এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
দখল করা পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের ক্রমবর্ধমান হামলার কারণে কয়েক ডজন ফিলিস্তিনি সম্প্রদায় নিশ্চিহ্ন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।
আল জাজিরা এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
বসতিস্থাপনকারীদের বাড়তে থাকা হামলার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ ইসরায়েলি বসতি দ্রুত সম্প্রসারণের কারণে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি বাড়ছে।
প্রতিবেদনে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে বসতিস্থাপনকারীদের অস্ত্র, অর্থ ও আইনি সুরক্ষা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। সংস্থাটির দাবি, এসব হামলার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
২০২২ সালের ডিসেম্বরে বর্তমান ইসরায়েলি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতা বেড়েছে। তবে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধের প্রথম দুই মাসে হামলার মাত্রা আরও বেড়ে যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব হামলার মধ্যে শিশুদের হত্যাসহ প্রাণহানি, মারধর, যৌন সহিংসতা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, ইচ্ছামতো আটক, অগ্নিসংযোগ, বাড়িঘর ও সম্পদ ধ্বংস এবং সম্পত্তি লুটের অভিযোগ রয়েছে।
এইচআরডব্লিউর ভারপ্রাপ্ত ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন গবেষক সারাহ সানবার বলেন, ইসরায়েলি সরকার ও বসতিস্থাপনকারীদের লক্ষ্য একই, সর্বাধিক ভূমি দখল এবং সেখানে ফিলিস্তিনিদের সংখ্যা সর্বনিম্ন রাখা।
তিনি বলেন, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ শুধু বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতা বন্ধে ব্যর্থ হচ্ছে না, বরং বিভিন্নভাবে তা সম্ভব করে তুলছে। বসতিস্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালিয়ে তাদের জমি থেকে উচ্ছেদ করছে এবং রাষ্ট্র তাদের অস্ত্র, আইনি সুরক্ষা ও অর্থ দিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এইচআরডব্লিউ এপ্রিল ও মে মাসে পশ্চিম তীরের সাতটি ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়ে বসতিস্থাপনকারীদের হামলা তদন্ত করে। এর মধ্যে রামাল্লাহ গভর্নরেটের আল-মুঘাইয়ির, মিখমাস ও তাইবেহ; নাবলুস গভর্নরেটের জালুদ ও কারইউত এবং জর্ডান উপত্যকার খিরবেত হামসা ও মু’রাজ্জাত ইস্ট রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কিছু ঘটনায় সশস্ত্র বসতিস্থাপনকারীরা ইসরায়েলি সেনাদের সঙ্গে মিলে ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের বাড়িঘর ও সম্পত্তিতে হামলা চালিয়েছে। আবার কোনো কোনো ঘটনায় সেনারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকেও হামলা ঠেকাতে হস্তক্ষেপ করেনি। এর ফলে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির ধারাবাহিকতা তৈরি হয়েছে।
জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় কার্যালয় (ওসিএইচএ)-এর তথ্যের বরাত দিয়ে এইচআরডব্লিউ জানায়, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে বসতিস্থাপনকারীদের হামলা, বাড়িঘর ধ্বংস ও উচ্ছেদের কারণে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনির সংখ্যা পুরো ২০২৫ সালের তুলনায় বেশি।
ওসিএইচএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতার কারণে ১০৭টি ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়ের ৫ হাজার ৯০০ মানুষ পুরোপুরি বা আংশিকভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দখল করা পশ্চিম তীরে আরও প্রায় ৩২ হাজার ফিলিস্তিনিকে তাদের বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ করেছে। এর ফলে জেনিন, তুলকারেম ও নুর শামস শরণার্থী শিবির কার্যত জনশূন্য হয়ে পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এইচআরডব্লিউ বলছে, হামলা এবং রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার অভাবে এমন একটি ভয়ভীতির পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে অনেক ফিলিস্তিনি মনে করছেন, তাদের বাড়িঘর ছেড়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
চলমান মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে লক্ষ্যভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুপারিশ করেছে এইচআরডব্লিউ। পাশাপাশি ইসরায়েলে অস্ত্র সরবরাহ স্থগিত, অবৈধ বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য নিষিদ্ধ এবং ইসরায়েলের সঙ্গে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি স্থগিতের বিষয়টি বিবেচনা করতে দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
সারাহ সানবার বলেন, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ বসতিস্থাপনকারীদের যে দায়মুক্তি দিয়ে আসছে, তার পেছনে দেশটির মিত্র ও দাতাদের দেওয়া অবাধ সমর্থন সরাসরি দায়ী।
তিনি বলেন, ইসরায়েল এবং যেসব সরকার দেশটিকে কোনো ধরনের জবাবদিহি ছাড়াই সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে, তাদেরও এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী করে জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।










