আন্না থেকে উদয় শেঠি: নানা পাটেকরের পাঁচ কালজয়ী চরিত্র

বলিউডের বর্ষীয়ান অভিনেতা নানা পাটেকর আর নেই। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ভোরে গোয়ায় নিজের বাড়িতে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর।
নানা পাটেকরের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই শোকের ছায়া নেমে আসে ভারতীয় চলচ্চিত্র অঙ্গনে। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করা ঘোষণা দিয়েছে মহারাষ্ট্র সরকার। সহকর্মী থেকে শুরু করে বিভিন্ন অঙ্গনের মানুষ তাকে স্মরণ করে শোক প্রকাশ করছেন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও নানা পাটেকরের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন। তিনি অভিনেতার অভিনয়ের ‘তীব্রতা, স্বাতন্ত্র্য ও অনন্য উপস্থিতি’র প্রশংসা করে বলেন, নানা এমন সব চরিত্র উপহার দিয়েছেন, যেগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম মনে রাখবে।
প্রায় পাঁচ দশকের অভিনয়জীবনে নানা পাটেকর শুধু কোনো চরিত্রে অভিনয় করেননি, বরং চরিত্রের সঙ্গে নিজেকে এমনভাবে মিশিয়ে দিয়েছেন যে পর্দার সেই মানুষটিই হয়ে উঠেছে তার পরিচয়ের অংশ। জটিল, অস্থির, খল-অভিনেতা কিংবা ভেতরে গভীর ক্ষত বহন করা চরিত্রে ছিল তার বিশেষ দক্ষতা।
তার অভিনয়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি ছিল সংলাপ বলার নিজস্ব ধরন। কণ্ঠের ওঠানামা, হঠাৎ বিরতি, স্বরের পরিবর্তন এবং চোখের অভিব্যক্তি দিয়ে তিনি সংলাপকে করে তুলতেন আরও শক্তিশালী।
তার অভিনয়জীবনে অসংখ্য চরিত্র দর্শকের মনে দাগ কেটেছে। এর মধ্যে কয়েকটি চরিত্র বিশেষভাবে তাকে অমর করে রেখেছে।
পারিন্দা’য় আন্না
১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে সিনেমায় অভিনয় শুরু করলেও ১৯৮৯ সালে বিধু বিনোদ চোপড়ার ‘পারিন্দা’ সিনেমায় অভিনয় করে বড় ধরনের সাফল্য পান নানা পাটেকর। সিনেমাটিতে আন্না নামের এক গ্যাংস্টারের চরিত্রে দেখা যায় তাকে।
আন্না ছিলেন শান্ত, স্থির অথচ ভয়ংকর এক মানুষ। খুব বেশি চিৎকার বা নাটকীয়তা ছাড়াই কীভাবে চরিত্রকে আতঙ্কের প্রতীক করে তোলা যায়, নানা সেটিই দেখিয়েছিলেন। ‘পারিন্দা’র জন্য প্রথমবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান নানা পাটেকর। এই সিনেমার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন, খলনায়ককে শুধু একমাত্রিক নেতিবাচক চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করার প্রয়োজন নেই। একজন অপরাধীর মধ্যেও থাকতে পারে গভীর মানবিকতা ও জটিল মনস্তত্ত্ব।
ক্রান্তিবীর-এর প্রতাপ নারায়ণ তিলক
১৯৯৪ সালের ‘ক্রান্তিবীর’ নানা পাটেকরের ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিনেমা। এতে প্রতাপ নারায়ণ তিলক চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। চরিত্রটি ছিল এক মদ্যপ ও হতাশ মানুষের, যে সমাজের দুর্নীতি ও অন্যায়ের প্রতি তীব্র ক্ষোভ পোষণ করে। পরে সেই মানুষটিই দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়।
এই সিনেমায় নানা পাটেকরের অভিনয় যেন হয়ে উঠেছিল সাধারণ মানুষের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভের প্রকাশ। সিনেমার একটি সংলাপ আজও দর্শকের মুখে মুখে ফেরে, যেখানে তিনি প্রশ্ন তোলেন, মানুষের রক্তের মধ্যে কীভাবে ধর্মের পার্থক্য করা যায়।
ক্রান্তিবীর-এর জন্য সেরা অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান নানা। তার অভিনীত প্রতাপ নারায়ণ তিলক চরিত্রটি ভারতীয় সিনেমায় প্রতিবাদী চরিত্রের অন্যতম স্মরণীয় উদাহরণ হয়ে আছে।
আব তক ছাপ্পান-এর সাধু আগাশে
২০০৪ সালের ‘আব তক ছাপ্পান’ সিনেমায় নানা পাটেকর অভিনয় করেন পুলিশ কর্মকর্তা সাধু আগাশের চরিত্রে। অসংখ্য এনকাউন্টার এবং সহিংসতার মধ্য দিয়ে কাজ করতে করতে মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়া এক পুলিশ কর্মকর্তার গল্প এটি। অপরাধ দমন করতে গিয়ে যিনি নিজেই সহিংসতার অংশ হয়ে পড়েছেন।
সাধু আগাশের চরিত্রে নানা পাটেকর ছিলেন কঠোর, সংযত এবং একই সঙ্গে ভেতর থেকে ভেঙে পড়া একজন মানুষ। তার অভিনয়ের প্রভাব পরবর্তী সময়ে ভারতীয় সিনেমার ক্রাইম ড্রামাগুলোতেও দেখা যায়।
ওয়েলকাম-এ একেবারে অন্য নানা
গম্ভীর ও অন্ধকার চরিত্রে অভিনয়ের জন্য পরিচিত নানা পাটেকরকে ২০০৭ সালের ‘ওয়েলকাম’ সিনেমায় একেবারেই ভিন্নভাবে আবিষ্কার করেন দর্শক। এ সিনেমায় উদয় শেঠি নামের এক গ্যাংস্টারের চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। তবে এই গ্যাংস্টার ভয় দেখানোর চেয়ে বেশি ব্যস্ত তার বোনের বিয়ে দেওয়ার জন্য।
নানা পাটেকরের গম্ভীর অভিনয়ের ধরনই এখানে হয়ে ওঠে হাসির বড় উৎস। অনিল কাপুরের সঙ্গে তার রসায়ন সিনেমাটিকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে।
‘কন্ট্রোল উদয়, কন্ট্রোল’সহ সিনেমাটির একাধিক সংলাপ এখনও দর্শকের মুখে মুখে ফেরে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মিম সংস্কৃতিতেও জায়গা করে নিয়েছে নানা পাটেকরের এই চরিত্র।
নাটসম্রাট-এ জীবনের গভীরতম অভিনয়
২০১৬ সালে মুক্তি পাওয়া মারাঠি সিনেমা ‘নাটসম্রাট’-এ গণপত বেলওয়ালকর চরিত্রে অভিনয় করেন নানা পাটেকর। অনেকের মতে, এটি ছিল তার ক্যারিয়ারের শেষভাগের সবচেয়ে শক্তিশালী অভিনয়।
গণপত বেলওয়ালকর একজন অবসরপ্রাপ্ত মঞ্চ অভিনেতা। একসময় মঞ্চ কাঁপানো এই মানুষটি বয়সের ভারে যখন অভিনয় থেকে দূরে সরে যান, তখন তাকে মুখোমুখি হতে হয় একাকিত্ব, পারিবারিক টানাপোড়েন ও জীবনের কঠিন বাস্তবতার।
অভিনেতা হিসেবে নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে চরিত্রটির অনেক জায়গায় যেন একাত্ম হয়ে গিয়েছিলেন নানা। ফলে বেলওয়ালকরের আনন্দ, অভিমান, ক্ষোভ, হতাশা ও অসহায়ত্ব পর্দায় অত্যন্ত বাস্তব হয়ে উঠেছিল। ডনঅনলাইন











