সারের ডিলার নিয়োগে স্বজনপ্রীতি: তালিকাভুক্ত ৩১ জনের ২৮ জনই বিএনপি-সংশ্লিষ্ট

কৃষিপ্রধান অঞ্চল ঠাকুরগাঁওয়ে নতুন সারের ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নজিরবিহীন স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক দলীয়করণ ও পারিবারিক সিন্ডিকেটের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সদ্য নিয়োগ পাওয়া ৩১ জন সারের ডিলারের মধ্যে ২৮ জনই সরাসরি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
দলের পদধারী নেতাদের পাশাপাশি ডিলারদের স্ত্রী, ভাই ও সন্তানরাও এই তালিকায় স্থান পেয়েছেন। অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে সততা ও দক্ষতার সঙ্গে ব্যবসা করে আসা অভিজ্ঞ ও প্রকৃত ব্যবসায়ীদের বঞ্চিত করায় স্থানীয় কৃষক সমাজ ও ব্যবসায়ী মহলে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং শাখার গত ৪ নভেম্বরের একটি চিঠির মাধ্যমে ঠাকুরগাঁও জেলার ৪টি উপজেলা ও ২টি পৌরসভায় নতুন ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন, রানীশংকৈল উপজেলার ১টি পৌরসভাসহ ৮টি, হরিপুর উপজেলার ৪টি এবং পীরগঞ্জ উপজেলার ১টি পৌরসভাসহ মোট ১১টি ইউনিয়নে এই ৩১ জন ডিলার নিয়োগ পান।
তবে নির্বাচন সংক্রান্ত জটিলতার কারণে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা এবং নবগঠিত দুটি উপজেলায় ডিলার নিয়োগের কার্যক্রম আপাতত স্থগিত রয়েছে।
একচ্ছত্র প্রাধান্য পেলেন প্রভাবশালীরা
অনুসন্ধানে জানা যায়, নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের তালিকায় প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যক্তিরাই প্রাধান্য পেয়েছেন। এর মধ্যে ৯ জন সরাসরি বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন।
মহিলা দল নেত্রী: হরিপুর উপজেলার ভাতুরিয়া ইউনিয়নের ডিলার হয়েছেন জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদিকা নাজমা পারভীন। ডিলারশিপ পাওয়ার পরপরই তিনি কাঠালডাঙ্গী বাজারের চৌরঙ্গী সড়কে দোকান কিনে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়েছেন।
অন্যান্য পদধারী নেতা: হরিপুর উপজেলার সাবেক বিএনপি সভাপতি করিমুল হক, ছাত্রদলের সাবেক দুই নেতা এবং তাঁতী ও ওলামা দলের একজন করে নেতা এই তালিকায় স্থান পেয়েছেন।
পারিবারিক ও আত্মীয়করণের সিন্ডিকেট
তালিকায় ৯ জন বিএনপি নেতার স্ত্রী, ৪ জন সন্তান, ২ জন ভাই, ১ জন নিকটাত্মীয় এবং ৩ জন স্থানীয় সংসদ সদস্যের ঘনিষ্টজন ডিলারশিপ পেয়েছেন।
নিয়মবহির্ভূতভাবে হরিপুর উপজেলার বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবু তাহেরের ছেলে মশিউর রহমানও ডিলারশিপ পেয়েছেন। অথচ কৃষি মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী একই পরিবারের একাধিক সদস্য ডিলারশিপ পাওয়ার সুযোগ নেই।
উল্লেখ্য, আবু তাহেরের ছোট ভাই ও মেসার্স লুৎফর রহমানের প্রোপাইটর আব্দুর বশির বহু আগে থেকেই সার ডিলার হিসেবে বহাল আছেন। এ বিষয়ে আবু তাহের দাবি করেছেন, তার ছোট ভাই ও ছেলে আলাদা সংসার ও মৌজায় বসবাস করায় নীতিমালা মেনেই আবেদন করা হয়েছে।
এদিকে, বাকি ডিলারদের মধ্যে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ওয়ার্ড পর্যায়ে নানা পদপদবিতে থাকা ব্যক্তিরাও রয়েছেন। এই তালিকায় রাজনীতির সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততা নেই এমন ব্যক্তির সংখ্যা মাত্র দুজন।
কৃষক ও ব্যবসায়ী মহলে তীব্র ক্ষোভ
অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীদের বাদ দিয়ে এমন রাজনৈতিক ও পারিবারিক বলয়ের ব্যক্তিদের ডিলার করায় কৃষিব্যবস্থা ধ্বংসের শঙ্কা প্রকাশ করেছেন কৃষক নেতারা।
জাতীয় কৃষক সমিতির নেতা মোহাম্মদ জুয়েল তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “কৃষিপ্রধান এই দেশে ফসল উৎপাদন সচল রাখতে সারের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা জরুরি। কিন্তু ডিলার নিয়োগে দলীয়করণের ফলে একদিকে কৃষিব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়বে, অন্যদিকে সার সরবরাহের ক্ষেত্রে একধরনের শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠবে।”
অভিযোগের বিষয়ে সাফাই গেয়ে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পয়গাম আলী দাবি করেন, “দীর্ঘদিন দলের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিলেন। এখন তাদের অনেকে ব্যবসায় মনোনিবেশ করছেন এবং সে কারণেই আবেদন করেছেন। ডিলার নিয়োগে দলের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব ছিল না।” সংশ্লিষ্ট ডিলাররাও রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টি অস্বীকার করে সঠিক নিয়মে বৈধ কাগজপত্রে ডিলারশিপ পাওয়ার দাবি করেছেন।
অন্যদিকে, ঠাকুরগাঁও-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. আব্দুস সালাম বলেন, “যারা ডিলার হিসেবে নিয়োগ পাননি, তারা এখন নানা কথা বলছেন। সারের ডিলার নিয়োগ ইউএনও ও কমিটির মাধ্যমে হয়েছে, অনিয়ম হলে সেটা তাদের দায়। এখানে আমার কোনো ভূমিকা নেই।”
জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রফিকুল হক জানান, “ডিলারদের আবেদন উপজেলা কমিটি যাচাই-বাছাই করেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের পরামর্শক্রমে নীতিমালার আলোকেই কমিটি সুপারিশ করেছে এবং মন্ত্রণালয় তা অনুমোদন করেছে। এ বিষয়ে কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি।”
তবে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মাজেদুল ইসলাম এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।






