একুশে পদক-২০২৬ ঘোষণা ঘিরে নৃত্যাঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনা তীব্র হয়েছে। এবারের তালিকায় নৃত্যকলায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ অপেক্ষাকৃত তরুণ নৃত্যশিল্পী অর্থী আহমেদ-এর মনোনয়নকে কেন্দ্র করে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ পোস্ট দিয়েছেন অভিনেত্রী ও গুণী নৃত্যশিল্পী মুনমুন আহমেদ।
সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ নয়জন ব্যক্তি ও একটি প্রতিষ্ঠানকে একুশে পদক-২০২৬ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংগীত বিভাগে প্রয়াত রক তারকা আইয়ুব বাচ্চু এবং ব্যান্ড ওয়ারফেজ-কে সম্মাননা জানানোর সিদ্ধান্ত ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছে। বিশেষ করে প্রথমবারের মতো কোনো বাংলাদেশি ব্যান্ডকে একুশে পদকে ভূষিত করায় সংগীতাঙ্গনে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
তবে নৃত্য বিভাগে অর্থী আহমেদের মনোনয়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন একদল নৃত্যশিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মী। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে নৃত্যকলায় অবদান রাখা প্রবীণ শিল্পীদের পাশ কাটিয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে রাষ্ট্রীয় এই মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননার মানদণ্ড ও স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ।
এ প্রসঙ্গে মুনমুন আহমেদ তার পোস্টে উল্লেখ করেন, একুশে পদক দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা, যা ১৯৭৬ সাল থেকে ভাষা শহীদদের স্মরণে প্রদান করা হচ্ছে। ভাষা আন্দোলন, শিল্পকলা, শিক্ষা, সাহিত্য, গবেষণা, বিজ্ঞান, সাংবাদিকতা, অর্থনীতি ও সমাজসেবাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাতীয় পর্যায়ে অনন্য ও অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রতিবছর ফেব্রুয়ারিতে এই পদক প্রদান করা হয়।
তিনি বলেন, নৃত্যকলায় প্রতি বছর পদক দেওয়া হয় না—এ বছর দেওয়া হওয়ায় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা রয়েছে। তবে যাকে এ বছর নৃত্যকলায় জাতীয় পর্যায়ের অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পদক দেওয়া হয়েছে, তাকে ঘিরে নৃত্যসমাজসহ বৃহত্তর শিল্পীসমাজে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
নিজের দীর্ঘ ৫৩ বছরের নৃত্যজীবনের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে মুনমুন আহমেদ লেখেন,“পদক ঘোষণা থেকে এপর্যন্ত নানা জনের নানা ধরনের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে আমাকেও, কে এই অর্থী? তার নাচতো কোথাও দেখিনি, তাকেতো চিনিই না, জাতীয় পর্যায়ে সে কী করেছে, কী কারণে তাকে এই পুরস্কার দেয়া হলো, কী অবদান তার নৃত্যকলায়, তার কী আরো অন্য গুণ আছে? অগ্রজ গুণী নৃত্যব্যক্তিত্বদের উপেক্ষা করে কেন এমনটা করলো সরকার? আরে ভাই, এতো উত্তর আমি দেবো কীভাবে? জানি ১৯৭৩ সাল থেকে অর্থাৎ দীর্ঘ ৫৩ বছর যাবৎ মঞ্চ ও টেলিভিশনে নৃত্যশিল্পী হিসেবে কাজ করে চলেছি, তাই স্বাভাবিকভাবেই অনেকে আমাকে প্রশ্ন করছেন, কিন্তু আমি ভীষণ বিব্রতবোধ করছি এসব প্রশ্নে।”
তবে তিনি স্পষ্ট করেন,“অল্প বয়সে যে কেউ তার যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারলে পুরস্কৃত হতেই পারেন। তাছাড়া সরকার কাকে পুরস্কৃত করবেন সেটা একেবারেই সরকারের বিজ্ঞ বিচারকমন্ডলীর সিদ্ধান্ত। আমার কিছুই করার নেই এখানে। তবে এই একুশে পদকের একটি সম্মানজনক অবস্থান রয়েছে যা মাত্র তিন চার বছর আগে একটি নাচের স্কুল খুলে দু-তিনটি অনুষ্ঠান করেই যদি এ পদকে কেউ ভূষিত হন, তাহলে যারা দীর্ঘদিন এই শিল্পের সাথে জড়িত থেকে সাধনা, শ্রম দিয়ে এই শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তাঁদেরকে এক অর্থে অবজ্ঞা, অশ্রদ্ধা ও অপমানই করা হয়, যা নৃত্যশিল্পীসমাজ, সুধীসমাজ ও নৃত্যপ্রেমীদের কাম্য নয়।”
ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তাব দিয়ে মুনমুন আহমেদ জানান, সম্ভব হলে নৃত্যকলায় প্রতিবছর একুশে পদক দেওয়া উচিত এবং এ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ও জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়ে শক্তিশালী বিচারক কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। এতে প্রকৃত যোগ্যজন নির্বাচিত হবেন, বিতর্কও কমবে এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকবে।
পোস্টের শেষে তিনি লেখেন, “যে কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির সম্মান রক্ষা করা রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব। জয় হোক নৃত্যের।”








