বাংলাদেশ হিমালয় থেকে প্রবাহিত নদীগুলোর মধ্য দিয়ে বাহিত পলি দ্বারা গঠিত একটি সক্রিয় ব-দ্বীপ। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ ‘নদীর দেশ’ নামে পরিচিত। তাই বাংলাদেশকে বলা হয় নদীমাতৃক দেশ। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নদীর গুরুত্ব অপরিসীম। নদীগুলো বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতির প্রধান স্থানিক উপাদান।
বাংলাদেশের নদীগুলো দেশের জন্য আত্মপরিচয়ের সবচেয়ে বড় রূপ এবং বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশের নদীগুলো দেশের ইতিহাস, প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। অগণিত গ্রামীণ বাংলাদেশীর জীবন-জীবিকা নদীর উপর নির্ভরশীল। আমাদের দেশে মোট ৭০০টি নদী প্রবাহিত এবং এর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ২৪ হাজার ১৪০ কিলোমিটার। এগুলো নদী, পাহাড়ি স্রোত, ঘূর্ণায়মান মৌসুমী খাঁড়ি এবং খাল নিয়ে গঠিত, যা দেশের মোট ভূপৃষ্ঠের প্রায় ৭ শতাংশ গঠন করে এবং এগুলো দেশের বেশিরভাগ অংশকে জলপথের বিচিত্র নেটওয়ার্ক দ্বারা সংযুক্ত করে।
বাংলাদেশের মধ্যে দিয়ে ৫৮টি আন্তঃসীমান্ত নদী প্রবাহিত হয়েছে। এই ছোট্ট দেশে প্রচুর নদী প্রবাহিত, তাই একে নদীর দেশও বলা হয়। এদেশের দীর্ঘতম ও বৃহত্তম নদী মেঘনা ও অন্যান্য বড় নদীগুলো হলো পদ্মা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, কর্ণফুলী, তিস্তা ইত্যাদি।
আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার ৬০ শতাংশ মানুষ তাদের একমাত্র প্রাণীজ প্রোটিন গ্রহণের জন্য নদীর পানির উপর নির্ভরশীল। জিডিপিতে আমাদের মৎস্য খাতের অবদান প্রায় ৩.৬১ শতাংশ। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ১১ শতাংশ মৎস্য খাতে নিয়োজিত। পানীয় জলের ১৮ শতাংশ আসে আমাদের নদী থেকে। আনুমানিক ৭০০টি নদী নৌযান পণ্য ও যাত্রী পরিবহন করে এবং ৫০ মিলিয়ন মানুষ এই ধরনের নৌপথ দিয়ে নিয়মিত যাতায়াত করে। নৌপথ আমাদের আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্য শিল্পের জন্যও অপরিহার্য এবং আমাদের অর্থনৈতিক বৃদ্ধিকে প্রভাবিত করতে সাহায্য করছে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নদীর মাধ্যমে আন্তঃজেলা পণ্য পরিবহন অধিকতর সহজ। এদেশের সব জেলা রেলপথ বা সড়কপথে যুক্ত নয়। অনেক নদী ওই জেলাগুলোকে নৌপথের সাথে যুক্ত করেছে। জলপথে পন্য পরিবহন ব্যবস্থাপনা খরচ অন্য যেকোন পরিবহনের তুলনায় অনেক কম। বাংলাদেশের মোট নৌপথের দৈর্ঘ্য প্রায় ৯ হাজার ৮৩৩ কিলোমিটার এবং তন্মধ্যে প্রায় ৫ হাজার ৪০০ কিলোমিটার সারাবছর ব্যবহার উপযোগী।

বর্ষাকালে বন্যার সময় ফসলি জমিতে অনেক পলি জমা হয়, যা আমাদের জমিকে অধিকতর উর্বর করে তোলে। এই পলির মাধ্যমে জমির উর্বরাশক্তি বৃদ্ধি পায়, যার ফলে জমির উৎপাদন ক্ষমতা অনেকাংশে বৃদ্ধি পায়, যা দ্বারা আমাদের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে। নদীমাতৃক বাংলাদেশ মৎস্য সম্পদে সমৃদ্ধ। প্রাচীনকাল থেকেই বাংলাদেশের প্রধান খাদ্য মাছ ও ভাত। তাই বাংলাদেশী মানুষকে বলা হয় ‘মাছে-ভাতে বাঙ্গালী’। আমাদের দেশের জাতীয় মাছ ইলিশের দেশে-বিদেশে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। আমাদের দেশ নদীর মাছ রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে থাকে।
শীতকালে আমাদের দেশে খুব কম বৃষ্টিপাত হয়। তখন সেচই কৃষি কাজের একমাত্র উপায়। আমাদের দেশের নদীকেন্দ্রিক গুরুত্বপূর্ণ সেচ প্রকল্পগুলো হলো রংপুরের তিস্তা প্রকল্প, চট্টগ্রামের কর্ণফুলি প্রকল্প, গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প ইত্যাদি। রাঙ্গামাটির কাপ্তাইয়ে অবস্থিত কর্ণফুলী নদীর উপর একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প রয়েছে। এটি আমাদের জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
নদী পর্যটন বিশ্বব্যাপী পর্যটনের অন্যতম জনপ্রিয় রূপ। এটি অভ্যন্তরীণ জলপথ এবং নদী ভ্রমণের সুযোগ দেয়। এটি একটি দেশকে ভিন্নভাবে অন্বেষণ করার জন্য একটি অনন্য অভিজ্ঞতা প্রদান করে। নদীমাতৃক দেশ হিসেবে বাংলাদেশে নদী পর্যটনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশে নদী পর্যটন ধীরে ধীরে প্রসারিত হচ্ছে। দেশি-বিদেশি পর্যটকরা নদী পর্যটনে অংশ নিতে খুবই আগ্রহী।
এছাড়াও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে বেকারত্বের হার কমাতে এই সেক্টরের প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। নদী পর্যটন অত্যন্ত নমনীয়, আরামদায়ক, ভ্রমণকারীদের জন্য আনন্দদায়ক এবং বেশিরভাগই উপভোগ্য উপায়ে পর্যটনের উদ্দেশ পরিবেশন করে। দেশের প্রতিটি নদী পর্যটন খাতের সুযোগ পূর্ণ কাজে লাগাতে হবে। নদী পর্যটন নদী ধ্বংস থেকে ত্রাণকর্তা হিসেবে কাজ করতে পারে। বাংলাদেশের প্রকৃত সৌন্দর্য দেখার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো নদী পর্যটন।

দুর্ভাগ্যবশত, অনুপযুক্ত পর্যটন অবকাঠামোর জন্য নদী পর্যটনের উন্নয়নে বাংলাদেশ এখনও অনেক পিছিয়ে। যত্রতত্র কারখানার বর্জ্য ও প্লাষ্টিক নদীতে নিক্ষেপের ফলে নদীর পানি দূষণ এবং খনির রাসায়নিক বর্জ্য ও সারকে সরাসরি নদী-হত্যাকারী হিসেবে দেখা হয়। এর ফলে নদীর জীব বৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দূষণের ফলে মাছের জাতের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। এই ধরনের অঞ্চলে জৈব চাষ পদ্ধতি প্রয়োজন যাতে মাছের প্রজনন ক্ষমতা ব্যাহত না হয়।
নদীর নাব্যতা রক্ষা করার জন্য নদী ড্রেজিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সরকার ২০০৮ সালে ক্ষমতা গ্রহণ করার পর থেকে নদী ড্রেজিং এর উপর গুরুত্বারোপ করে। এর ফলে বর্ষাকালে বন্যার সময় অতিরিক্ত পানি প্রবাহ হতে ফসল ও জান-মালের অনেক ক্ষতি হতে দেশকে রক্ষা ও শীত মৌসুমে নদীর পানি সংরক্ষণ করে সেচ ও কৃষিকাজে এই পানি ব্যবহার করা যায়। বর্তমান সরকারের যুগোপযোগী সিদ্ধান্তের ফলে নদীর নাব্যতা ও পানি প্রবাহ গতিশীল রাখার জন্য ইতোমধ্যে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীতে টানেল তৈরী করা হয়েছে এবং তা জনসাধারণের জন্যে উন্মুক্ত করার ফলে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থার অভুতপূর্ব বিপ্লব সাধিত হয়। যার ফলে নদীর পানিপ্রবাহে কোন বাধার সৃষ্টি হবে না ও নদীর পরিবেশ প্রকৃতির শৃঙ্খল বজায় রেখে মৎস্য ও অন্যান্য জলজ সম্পদের ব্যবহার নিশ্চিত করা যাবে।
নদীর অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনুধাবন করে বর্তমান সরকার ঢাকার চারপাশের ছোটবড় নদীগুলোর নাব্যতা বৃদ্ধির মাধ্যমে নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। এর ফলে ঢাকার সাথে সারাদেশের নৌপথে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা অধিকতর সহজলভ্য হয়েছে। ঢাকার চারপাশে তুরাগ নদীর নাব্যতা বৃদ্ধির ফলে অতি বৃষ্টিতে রাজধানী ঢাকার পানি দ্রুত নেমে যাওয়ায় মানুষ জলাবদ্ধতা হতে স্বল্প সময়ে রক্ষা পাচ্ছে।

ভারত ও বাংলাদেশর মধ্যে সম্প্রতি কুশিয়ারা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ এই পানি দিয়ে ৫ হাজার হেক্টর (১২ হাজার ৪০০ একর) আবাদি জমিতে সেচ সুবিধা পাচ্ছে। নদীগুলোর দূষন ও দখল রোধ করে সরকারের গৃহীত নানাবিধ পদক্ষেপের ফলে নদী ভিত্তিক অর্থনীতি আরও সুদৃড় হচ্ছে।
যদিও নদীগুলোর অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেশি, তবে এর কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও রয়েছে। বন্যার সময় নিম্নবিত্ত মানুষ অসহায় হয়ে পড়ে ও তাদের জীবন হয়ে ওঠে দূর্বিষহ এবং বন্যায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। নদী ভাঙ্গনের ফলে অনেক মানুষ ভূমিহীন হয়ে পড়ে। তাই অধিক বন্যা প্রবণ অঞ্চলে বেড়ীবাঁধ নির্মাণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণবাঁধ, বন্যার পানি সংরক্ষণ, সেচ, জলবিদ্যুৎ ইত্যাদি নিয়ে আমাদের আরও বেশি করে গবেষণা করা উচিত। আমরা আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে নদীর এই অপার সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারি।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







