পলাশ চৌধুরী: সিলেটের বিভিন্ন আনন্দ অনুষ্ঠানে গ্রামের মহিলারা হাতে তালি দিয়ে চক্রাকারে ঘুরে ঘুরে গানের সাথে নাচেন, এই নৃত্যগীতের ঐতিহ্যবাহী এ ফর্ম হলো ধামাইল। বর্তমানে ধামাইল বিলুপ্তির পথে!
কিন্তু এখনো সিলেট অঞ্চলের শাহ্ আব্দুল করিম, রাধারমণ, হাছনরাজা, ভবানন্দসহ অন্যান্যদের লোকসঙ্গীত নিয়ে ধামাইল সংস্কৃতির সংগ্রাহক রামকৃষ্ণ সরকার কাজ করে যাচ্ছেন। সেই ঐতিহ্যকে আগলে ধরে আছেন আপনভোলা রামকৃষ্ণ।
লোকসঙ্গীতের চর্চা, পৃষ্ঠপোষকতা এযুগে কেন যেন মানান সই নয়! পুরোনো সব কিছু ফেলে দিয়ে এগিয়ে যাওয়া নিশ্চয়ই স্মার্টনেস নয় বরং এর ওপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠার কথা নতুন, আধুনিক দেশ। রামকৃষ্ণ সরকার নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ান, শরীরও আজ ক্লান্ত তবু হাল ছাড়েননি তিনি। মনে প্রাণে তিনি যেন একজন মৈয়মনসিংহ গীতিকার চন্দ্রকুমার দে!
ধামাইল সংস্কৃতির কৃতি সংগ্রাহক রামকৃষ্ণ সরকার মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার রুস্তমপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার সাধারণ চালচলনের মধ্যে একটা দার্শনিক মনোভাব পরিলক্ষিত হয়।
রামকৃষ্ণ সরকার জানান, ‘ছোটবেলা থেকেই ধামাইল সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট ছিলাম, সেই সময় নিজগ্রামে বা আশেপাশের বিভিন্ন গ্রামে বিয়ের আসরে ধামাইল দেখতে যেতাম, তখন বিভিন্ন বিয়ের আসরে কয়েকজন নারী একত্রে গোল হয়ে হাতেতালি দিয়ে আকর্ষনীয় ভঙ্গিতে পরিবেশিত ছন্দময় ধামাইল আমাকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করতো, সেই ধামাইল দেখে দেখেই আমি এই সংস্কৃতির নেশায় মজে যাই, সেই নেশা আমার আজও যায়নি।
এই নৃত্যগীত নারীকন্ঠে গীত হয় বলে একে অনেকে নারীসঙ্গীতও বলে থাকেন। এর মধ্যে একাধারে ফুটে উঠে নারী মনের সুখ-দুঃখ, হাসিকান্না, বিরহ-বিচ্ছেদসহ সামাজিক জীবনের আনন্দবেদনার বাস্তবচিত্র।’
রামকৃষ্ণ আরো বলেন, ‘বিগত দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে এই ধামাইলগান ও নৃত্যের বিভিন্ন ভঙ্গিমা ও ধরনের খোঁজে ঘুরে বেরিয়েছি সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন গ্রামীণ জনপদে, মিশেছি নবীন-প্রবীণ গ্রামীণ শিল্পীদের সাথে, তাদের সাথে একাত্ম হয়ে সংগ্রহ করেছি ধামাইলগানের নাচের ধরন ও ভঙ্গিমা, গ্রামে গ্রামে গিয়ে গ্রামীণ ধামাইলশিল্পীদের খুঁজে বের করে তাদেরকে উৎসাহ অনুপ্রেরণার পাশাপাশি ধামাইলনাচের বিভিন্ন ভঙ্গিমা ও ধরনের দিকনির্দেশনা দিয়ে আসছি।’
পরবর্তী প্রজন্মের কথা চিন্তা করে ২০০৫ সালে তিনি শ্রীমঙ্গলে সর্বপ্রথম ধামাইল সংগঠন ‘নবনাগরী ধামাইল সংঘ’ ও ‘ধামাইল একাডেমি’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংগঠনের মাধ্যমে ধামাইলের প্রচার প্রসার ও উন্নয়নের লক্ষে কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর তিন মেয়ে; সুমি, রুমি এবং ঝুমি। তারা তিনজনই যেমন লোকধারার গান পছন্দ করেন ঠিক তেমনি বাবাকে গান সংগ্রহের কাজেও সহায়তা করছেন।
লোক গবেষক ও লেখক পার্থ তালুকদার বলেন, সিলেট অঞ্চল মরমিসাধক-চারণকবিদের উর্বর ভূমি হিসাবে আবহমান থেকেই সুপরিচিত। এই অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেছেন সাধক রাধারমণ দত্ত, মরমি কবি হাছন রাজা, শিতলং শাহ, দুর্বিন শাহ, আরকুম শাহ, শাহ আবদুল করিমসহ আরো অনেক সাধক পুরুষ।
তাদের সৃষ্ট পদ-গীত অত্র অঞ্চল তথা বিশ্বের গানপাগল মানুষের কাছে প্রাণসঞ্চারী হিসাবে বিবেচ্য। তবে তাদের সৃষ্ট অনেক পদ বা গানের কলি অনেকক্ষেত্রে অবহেলার কারণে, সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে গেছে অথবা একজন পদকর্তার গানের পদ অন্য একজন মহাজনের গানের সাথে যুক্ত হয়েছে, এমনকি অনেকক্ষেত্রে বিলুপ্তও হয়ে গেছে।
আবার গানের সুর পরিবর্তন করে যে যার মতো সুর বসাচ্ছে। ফলে এসব পদকর্তার নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য বা স্বকীয়তা খুঁজে পাওয়া দুরুহ হয়ে ওঠে। রামকৃষ্ণ সরকার এই বিষয়গুলো অনুধাবন করে মূলত গান সংগ্রহের এই কঠিন কাজে নিজেকে যুক্ত করেছেন।
এতো হাজার গানের মধ্যে রামকৃষ্ণ সরকারের প্রিয় গান রাধারমণ দত্তের ‘আমার বন্ধু দয়াময়, তোমারে দেখিবার মনে লয়’ গানটি সবসময় গুনগুনিয়ে গেয়ে থাকেন। পরম দয়াময় তাকে কোনপথে নিয়ে যাবেন তা আমরা কেউ জানিনা! তার প্রতি কৃতজ্ঞতার ভাষা আমাদের জানা আছে কি?









