যাতায়াত, ব্যায়াম, ফোনে কথা বলা কিংবা গান শোনা, নানা কাজে ইয়ারবাড এখন অনেকের দৈনন্দিন সঙ্গী। তবে দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত ইয়ারবাড ব্যবহার, বিশেষ করে বেশি শব্দে শোনা, ধীরে ধীরে শ্রবণশক্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।
যেভাবে ক্ষতি করতে পারে ইয়ারবাড
ইয়ারবাড ব্যবহারের ঝুঁকি শুধু শব্দের মাত্রার ওপর নির্ভর করে না। কতক্ষণ এবং কত ঘন ঘন কানে উচ্চ শব্দ পৌঁছাচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ স্পিকারের তুলনায় ইয়ারবাড কানের পর্দার অনেক কাছে অবস্থান করে। ফলে তুলনামূলক কম ভলিউমেও শব্দ সরাসরি কানের ভেতরে বেশি তীব্রভাবে পৌঁছাতে পারে।
দীর্ঘ সময় উচ্চ শব্দ শুনলে অন্তঃকর্ণের ক্ষুদ্র হেয়ার সেল বা শ্রবণগ্রাহী কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। শব্দ শনাক্ত করার ক্ষেত্রে এসব কোষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একবার এগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে সাধারণত পুনরায় তৈরি হয় না, ফলে শ্রবণশক্তি স্থায়ীভাবে কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
একটানা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ইয়ারবাড ব্যবহার করাও ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এমনকি শব্দের মাত্রা মাঝারি হলেও ব্যবহারের মাঝে বিরতি না থাকলে কান পর্যাপ্ত বিশ্রাম পায় না।
আবার কানে সঠিকভাবে না বসা ইয়ারবাডের কারণে বাইরের শব্দ ঠিকমতো শোনা যায় না। তখন আশপাশের শব্দ ঢাকতে অনেকেই ভলিউম আরও বাড়িয়ে দেন। এতে কানের ওপর শব্দের চাপ আরও বেড়ে যায়।
দীর্ঘদিন ইয়ারবাড ব্যবহারের আরেকটি সমস্যা হতে পারে কানে অতিরিক্ত খৈল জমা হওয়া। এতে কান বন্ধ বা ভারী লাগার মতো অনুভূতি তৈরি হতে পারে, যা প্রকৃত শ্রবণশক্তি হ্রাসের সঙ্গে গুলিয়ে যেতে পারে।
গবেষণায় কী পাওয়া গেছে
২০২২ সালে কিউরিয়াসে প্রকাশিত একটি সাহিত্য পর্যালোচনায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ২৩টি গবেষণা বিশ্লেষণ করা হয়। এসব গবেষণায় ইয়ারফোন ও হেডফোন ব্যবহারের সঙ্গে শব্দজনিত শ্রবণশক্তি হ্রাসের সম্পর্ক পর্যালোচনা করা হয়।
গবেষণাগুলোতে দেখা গেছে, ব্যক্তিগত মিউজিক প্লেয়ারে শব্দের মাত্রা ৭৮ থেকে ১৩৬ ডেসিবেল পর্যন্ত উঠতে পারে। দীর্ঘ সময় এমন উচ্চ শব্দের সংস্পর্শে থাকলে শ্রবণশক্তির ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একটি গবেষণায় দেখা যায়, প্রতিদিন দুই ঘণ্টা বা তার বেশি সময় ইয়ারফোন ব্যবহার করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে শ্রবণশক্তি কমে যাওয়ার হার তুলনামূলকভাবে বেশি। আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে হেডফোনে উচ্চ শব্দ শোনায় অভ্যস্ত কিশোর-কিশোরীদের শ্রবণ সমস্যার ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় চার গুণের বেশি।
দিনে কতক্ষণ ইয়ারবাড ব্যবহার নিরাপদ?
ইয়ারবাড ব্যবহারের জন্য সবার ক্ষেত্রে একই সময়সীমা প্রযোজ্য নয়। ঝুঁকি নির্ভর করে শব্দের মাত্রা, ব্যবহারের সময় এবং ব্যবহারের ঘনত্বের ওপর।
তবে শ্রবণস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সাধারণভাবে ‘৬০/৬০ নিয়ম’ অনুসরণের পরামর্শ দেন। অর্থাৎ ডিভাইসের সর্বোচ্চ ভলিউমের প্রায় ৬০ শতাংশের মধ্যে শব্দের মাত্রা রাখা এবং একটানা প্রায় ৬০ মিনিটের বেশি ইয়ারবাড ব্যবহার না করা। এরপর কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে কানকে বিশ্রাম দেওয়া উচিত।
সারাদিন একটানা ইয়ারবাড ব্যবহারের পরিবর্তে নিয়মিত বিরতি নেওয়া এবং দৈনিক মোট ব্যবহারের সময় কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সীমিত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।
২০২৫ সালে জার্নাল অব অডিওলজি অ্যান্ড অটোলজিতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা একটানা এক ঘণ্টার বেশি সময় ইয়ারফোন ব্যবহার করেন, তাদের মধ্যে ইয়ারফোন-সম্পর্কিত কানের সংক্রমণের প্রবণতা বেশি দেখা যায়।
তাই ইয়ারবাড ব্যবহারের সময় ভলিউম নিয়ন্ত্রণে রাখা, দীর্ঘক্ষণ একটানা না শোনা এবং নিয়মিত বিরতি নেওয়া শ্রবণস্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ।










