনিত অন্ধত্বের কারণে কেউ পৃথিবীর আলো থেকে বঞ্চিত থাকবেন না, এমন সমাজ গড়ে তোলাই সন্ধানীর লক্ষ্য। এ জন্য সরকার, চিকিৎসক সমাজ, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, তরুণ প্রজন্ম ও সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

‘রক্তদানে জীবন বাঁচাই, মরণোত্তর চক্ষুদানে দৃষ্টির আলো ছড়াই’ স্লোগানে এই মানবিক আন্দোলনে সবাইকে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বিষয়:অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মনির হোসেন জাতীয় চক্ষুদান সমিতি জাতীয় স্বেচ্ছায় রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদান দিবস-২০২৬
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…