পঁচাত্তরের ৫ নভেম্বর: বঙ্গভবনে মোশতাকের শেষ দিন, যেভাবে ক্ষমতা হারান ৮৩ দিনের রাষ্ট্রপতি

ছবিঃ সংগৃহীত
বঙ্গভবন ঘিরে সেনাবাহিনীর অবস্থান, সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে উত্তপ্ত আলোচনা, পদত্যাগে অনীহা আর ক্ষমতা হস্তান্তরের টানাপোড়েন। ১৯৭৫ সালের ৫ নভেম্বর বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ঘটেছিল এক নাটকীয় পালাবদল। শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর রাষ্ট্রপতির পদে বসা খন্দকার মোশতাক আহমদ সেদিন ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন।
১৯৭৫ সালের ৫ নভেম্বর। বঙ্গভবনের ভেতরে তখন উৎকণ্ঠা আর অনিশ্চয়তা। রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদ আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতায় থাকলেও বাস্তবে তার নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই খর্ব হয়ে গেছে। বঙ্গভবন ঘিরে অবস্থান নিয়েছে সেনাবাহিনীর একটি অংশ। ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পর রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রভাব বিস্তারকারী সামরিক কর্মকর্তাদের অবস্থানও দুর্বল হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ও কর্নেল শাফায়াত জামিলের নেতৃত্বাধীন সামরিক কর্মকর্তারা চাইছেন মোশতাকের পদত্যাগ।
মাত্র ৮৩ দিন আগে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর রাষ্ট্রপতির পদে বসেছিলেন খন্দকার মোশতাক। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ অভ্যুত্থান সেই শাসনের অবসান ঘটায়।
তৎকালীন সামরিক কর্মকর্তাদের স্মৃতিকথা এবং সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের অনুসন্ধানী গ্রন্থ বাংলাদেশ: এ লিগ্যাসি অব ব্লাড-এ উঠে এসেছে মোশতাকের ক্ষমতা হারানোর নেপথ্যের ঘটনাপ্রবাহ।
বঙ্গভবন ঘিরে সেনাবাহিনী, শুরু ক্ষমতার সংকট
মোশতাকের পতনের ঘটনাপ্রবাহ শুরু হয় ৩ নভেম্বর। সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়া এবং ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডে জড়িত কর্মকর্তাদের বঙ্গভবনকেন্দ্রিক প্রভাব নিয়ে সামরিক নেতৃত্বের একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল।
এই পরিস্থিতিতে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ও কর্নেল শাফায়াত জামিলের নেতৃত্বে শুরু হয় সামরিক অভ্যুত্থান।
শাফায়াত জামিল তার স্মৃতিকথা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, রক্তাক্ত মধ্য আগস্ট ও ষড়যন্ত্রময় নভেম্বর-এ অভ্যুত্থানের প্রস্তুতি, বঙ্গভবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা এবং সংশ্লিষ্ট সামরিক কর্মকর্তাদের ভূমিকা তুলে ধরেছেন।

তার বর্ণনা অনুযায়ী, বঙ্গভবনে অবস্থানরত ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রভাবমুক্ত করা ছিল অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এ জন্য বঙ্গভবনের নিরাপত্তায় নিয়োজিত সেনাসদস্যদের প্রত্যাহার এবং বিভিন্ন সামরিক ইউনিটের অবস্থান পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সামরিক শক্তির ভারসাম্য বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গভবনে মোশতাকের অবস্থান দুর্বল হতে থাকে।
মন্ত্রিসভার বৈঠকে উত্তেজনা
নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে বঙ্গভবনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল মোশতাকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠক।
শাফায়াত জামিলের স্মৃতিচারণা অনুযায়ী, বৈঠক চলাকালে সামরিক কর্মকর্তাদের একটি দল বঙ্গভবনে প্রবেশ করে। সেখানে মোশতাকের ভূমিকা নিয়ে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পর ক্ষমতা গ্রহণ, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এবং রাষ্ট্রপতির পদে মোশতাকের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
বঙ্গভবনে উপস্থিত মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের সামনে পরিস্থিতি ক্রমেই অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রপতি হিসেবে মোশতাকের আনুষ্ঠানিক কর্তৃত্ব থাকলেও সামরিক নেতৃত্বের সমর্থন হারিয়ে তিনি কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন।
অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তার গ্রন্থে ৩ থেকে ৫ নভেম্বরের বঙ্গভবনকে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও দর-কষাকষির কেন্দ্র হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার বিবরণে মোশতাক তখন রাষ্ট্রপতির পদে থাকলেও স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অবস্থায় ছিলেন না।
পদত্যাগে রাজি ছিলেন না মোশতাক
খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বাধীন সামরিক কর্মকর্তারা মোশতাককে সরিয়ে নতুন রাষ্ট্রপতি নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু পদত্যাগের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে গিয়ে তৈরি হয় জটিলতা।
মাসকারেনহাসের বর্ণনায়, মোশতাকের স্বাক্ষরের জন্য একাধিক দলিল প্রস্তুত করা হয়। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র ছাড়াও ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডে জড়িত সামরিক কর্মকর্তাদের দেশত্যাগ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের নথি নিয়ে আলোচনা চলে।
কয়েকটি দলিলের তারিখ ও বিষয়বস্তু নিয়ে মোশতাক আপত্তি জানান বলে তার বইয়ে উল্লেখ রয়েছে।
এই সময় বঙ্গভবনে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম এ জি ওসমানী। ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তার ভূমিকার কথা বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উঠে এসেছে।
মাসকারেনহাসের বিবরণ অনুযায়ী, মোশতাককে পদত্যাগে সম্মত করাতে ওসমানীও আলোচনা করেন।
শেষ পর্যন্ত সামরিক চাপের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন মোশতাক।
জেলহত্যার ছায়া বঙ্গভবনে
মোশতাকের ক্ষমতা হারানোর ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যার ঘটনা। বঙ্গভবন থেকে মোশতাকের টেলিফোন নির্দেশেই খুলে দেওয়া হয়েছিল কারাফটক।
পরেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে কারাগারের ভেতরে হত্যা করা হয়।

১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পর বঙ্গভবনকেন্দ্রিক সামরিক কর্মকর্তাদের তৎপরতা এবং ৩ নভেম্বরের জেলহত্যা রাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করে তোলে।
শাফায়াত জামিলের স্মৃতিকথায় জেলহত্যার খবর জানার পর সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রতিক্রিয়ার কথা উঠে এসেছে।
অন্যদিকে মাসকারেনহাসের বিবরণে দেখা যায়, জেলহত্যা, বঙ্গভবনে অবস্থানরত সামরিক কর্মকর্তাদের নিরাপদে দেশত্যাগ এবং মোশতাকের পদত্যাগ; এসব বিষয় নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ক্ষমতা হস্তান্তরের জটিল প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে ওঠে।
শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে সায়েম
মোশতাকের বিদায়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে আলোচনা চলতে থাকে।
সামরিক নেতৃত্বের একটি অংশ প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তাব দেয়।

সায়েমের সম্মতি আদায়েও আলোচনা করতে হয়। বিভিন্ন স্মৃতিকথায় এ ক্ষেত্রে সামরিক কর্মকর্তাদের পাশাপাশি জেনারেল ওসমানীর ভূমিকার কথা উল্লেখ রয়েছে।
অবশেষে ৫ নভেম্বর মোশতাকের শাসনের অবসান ঘটে। পরদিন ৬ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন বিচারপতি সায়েম।
তবে রাষ্ট্রপতির পরিবর্তন হলেও সামরিক ও রাজনৈতিক সংকটের অবসান হয়নি। সেনানিবাসে তখন নতুন করে অসন্তোষ তৈরি হচ্ছিল। সেই অস্থিরতার ধারাবাহিকতায় ৭ নভেম্বর ঘটে সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান।
৮৩ দিনের ক্ষমতার অবসান
১৫ আগস্ট থেকে ৫ নভেম্বর; মাত্র ৮৩ দিনের ব্যবধানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে খন্দকার মোশতাক আহমদের উত্থান ও পতন ঘটে।
যে সামরিক কর্মকর্তাদের সমর্থনে তিনি রাষ্ট্রপতির পদে বসেছিলেন, নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সামরিক শক্তির নতুন সমীকরণে সেই অবস্থান আর ধরে রাখতে পারেননি।
শাফায়াত জামিল, মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমদসহ তৎকালীন সামরিক কর্মকর্তাদের স্মৃতিচারণা এবং অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের অনুসন্ধানে বঙ্গভবনের সেই সময়ের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার চিত্র উঠে এসেছে। তবে বিভিন্ন প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় ঘটনার সময় ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে কিছু পার্থক্যও রয়েছে।
মোশতাকের বিদায়ে শেষ হয়েছিল তার ৮৩ দিনের শাসন। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নভেম্বরের অস্থির অধ্যায় তখনো শেষ হয়নি।






